চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৮ মে, ২০১৯ | ১:২১ পূর্বাহ্ণ

দেশীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নৌপথের নাব্যতা রক্ষা আবশ্যক

দেশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা হারানো ক্রমান্বয়ে বড়ো ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক নদ-নদী তাদের অতীতের গৌরবময় যৌবনের দিনগুলো হারিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। নৌ-পথে চলাচল ও পণ্য-পরিবহনের ক্ষমতা হারিয়ে এসমস্ত নদী কখনও কখনও অভিশাপও হয়ে উঠছে, বিশেষ করে বর্ষাকালে। বর্ষণের ঋতুতে প্লাবনে মাঠ-ঘাট-গ্রাম ও জনপদ ভাসিয়ে নাব্যতাহারা নদ-নদী জনজীবনের ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। হেজে-মজে শুকিয়ে যাওয়া নদীর কারণে কোথাও দেখা দিচ্ছে কৃষিকাজের অত্যাবশ্যকীয় সেচের জলের অভাব। আবার, কোথাও নদী ব্যবস্থাপনা ও নদী-শাসনের উপযুক্ত কৌশলের অভাবে নদী-ভাঙ্গনের কবলে পড়ে গ্রাম-গঞ্জ-নগর-জনপদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিগত কয়েক দশকে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হলেও আমাদের এমন অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে নৌ-পথ ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তাছাড়া, এদেশে নৌ-পথে চলাচলের সুযোগ যেহেতু রয়েছেই, অতএব, এই সুবিধাটুকু আমরা বিনষ্ট হতে দিতে পারি না। সড়ক যোগাযোগ ও নৌ-যোগাযোগ দুটোই আমাদের যাতায়াত ও পরিবহনের ক্ষেত্র ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মাধ্যম। তাই, নদ-নদীগুলোর নাব্যতা-সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েই এর সমাধানের উপায়গুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
একটা কথা বলা হয় যে, অসংখ্য নদ-নদী ও উপনদী মিলিয়ে এই বাংলাদেশেই গড়ে উঠেছে বিশে^র অন্যতম বৃহৎ নদী-ব্যবস্থা। নদী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহ দেশের সব জায়গায় স্বাভাবিকভাবেই সম-আঙ্গিকে বয়ে যায় নি। দেশের উত্তরভাগের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণ ভাগের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের নদ-নদীর সংখ্যা এবং আকার দুটোই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর, তাই নদী-ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে নদী-নালাগুলোকে চারটি প্রধান নদী ব্যবস্থা বা নদী প্রণালীতে বিভক্ত করা হয়। এই চারটি ভাগ হল : ব্রহ্মপুত্র-যমুনা-নদী-প্রণালী, গঙ্গা-পদ্মা নদী-প্রণালী, সুরমা-মেঘনা নদী-প্রণালী এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের নদ-নদীগুলো গতিধারা।
দেশের নদ-নদীসমূহের এই যে বৈচিত্র্যময় চরিত্র ও গতিধারা একে উপেক্ষা করে আমাদের নদী-ভাবনা ও নদীশাসনের উদ্যোগ-আয়োজন সফল করে তোলা যাবে না। নদ-নদীগুলোর যে নাব্যতা সঙ্কট, তাকেও আমাদের এই আলোকে দেখতে হবে এবং সঙ্কট মোচনের সূত্র খুঁজতে হবে। ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থানের কথা বিবেচনায় নিয়েই চট্টগ্রামের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা ও ভাঙন বিষয়ক ভাবনা চিন্তায় কৌশলী উপায় খুঁজতে হবে।
এদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নদ-নদী অব্যাহতভাবে নাব্যতা হারিয়ে ফেলার ফলে আমাদের নদী পথের দৈর্ঘ্য কমে যেতে বসেছে। তিন দশকেরও কিছু বেশি সময়ের মধ্যে প্রায় আট হাজার কিলোমিটার পরিমাণ নদীপথের দৈর্ঘ্য কমে গেছে। ১৯৭২ সালে এদেশের নৌপথে দৈর্ঘ্য ছিলো ১৩৬২৬ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার। সেই দৈর্ঘ্য কমে গিয়ে আজকের দিনে এসে দাঁড়িয়েছে ৫৯৬৮ কিলোমিটারে। তার উপর শীতের দিনে বিভিন্ন অঞ্চলের নদী-বিল-হাওর-বাঁওর শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এই দৈর্ঘ্য সাময়িকভাবে কমে গিয়ে মাত্র সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারে নেমে আসে। আমাদের পানি বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দেশের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা হারানোর বর্তমান প্রক্রিয়া রোধকল্পে দীর্ঘমেয়াদী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী দশ/পনেরো বছর পরে এদেশের নৌ-পথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাড়ে সাত কোটি যাত্রী এদেশের নৌ-পথের উপর নির্ভরশীল। সারাদেশে প্রতি বছর নানা অঞ্চলে যে পরিমাণ পণ্য পরিবাহিত হয় তার প্রায় অর্ধেক পরিবহন করা হয় নৌ-পথের মাধ্যমে। অতএব, আমাদের নদীপথের নাব্যতার সুরক্ষার বিষয়টির প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছাড়াও মানুষের যাতায়াতের সুবিধাও অক্ষুণœ রাখতে হবে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 243 People

সম্পর্কিত পোস্ট