চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

৬ মে, ২০১৯ | ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ

শতরূপা দত্ত

মানবজাতির যুদ্ধটা এখন এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে

এন্টিবায়োটিক একটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ। কিন্তু আমাদেরই ভুলে বর্তমানে এটি হয়ে উঠেছে এক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ-তে মারা যাওয়া রোগীদের ৮০ শতাংশের মৃত্যুর সঙ্গে ব্যাক্টেরিয়া-প্রতিরোধী ‘সুপারবাগ’-এর সম্পর্ক থাকতে পারে। বলা হচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের প্রথম এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, ১৯২৮ সালে লন্ডনে। ১৯৪২ সালে প্রথম পেনিসিলিন মানুষের দেহে প্রয়োগ করা হয়। পরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনীর সৈন্যদের ক্ষত সারাতে পেনিসিলিনের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়। ব্রিটেন ও আমেরিকার বিজ্ঞানীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফ্লেমিং-এর সেই ‘যাদু ঔষধ’ তৈরি হতে থাকে, যা অসংখ্য জীবন বাঁচায়।
স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং নাকি বলেছিলেন, “এই এন্টিবায়োটিকের কারণে আজ কোটি কোটি লোক বেঁচে যাবে। অনেক বছর পর এগুলো আর কাজ করবে না। তুচ্ছ কারণে কোটি কোটি লোক মারা যাবে আবার।” ফ্লেমিং সত্যিই এ কথা বলুন আর না বলুন, আজ কিন্তু এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হতে শুরু করেছে।
বেশ কিছু কেস-স্টাডিতে দেখা গেছে, ‘এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক ক্ষমতা’ তৈরি হয়ে যাওয়ার কারণে বহু মানুষের শরীরে আর এন্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার ও বংশবিস্তার করার ক্ষমতা অর্জনই ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধক ক্ষমতা’। আর এই এন্টিবায়োটিক সহনশীল ব্যাকটেরিয়াগুলোকেই বলা হয়- সুপারবাগ। ২০১৬ সালে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সুপারবাগ দিন দিন এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ১ কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে এটি।
এন্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার এবং নিয়ম না মেনে ব্যবহারের কারণে জীবাণুরা এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে ফেলছে। ফলে, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানান চিকিৎসকরা।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’-এ বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কেস-স্টাডি উঠে এসেছে। এসব কেস-স্টাডিতে দেখা গেছে, তাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়ার ফলে কোনো এন্টিবায়োটিকেই তাদের আর কাজ হচ্ছে না। ফলে, দুরারোগ্য রোগ দূরে থাক, সাধারণ অসুস্থতাতেও ওষুধ প্রয়োগ করে ফল পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। চিকিৎসার সমস্ত উপকরণ হাতের কাছে থাকার পরও বলতে গেলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু হচ্ছে তাদের।
ফেসবুকে রাজীব হোসাইন সরকার নামে একজন চিকিৎসক চার বছরের একটি শিশুর কেস-স্টাডি সামনে এনেছেন। শিশুটিকে ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকে দেওয়া ইউরিন কালচার রিপোর্টটি প্রকাশ করে দেখিয়েছেন এর ভয়াবহতা। সেই রিপোর্টটিকে তিনি উল্লেখ করেছেন- ‘পৃথিবী থেকে মানবজাতি বিলুপ্তির সত্যয়িত সনদপত্র’ – হিসেবে।
শিশুটির ইউরিন রিপোর্টে দেখা যায়, তাতে ১৮টি এন্টিবায়োটিক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে এবং ১৮টিতেই রেজিস্ট্যান্ট রেজাল্ট পাওয়া গেছে! চিকিৎসকদের এখন আর কিছুই করার নেই। হাতে শত শত এন্টিবায়োটিক থাকলেও এই শিশুটির শরীরে কাজ করবে না একটাও। শিশুটি নিশ্চিত মারা যাবে।
আরো একটি ভয়ের কথাও সেই সাথে শুনিয়েছেন রাজীব হোসাইন সরকার, ঐ শিশুটির রিপোর্টের মতো আরো অন্তত ৩০০টি রিপোর্ট আছে তার কাছে। দীর্ঘ এক বছরের চেষ্টায় সেগুলো সংগ্রহ করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, সব ধরনের ব্যাকটেরিয়ায় রেজিস্ট্যান্ট এই ৩০০ রিপোর্ট যাদের, তারা যত ধনীই হোক, দুনিয়ার যে দেশেই চিকিৎসা করাক, যে ঈশ্বরের কাছেই নিজেকে সমর্পণ করুক, তারা আর ফিরবে না। তাদের মৃত্যু অনিবার্য।
সম্প্রতি দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতেও উঠে এসেছে এমন আরো কেস-স্টাডি। জানা গেছে, ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ-তে ভর্তি দুই রোগীর কথা, যাদের শরীরে একটি মাত্র এন্টিবায়োটিক কাজ করছে। এদের দু’জনেরই প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৪টি এন্টিবায়োটিকের নামের পাশে ‘আর’ (রেজিস্ট্যান্স) লেখা। শুধু কোলিস্টিন সালফেট নামের এন্টিবায়োটিকের পাশে লেখা ‘এস’ (সেনসিটিভ)। অর্থাৎ তাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া দমন করতে পারবে শুধু কোলিস্টিন সালফেট। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, কোলিস্টিন সালফেটের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করলেও রোগীর কিডনির জন্য ক্ষতিকর এটি।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারা (রোগীরা) এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়েই আইসিইউ-তে এসেছেন। শুধু এ দুজনই নয়, আইসিইউ-তে ভর্তি হওয়া রোগীদের ২৫ শতাংশই কোনো না কোনো এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট। বর্তমানে বাজারে প্রচলিত ২০-২৫ ধরনের এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। আইসিইউ-র অধিকাংশ রোগীর শরীরই ২০টার মধ্যে অন্তত ১৮টা এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা। আর কিছু রোগী আছেন, যাদের সব এন্টিবায়োটিকই রেজিস্ট্যান্স।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলো শুধু আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরেই থাকে না। তারা বংশবৃদ্ধি করে, তাদের ছানা-পোনারাও রেজিস্ট্যান্ট হয়েই জন্ম নেয়। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশির মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়াগুলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। একদম সুস্থ, কোনোদিনও একটাও এন্টিবায়োটিক না খাওয়া একজন মানুষও এধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে এসে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যান। অর্থাৎ, ধরে নেয়া যায় আক্রান্ত মানুষটির সাথেই তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পড়েন। এ সমস্যায় আক্রান্ত নারীর গর্ভজাত শিশু জন্ম থেকেই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে পৃথিবীতে আসে।
এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার বেড়ে যাওয়াকে এর জন্য প্রধানত দায়ী করছেন চিকিৎসকরা। জানা গেছে, দেশের প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার ফার্মেসিতে ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এন্টিবায়োটিক বিক্রি হয়। এছাড়া চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে যে এন্টিবায়োটিক লিখছেন, রোগীরা পূর্ণমেয়াদে তা শেষ করছে না। বেশি দামের কারণে রোগীরা কিছুটা সুস্থ হলেই এন্টিবায়োটিকের মেয়াদ শেষ না করেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। ফলে, তার শরীরে যে জীবাণু থাকছে তা ওই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স তৈরি করছে। জানা যাচ্ছে, দেশে গড়ে প্রতিদিন সাত লাখ মানুষ এন্টিবায়োটিক সেবন করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলোজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, গত বছর প্রায় ৯০০ রোগী তাদের আইসিইউ-তে ভর্তি হয়েছিলেন যাদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জন মারা গেছেন, যার ৮০ শতাংশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে রোগী যে ব্যাক্টেরিয়া বা ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে তা এন্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল নয়।
মানবদেহে উপস্থিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আবিষ্কার করা হয়েছিল এন্টিবায়োটিক। চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে এটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলো। কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সেই এন্টিবায়োটিক এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এন্ড ইমিউনোলজি বিভাগের প্রধান আহমেদ আবু সালেহ বিবিসি বাংলাকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন, সত্যি কথা হলো, ভবিষ্যতে ব্যবহার করার মতো কার্যকর কোনো এন্টিবায়োটিক আর তাদের হাতে নেই। বর্তমানে যেসব এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এ কারণে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
আজকের এ পরিস্থিতি তৈরির জন্য দায়ী কারা? আমরাই। কোন্ রোগের জন্য কোন্ ধরনের এন্টিবায়োটিক, কোন্ মেয়াদে দিতে হবে তা না জেনেই ফার্মেসির দোকানদার, পল্লী চিকিৎসক থেকে শুরু করে পাশের বাসার ভাই-ভাবী, বন্ধু-সহকর্মী, পাড়ার পরিচিত সবাই এন্টিবায়োটিক দিচ্ছে। সামান্য জ্বর হলেই, আমরা ফার্মেসিতে গিয়ে বলি এন্টিবায়োটিক দিতে। ব্যবসার লোভে ফার্মেসিওয়ালারাও কোনো-না-কোনো এন্টিবায়োটিক আমাদের দেন। দুদিন খাওয়ার পর একটু ভালো বোধ করলে আমরা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিই। যদি ধরে নিই, আমার শরীরে একশ’ ব্যাকটেরিয়া আছে। তাদের মারার জন্য সাত দিনের ডোজ লাগত, দুইদিন পর ভালো বোধ করায় আমি আর ডোজটা শেষ করলাম না। ফলে, হয়তো ৭০টি ব্যাকটেরিয়া মরলো। কিন্তু বাকি ৩০টি ব্যাকটেরিয়া তো বেঁচে থাকলোই। তারা ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক চিনে ফেলে নিজেদের শরীরে সেই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও শক্তি তৈরি করে ফেলল। তার ফলে, এর পরেরবার আমার শরীরে আর কিন্তু ঐ এন্টিবায়োটিক কাজ করবে না। কারণ, ব্যাকটেরিয়ারা এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে সব ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা নিয়ে ফেলেছে।
তবে, শুধু কারণে-অকারণে এন্টিবায়োটিক খেলে বা মেডিসিনের কোর্স শেষ না করলেই যে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট তৈরি হয়, তা কিন্তু নয়। আরো বেশি ভয়ের কথা হলো, মানুষের রোগ নিরাময়ের জন্য যে এন্টিবায়োটিক বানানো হয়েছিল, অতিরিক্ত লাভের আশায় সেগুলো এখন পশুপাখিদের দ্রুত বর্ধনশীল করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। চট্টগ্রামে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শহরের অর্ধেকেরও বেশি পোলট্রি-মুরগির শরীরে এসব এন্টিবায়োটিক ঢোকানো হচ্ছে। এই পোলট্রি-মুরগি খেয়ে ঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষও। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) উদ্যোগে ২০১৮ সালে এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও এর কার্যকারিতা নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশে মৎস্য খামারে ১০ ধরনের ও ৫০ শ্রেণীর এন্টিবায়োটিক, কীটনাশক ও গ্রোথ এজেন্ট ব্যবহার করা হয়। গরুর দুধের নমুনায় টেট্রাসাইক্লিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোসিন জাতীয় এন্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব ধরা পড়েছে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাতেই। মাছ ও মাংসেও পাওয়া গেছে একই ধরনের এন্টিবায়োটিক, যার বেশিরভাগই মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। এমনকি, বাদ যায় নি কৃষিখাদ্যও।
গবাদি পশু বা হাঁস-মুরগির জন্য ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক ওষুধ আসলেই কতটা সহজলভ্য তার প্রমাণ মেলে রাজধানীর বঙ্গবাজারের পাশে প্রাণীর ওষুধের সারি সারি দোকান থেকে ঘুরে এলেই। কোনো প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এখানে যে কোনো ধরনের এন্টিবায়োটিক যে কেউ কিনে নিতে পারেন। এমনকি, এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে সর্বশেষ জেনারেশনের এন্টিবায়োটিক কোলিস্টিন পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, যখন অন্য কোনো ওষুধে কাজ করে না তখন এটা দেওয়া হয়। আর, আমরা এখন পশুর মাংস খাওয়ার সময় নিজেদের অজান্তেই এরকম হাই-ডোজের এন্টিবায়োটিক খেয়ে চলেছি। এতে মানুষের ঝুঁকি তো বাড়ছেই, পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশে থাকা জীবাণুর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ ক্ষমতা।
এক প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া প্রাণিসম্পদের কোনো ওষুধ বিক্রি করা যাবে না। কারণ, এগুলো মাত্রা ঠিক না রাখলে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানবদেহে ঢুকে ক্ষতি ঘটাতে পারে। কিন্তু সে নির্দেশনা মানা হচ্ছে না কোনোখানেই।
গবাদি পশুকে রোগমুক্ত রাখতে নানা ধরনের ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। দেশের বেশিরভাগ খামারি ওই সব ওষুধ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় তারা যখন তখন ইচ্ছামাফিক এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছে। অথচ, এন্টিবায়োটিকের ডোজ কম হলে যেমন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়, তেমনি গবাদি পশু, মুরগি বা মাছে এর ডোজ বেশি হলে তা তাদের শরীরে থেকে যায়। এসব মাছ-মাংস বা দুধ ওই এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের কত দিন পর খাওয়ার উপযোগী হবে সেটা মেনে চলতে হয়। তা না হলে মাছ-মাংসের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে ঢুকতে পারে। আগুনের তাপেও সেটা প্রভাবিত হয় না। এসব এন্টিবায়োটিক মানুষের কিডনি নষ্ট করে ফেলতে পারে।
এর পাশাপাশি কৃষিপণ্যে, শস্য ও সবজি চাষের সময় ব্যবহৃত কীটনাশক কোনো-না-কোনো ধরনের এন্টিবায়োটিক থেকেই তৈরি। সেগুলোও শস্য এবং সবজির মাধ্যমে প্রবেশ করছে মানুষের শরীরে। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিখাদ্যের মাধ্যমে উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করায় রাজধানী ঢাকার ৫৫.৭ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
শুধু বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, এই ভয়াবহতা থেকে মুক্ত নয় বিশ্বের আরো অনেক দেশ। ২০১৭ সালের এক গবেষণায় জানা যায়, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামসহ আরও অনেক দেশ সুপারবাগের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুখের কথা, গত ২৪ এপ্রিল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এন্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। পরদিন সেই রিট আবেদনের শুনানিতে এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ করতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এ ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্দেশনায় আদালত বলেছেন, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এই ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রি হতে দেওয়াকে কোনো অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, সরকারের কাছে জবাব চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
তবে, শুধু সরকারি নিষেধাজ্ঞা নয়, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাওয়া জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়তে হলে আমাদের সকলের সচেতনতা সবার আগে প্রয়োজন। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করে জনগণকে এ বিষয়ে সুশিক্ষিত করে তোলা যেতে পারে। স্কুলগুলোতে শিশুদের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে কর্মশালা করনো যেতে পারে। হয়তো এখনো অনেক দেরি হয়ে যায় নি, সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়তো এখনো পৃথিবী থেকে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবার মতো একটি হুমকি থেকে আমরা আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে পারবো। তাই যুদ্ধ শুরু করার এখনই সময়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 644 People

সম্পর্কিত পোস্ট