চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পুঁজি সংকটে চামড়ার আড়তদাররা
বকেয়া পেয়ে চামড়া কেনার প্রস্তুতি আড়তদারদের

১৮ জুলাই, ২০২০ | ৩:১৯ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

পুঁজি সংকটে চামড়ার আড়তদাররা

তিন বছরের বকেয়া না পাওয়া, সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার দর বেঁধে না দেয়া ও ট্যানারি মালিকদের অনাগ্রহের কারণে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না চট্টগ্রামের কাঁচা চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, চট্টগ্রামের চামড়া ব্যবসা ঢাকা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন আড়তদাররা।

চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি ছিল। স্বাধীনতার পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে বন্ধ হতে হতে এখন একটিমাত্র ট্যানারি রয়েছে। এটি চট্টগ্রামের ১০ শতাংশ চামড়া কিনছে। বাকি ৯০ শতাংশ চামড়া ঢাকা ট্যানারি-নির্ভর হয়ে পড়েছে। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদাররা গত তিন বছরের অন্তত ৩০-৪০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। বকেয়া টাকা না পাওয়ায় এবার চামড়া কেনা নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন আড়তদাররা।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম পূর্বকোণকে জানান, ‘গত তিন বছরে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে। প্রতি বছর কোরবানির আগে এসব পাওনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তিন বছরেও তা পরিশোধ করা হয়নি। টাকা না পাওয়ায় এখনো চামড়া কেনার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেনি আড়তদাররা।’

চামড়াশিল্প রক্ষার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের সুযোগ ও প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিলে চামড়া খাত ফের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যথায় সম্ভাবনাময়ী এ খাতটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

গেল বছর কাঁচা চামড়া নিয়ে স্মরণকালের ভয়াবহ দুরবস্থা সৃষ্টি হয়। হাজার হাজার চামড়া পথে-ঘাটে ফেলে দিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সিটি কর্পোরেশন কয়েকদিন ধরে পরিষ্কার করেছে এসব নষ্ট চামড়া। ক্রেতা ও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চামড়া ফেলে দিয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতে লাখ লাখ টাকার লোকসান গুনেছেন তারা। এবারও চামড়া কেনায় আশাব্যঞ্জক দেখাচ্ছে না আড়তদাররা।

আড়তদার সমিতির আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এখনো চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারেনি আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। করোনায় চামড়ার দাম কম। ঢাকার ট্যানারি মালিকেরাও আগ্রহ দেখাচ্ছে কম। ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে না পারলে আড়তদাররা কার জন্য চামড়া কিনবে।’
চট্টগ্রামে সমিতির অন্তর্ভুক্ত ১১২ জন আড়তদার রয়েছে। এরমধ্যে নিয়মিতভাবে ব্যবসা করছেন ২০-২৫ জন। অব্যাহত লোকসানে পুঁজি হারিয়ে অনেকেই আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বলে দাবি আড়তদারদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আড়তদার বলেন, বকেয়া টাকার জন্য কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ধর্ণা দিয়েছেন আসছেন। নূন্যতম মমত্ববোধও দেখান না ট্যানারি মালিকেরা। টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ঢাকায় গিয়ে প্রায়শই খালি হাতে ফিরতে হয়। ঘণ্টার ঘণ্টার পর অপেক্ষা করে চট্টগ্রামে ফিরতে হয়। মালিকেরা দেখা পর্যন্ত দেন না।

আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেক আড়তদার প্রস্তুতি নিয়েছেন। লবণ কেনা ও শ্রমিক নিয়োগ করেছেন। কিন্তু এখনো চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারেননি। কারণ পুরোনো বকেয়া পাওয়া এখনো পাননি। বকেয়া না পেলে এবার অনেক ব্যবসায়ী চামড়া কিনতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘সরকার ট্যানারি মালিকদের ঋণ দেয়। আড়তদারদের ২-৩ শতাংশ সুদে ঋণের সুযোগ দিলে চামড়া কেনায় সহায়ক হবে।’
এবার সরকার কাঁচা চামড়া রপ্তানির প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে। চামড়া রপ্তানি উদ্যোগ কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন আড়তদারা।

আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘ওয়েট ব্লু রপ্তানির অনুমতি দিলে ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে চামড়া খাত। এতে ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে।’

আড়তদার সমিতির হিসাব মতে, চট্টগ্রাম চার থেকে সাড়ে লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। যার তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ হচ্ছে গরুর চামড়া। বাকিগুলো হচ্ছে মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার চামড়া।

চামড়া আড়তদার মো. শাহজাহান বলেন, ‘ট্যানারি মালিকরা হচ্ছে আমাদের অভিভাবক। আমরা লবণজাত করে সর্বোচ্চ তিন মাস সংরক্ষণ করতে পারি। তারপর বাকি হোক, বিনামূল্যে হোক-ট্যানারি মালিকদের দিতেই হবে। সংরক্ষণের কোন সুযোগ নেই। তিন-চার বছর ধরে ৩০-৪০ কোটি টাকার বকেয়া রয়েছে। শুধু ধর্ণা দিয়ে আসছে। অনেকেই টাকা না পেয়ে মারাও গিয়েছেন।’ তিনি বলেন, সরকার ছাড়া এই চামড়া শিল্পকে রক্ষার আর কোনো উপায় নেই। সরকার উদ্যোগ নিলে এ শিল্প আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 166 People

সম্পর্কিত পোস্ট