চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

১ জুলাই, ২০২০ | ২:৫২ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আজ বুধবার ১ জুলাই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) একশ’ বছরে পা রাখলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাপর সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম এবং বড় কোনো অর্জনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ৯৯ বছর পূর্ণ করা বিশ্বখ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। নানা ঘটনার একপর্যায়ে ১৯২১ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতে অক্সব্রিজ শিক্ষা ব্যবস্থা অনুসরণে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জ্ঞানের প্রদীপ জ্বেলে চলেছে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি। তৈরি করেছে অসংখ্য জ্ঞানী-গুনী। ঢাবির শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজসেবক-রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের গবেষক সংখ্যা প্রচুর। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মরতদের প্রায় অর্ধেকের বেশি ঢাবির শিক্ষার্থী।

সূচনালগ্নে বিভিন্ন প্রথিতযশা বৃত্তিধারী ও বিজ্ঞানীদের দ্বারা কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রিত হবার প্রেক্ষাপটে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে স্বীকৃতি পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠের একটি বিশেষত্ব হলো বাংলাদেশ স্বাধীন করতে এর বিশেষ অবদান ছিল। যেখানে দেশের সরকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে বিশেষ অবদান রেখেছিল। অদ্যাবধি যা বিশ্ব দরবারে বিরল ঘটনা।

ঢাবির শিক্ষকবৃন্দ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি পদক লাভ করেছেন। কিন্তু শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে নানা কারণে ঢাবির শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্নও তৈরি হয়েছে। তবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কয়েকজন ভাইস চ্যান্সেলর।

সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে স্বাধীন জাতিসত্তার বিকাশের লক্ষ্যে বিংশশতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। এর মাত্র তিন দিন আগে ভাইস রয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানিয়েছিলেন ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ির নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ব্যারিস্টার আর. নাথানের নেতৃত্বে ডি. আর. কুচলার, ড.রাসবিহারী ঘোষ, নবাব সৈয়দ আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার প্রভাবশালী নাগরিক আনন্দচন্দ্র রায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.টি.আর্চিবল্ড,জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিত মোহন চট্টোপাধ্যায়, ঢাকা মাদরাসার (বর্তমান কবি নজরুল সরকারি কলেজ) তত্ত্বাবধায়ক শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, মোহাম্মদ আলী (আলীগড়), প্রেসিডেন্সি কলেজের (কলকাতা) অধ্যক্ষ এইচ. এইচ. আর. জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি.ডব্লিউ. পিক এবং সংস্কৃত কলেজের (কলকাতা) অধ্যক্ষ সতীশ্চন্দ্র আচার্যকে সদস্য করে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠিত হয়। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট এবং ওই বছরই ডিসেম্বর মাসে সেটি অনুমোদিত হয়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভা পাস করে ‘দি ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০’।

১৯২১ সালের ১ জুলাই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়। সে সময়কার ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬শ একর জমির ওপর পূর্ববঙ্গ এবং আসাম প্রদেশ সরকারের পরিত্যক্ত ভবনসমূহ ও ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনসমূহের সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠে ঢাবি।

৩টি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ জন। ঢাবিকে কেন্দ্র করে এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উজ্জীবিত হয়। নতুন উদ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকাণ্ড শুরু হয়।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সকল জন-আন্দোলন ও সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে প্রণীত ১৯৬১ সালের আইয়ুব সরকারের জারিকৃত অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য ষাটের দশক থেকে শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উক্ত অর্ডিন্যান্স বাতিল করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ-১৯৭৩ জারি করেন। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৮৪টি বিভাগ, ৬০টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র এবং ছাত্র-ছাত্রীদের ১৯টি আবাসিক হল, ৪টি হোস্টেল ও ১৩৮টি উপাদানকল্প কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার ১৫০ জন। পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৮ জন শিক্ষক।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে ঢাবিতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশ ও জাতির সার্বিক কল্যাণে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ও অগ্রগতিতে নিবেদিত এ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে গবেষণা-কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

প্রবীণদের চোখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা বড় অর্জন হলেও শিক্ষার গুণগত মানের অবনমন হয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ও বর্তমান উপাচার্যসহ প্রবীণ শিক্ষাবিদরা।

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম:  জাতির যা আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার চেয়ে বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা।

ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, স্বৈরশাসক আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সবকিছুতে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। একইভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সামরিক শাসন, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে।

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে দ্বায়িত্ব নিতে হয়েছে, পৃথিবীর কম বিশ্ববিদ্যালয়ই সে দ্বায়িত্ব নিয়েছে। শাসকের সঙ্গে লড়াই করে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে টিকে থাকতে হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পেলেও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন ও বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে জায়গা না পাওয়া নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে ইংরেজির অধ্যাপক প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, মনে রাখতে হবে, এ বিশ্ববিদ্যালয়কে রাষ্ট্রের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে। পূর্ববঙ্গে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশসহ এদেশের মানুষের সামাজিক দায় নিতে হয়েছে। এখন আমরা শতবর্ষে যাচ্ছি, এখন আর সামাজিক দায় নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে না। এখন মূল কাজটা হবে শিক্ষা ও গবেষণায় মনোযোগ দেওয়া। রাষ্ট্রকে সেই সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ: শৃঙ্খলাবোধ অনেকটা বিঘ্নিত হয়েছে। এখন আগের মতো উন্নত লেখক ও মানসম্মত লেখা খুজেঁ পাওয়া যায় না। এর মূল কারণ দেশের রাজনৈকি অবস্থা। শিক্ষক নিয়োগে নিরপেক্ষতা না থাকা ও দল মত নির্বিশেষে সম্মিলিত প্রচেষ্টার অভাব।

অতীতের গৌরব পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ৮৭ বছর বয়সে পা দিয়েছি। এই বয়সে এসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি টান অনুভব করি। এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়াজ শুনতে পাই।

অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক: বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এদেশের রাজনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। সবচেয়ে বড় অবদান মুক্তিযুদ্ধ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যেভাবে আত্মত্যাগের স্বাক্ষর রেখে গেছে, রণাঙ্গনে গিয়ে জীবন দিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এমন দাবি করতে পারবে না।

উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান:  বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষ্যে এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, “দুটি বিষয়কে সামনে রেখে আমরা অগ্রসর হচ্ছি। এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী থেকে আমরা গভীরভাবে প্রত্যয় ব্যক্ত করছি, সেটি হলো গবেষণার ক্ষেত্রকে সম্প্রসারণ করা খুবই জরুরি। আমরা সেদিকে অগ্রসর হচ্ছি। আরেকটি হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা। সেটির জন্য যা যা প্রয়োজন, বিভিন্ন ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনা, সেগুলো আমরা গ্রহণ করেছি।

 

 

পূর্বকোণ/ এস

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 257 People

সম্পর্কিত পোস্ট