চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সড়কদুর্ঘটনা বাড়ছে, করণীয় এখনই ঠিক করতে হবে

২০ জানুয়ারি, ২০২০ | ৬:১১ পূর্বাহ্ণ

মো. দিদারুল আলম

সড়কদুর্ঘটনা বাড়ছে, করণীয় এখনই ঠিক করতে হবে

সারাদেশে ২০১৯ সালে ৫ হাজার ৫১৬টি সড়কদুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৭ হাজার ৮৫৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ৩৩০ জন। জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র এবং অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

২০১৯ সালের সড়কদুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল আগের বছর ২০১৮ সালের প্রায় সমান। কিন্তু ২০১৮ সালের তুলনায় গত বছর প্রাণহানির সংখ্যা ৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেড়েছে। গত বছরের সড়কদুর্ঘটনায় শিকার মানুষদের মধ্যে ৯৮৯ জন বিভিন্ন যানবাহনের চালক, ৮৪৪ জন পরিবহন শ্রমিক ও ৮০৯ জন শিক্ষার্থী ছিলেন।
২০১৯ সালে সড়কদুর্ঘটনায় ৪৯ জন বাসচালক ও সহকারী এবং ৭২ জন ট্রাকচালক ও সহকারী মারা গেছেন। এছাড়া ২ হাজার ৬৬১ জন পথচারী মারা গেছেন, যা মোট দুর্ঘটনার ৫০ দশমিক ৪ শতাংশ। পথচারীরা গাড়ি চাপায়, পেছন দিক থেকে ধাক্কাসহ বিভিন্নভাবে দুর্ঘটনায় পড়েছে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা, রাস্তা চলাচল ও পারাপারে মোবাইল ব্যবহার, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, পদচারী-সেতু ব্যবহার না করা, যত্রতত্র পারাপারের ফলে পথচারীরা দুর্ঘটনায় পড়ছে।
অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ওভারটেকিং, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, প্রশিক্ষণ ছাড়া গাড়ি চালানো, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইনের যথাযথ প্রয়োগ না করা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম মূল কারণ।

গেল বছর বেশির ভাগ সড়কদুর্ঘটনা ঘটেছে বড় শহর ও মহাসড়কগুলোতে। অবৈধ যানবাহন ভ্যান, রিকশা, নছিমন, অটোরিকশা এ জন্য দায়ী বলে প্রতীয়মান হয়। আইনকে অমান্য করে ধীরগতির বাহন মহাসড়কে এখনো চলাচল করে, যা দূরপাল্লার বড় গাড়িগুলোর চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করে। স্থানীয় প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশকে এই ব্যাপারে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। ‘সড়কদুর্ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা সঠিক ও নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা করার দায়িত্ব সরকারের। ইতিপূর্বে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ, সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা কাউন্সিলে নিয়মিত কোনো তথ্য প্রদান না করার কারণে সরকারিভাবে কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়ে না।

মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা দিন দিন মারাত্মভাবে বাড়ছে, ২০১৯ সালে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ৯৮টি। নিহত হয়েছেন ৬৪৮ জন মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ২৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৫৪টি। আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৯০৩টি। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে, ১৪ লাখ ২৬ হাজার ২৫১ জন চালক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে অবৈধভাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ বিআরটিএ তাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে যেন তাদের কিছুই করার নেই।
শহরে মোটরসাইকেলের চালকদের হেলমেট পরার সুঅভ্যাস গড়ে ওঠা এবং সচেতনতা বাড়লেও গ্রামে জেলা পর্যায়ে ও গ্রামে হেলমেট না পরার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এছাড়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বে প্রশাসনের সামনে দিয়ে লাইসেন্সবিহীন মোটরসাইকেল ও অপ্রাপ্তবয়স্করা মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। ২০১৯ সালের জেলাভিত্তিক সড়কদুর্ঘটনার হিসাবে নিসচার প্রতিবেদনে এসেছে, সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়কদুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকায় (৩০৯টি)। এতে নিহত হয়েছে ৩৩৫ জন ও আহত হয়েছে ৩২৭ জন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়িতে (৭টি)। এতে নিহত হয়েছে ২৭ জন ও আহত হয়েছে ১০ জন। দেশে গত বছর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ময়মনসিংহে (৪৮৮ জন)। আর সড়কদুর্ঘটনায় সবচেয়ে কম মারা গেছেন ঝালকাঠিতে (৫ জন)। ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, যত্রতত্র পার্কিং না করা, ওভারটেক বিষয়ে আইন প্রয়োগ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, সড়কদুর্ঘটনার বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা, মিডিয়ায় সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো, দক্ষ চালক তৈরিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মহাসড়ক ও প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করা, সড়কের ত্রুটি দূর করা।

সড়কদুর্ঘটনা রোধ করতে বা কমানোর জন্য কিছু সুপারিশ মানলে কাজ হবে বলে মনে হয় যেমন; যেসব রাস্তায় ধারণক্ষমতার অধিক যানবাহন চলাচল করে তা প্রশস্ত করতে হবে। সড়ক ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। বিপজ্জনক বাঁক/দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলো চিহ্নিত করে প্রতিটি বাঁকে প্রয়োজনীয় দূরত্বের ডিভাইডার স্থাপন করতে হবে। রাস্তায় গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (স্পিড বাম্প/হাম্প/কুশন স্থাপন) রাখতে হবে। গাড়িতে স্পিড লিমিটিং ডিভাইজ স্থাপন করতে হবে। ধীরগতি সম্পন্ন যানবাহনের (নছিমন, করিমন, ভটভটি, হিউম্যান হলার, সাইকেল, রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিকশা ইত্যাদি) জন্য আলাদা লেন তৈরি করা এবং ডিভাইডার নির্মাণ করা।
বিআরটিসি ও বিআরটিএ কর্তৃক সঠিক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং ভুয়া লাইসেন্স বন্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। গাড়ির ফিটনেস যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেওয়া। স্পিড লিমিটিং ডিভাইজ সংযোজন ব্যতীত ফিটনেস সনদপত্র না দেওয়া। গাড়ির মালিকের নিকট হতে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির জন্য নিরাপত্তা জামানত রাখা।
চালকরা অনেক সময় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালায়, যার ফলে একসময় নিজের অজান্তেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। তাই চালকদের এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। কোনোভাবেই অসুস্থ বা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো যাবে না। প্রত্যেক মানুষেরই পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম প্রয়োজন। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮, ১ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখ থেকে কার্যকরের প্রজ্ঞাপন আইনের নতুন কিছু দিক; ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ যানবাহন চালালে তার শাস্তি ছয় মাসের কারাদ- বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-। নিবন্ধনহীন যানবাহনের জন্য শাস্তি ছয় মাসের কারাদ- এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এর জন্য পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা। উল্টো পথে গাড়ি চালালেও জরিমানা গুনতে হবে। এছাড়া ফিটনেস, রেজিস্ট্র্রেশন এসব বিষয়েও জরিমানা অনেক বাড়ানো হয়েছে।

এই আইনে শুধু চালক ও পরিবহন মালিক নয়, এবার পথচারীদেরও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। চালককে সংকেত মানতে হবে। পথচারীকেও সড়ক, মহাসড়কে জেব্রা ক্রসিং, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার করতে হবে। যত্রতত্র রাস্তা পার হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো চালক যদি দুর্ঘটনার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটান তাহলে তার বিরুদ্ধে দ-বিধির ৩০২ ধারায়ই মামলা হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-। তবে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর জন্য চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর এবং এই অপরাধ জামিন অযোগ্য। আগে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিলো তিন বছরের কারাদ- এবং জামিনযোগ্য। গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বললে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা।

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে এক মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের বিধান রয়েছে। আর দুর্ঘটনায় আহতদের ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ। চালকদের সর্বনিম্ন বয়স হতে হবে ১৮ বছর। আইনটি মোটরবাইক থেকে শুরু করে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য প্রযোজ্য হবে আইনের ধারাগুলোর ব্যাপক প্রচার করাসহ যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

মো. দিদারুল আলম লেখক ও প্রাবন্ধিক।
ফরফধৎংযধৎধভ@ুধযড়ড়.পড়স

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 157 People

সম্পর্কিত পোস্ট