চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৫ মে, ২০১৯ | ১:১০ পূর্বাহ্ণ

নাওজিশ মাহমুদ

রবীন্দ্রনাথ ও বাংলাদেশ আত্মার সম্পর্ক

দু’দিন পরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। তিনি ৭ মে, ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ/২৫ বৈশাখ, ১২৪৮ বঙ্গাব্দে কলকাতায় বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাঙালি মধ্যবিত্তের বিশাল একট অংশের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার কবি হলেও, তাঁকে বিশ^কবি বলে অভিহিত করা হয়। একমাত্র বাঙালি যিনি কবিতা দিয়ে, সাহিত্য দিয়ে, গান দিয়ে বিশ^কে জয় করেছিলেন। বাংলাভাষা যেমন তাঁর কাছে ঋণী, তেমনি বাঙালি জাতিও তাঁর কাছে ঋণী। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত্তি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের হাতেই পরিপূর্ণতা পেয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণার উৎস এই রবীন্দ্রনাথ। বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক পিতা বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথকে। বাঙালি হিসেবে আমাদের পরিচিতির প্রধান ভিত্তি বাংলা ভাষা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হলো এই বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষার প্রধান পুরুষ এই রবীন্দ্রনাথ। যেহেতু ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান, তাই বাংলাদেশ এবং রবীন্দ্রনাথ পরস্পরের সাথে অবিচ্ছেদ্য।
রবীন্দ্রনাথ জাতি হিসেবে বাঙালি এতে সন্দেহ নাই। এখন প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে ভারতীয় না বাংলাদেশী? তিনি ভারতীয় এবং বাংলাদেশী দুটোই। তবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বেই, এমন কি ভারত বিভাজনের পূর্বেই তিনি শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ অধীনস্থ ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়েই বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। উনার আবাসভূমি বর্তমানে ভারতে এবং উনার লেখার যাবতীয় স্বত্বই ভারতের। উনার স্বপ্নের রূপায়ন শান্তিনিকেতনে। বাংলা ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্তি হয়ে যাবে তা উনি কল্পনা করেন নি। উনি বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলা ভাগ হতো না। কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তকে হয়তো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। অখ- স্বাধীন বাংলা হয়তো বাস্তব রূপ নিত। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করে জিন্নাহ, নেহেরু ও গান্ধীর পক্ষে বাংলাভাগ হয়তো সম্ভব হতো না। তবু, বর্তমানে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাঙালির সাথে তাঁর সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে?
অখ- রবীন্দ্রনাথ, সার্বিক রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর সমস্ত রচনাবলী, সুর ও সঙ্গীত, চিত্রকলা বাঙালির সম্পদ। বাঙালির রাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশ। সুতরাং আজকের রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান এবং সৃষ্টির সকল ভাগীদার এই বাংলাদেশের নাগরিকেরা। রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয় ভাবে ধারণ করতে পারবে একমাত্র বাংলাদেশ। তবে, রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করতে গিয়ে আমরা যেন কলকাতা সংস্কৃতির অনুগামী হয়ে না যাই। কারণ, রবীন্দ্রনাথকে কলকাতা এবং পশ্চিম বঙ্গ ধারণ করলে বাঙালি কখনও বিভক্ত হতো না। বাঙালি ধর্মীয় পরিচয়ে নিজের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে পিছনে ফেলে দিয়ে বাংলাকে ভাগ করেছে। রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করেছে। এখানে বঙ্কিমকে ধারণ করেছে। বঙ্কিমের জয় হয়েছে। বাংলাদেশের বাঙালি ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথে আশ্রয় নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান এবং সাহিত্য থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের অনুপ্রেরণা ও মানসিক শক্তি সবই পেয়েছে। তবে, এই বাংলাদেশে আবার রবীন্দ্রবিরোধী প্রচারণা যেমন আছে, তেমনি আছে রবীন্দ্রভক্তির নামে আরেক রাষ্ট্রের তাবেদারীর প্রচেষ্টা। তবু, আমাদের দৃঢ় বিশ^াস, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশে নিজস্ব স্বকীয়তায়, একান্ত বাংলাদেশের হয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা যেমন রবীন্দ্রনাথ, তেমনি ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাও রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ প্রথমত বাঙালি। বাঙালিত্বকে আত্মস্থ করে তিনি ভারতীয় হয়ে উঠছিলেন। এই ভারতীয় থেকে তিনি ক্রমশ বিশ^বাসীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় বাঙালি হয়ে নতুন ভাবে জন্ম নিয়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গের সময় তিনিই প্রথম বুঝেছিলেন হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে, বিচ্ছিন্নতার যে দেয়াল উঠেছে, তা না-ভাঙা পর্যন্ত বাঙালির জাতির ঐক্য সম্ভব নয়। এই দেয়াল ভাঙার প্রথম কাজটি তিনি করে গিয়েছিলেন, তার গানে-কবিতায় এবং সাহিত্যের মাধ্যমে। পূর্ববঙ্গে জমিদারী করতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের শাহজাদপুর, শিলাইদহ এবং শ^শুরালয় খুলনা থেকে তার চিন্তা-চেতনা, ভাব এবং সুর সবই নিয়েছিলেন। পদ্মা নদী ছিল উনার নিত্যসহচর। এই চেতনা ও ভাব হিন্দু-মুসলমানের দেয়াল ভাঙার সাংস্কৃতিক জগৎ নির্মাণ করে গিয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক দেয়াল, রাজনৈতিক দেয়াল এবং অর্থনৈতিক দেয়াল তিনি ভাঙতে পারেন নি। কারণ, তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতি ছিল না। বাংলার অর্থনীতির প্রাণ ছিল এই দেশের কৃষি এবং কৃষক। ছেলেকে কৃষিবিজ্ঞান পড়িয়ে এই দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর স্বপ্ন বাস্তাবায়িত হয় নি।
বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রধান কারণ ছিল ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক। অখ- বাংলার অধিকাংশ জমিদারী ছিল হিন্দুদের হাতে আর অধিকাংশ কৃষক ছিল মুসলমান। কৃষক এবং জমিদারদের অর্থনৈতিক বিরোধ ও ধর্মীয় বিরোধ সামাজিক বিরোধে রূপ নেয়। এই সামাজিক বিরোধ রাজনীতিতে এসে প্রকট হয়ে উঠে। সেখান থেকে ভৌগোলিক বিভক্তির মাধ্যমে সাময়িক নিষ্পত্তি ঘটে। কিন্তু ভাষার উপর আঘাত আসায় ভাষাকে ভিত্তি করে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলার বাঙালি আবার ধর্মীয় বিরোধকে আড়াল করে ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমাধানের রাস্তা খুঁজতে থাকে। এই চেতনার পুরোধা হলেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। নজরুলের সংগীতের উৎস উত্তর প্রদেশ ঘরানার, তাই বাউল ঘরানার রবীন্দ্রসঙ্গীত অনেক বেশী বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে। রবীন্দ্রনাথের কারণে বাংলাভাষা বিশ^দরবার স্থান করে নিয়েছে। তাই, বাঙালি নিজেকে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে ভাবতে শিখেছে। বাঙালি ’৫২ সালে ভাষার উপর আঘাতকে, তাঁর আত্মমর্যাদার উপর আঘাত বলেই মনে করেছে। এই আত্মমর্যাদার রক্ষার করতে গিয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এই আত্মমর্যাদার সৃষ্টির প্রধান অবদান এই রবীন্দ্রনাথের। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে বিশে^র অন্যতম সেরা কবি হিসেবে স্বীকৃতি, বাঙালির আত্মমর্যদাকে এতো উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন, বাঙালি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠন করে তাঁর প্রতিদান দিয়েছে।
বাঙালি জাতি গঠনে রবীন্দ্রনাথের অবদান অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালির যেমন ঋণী, তেমনি রবীন্দ্রনাথও তার চিন্তা, ভাব, সৃষ্টিশীলতা এবং সুরের জন্য বাঙালির কাছে বিশেষ করে পূর্ব বাংলার ( বর্তমানে বাংলাদেশ) কাছে ঋণী। বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক বিরোধ ভৌগোলিক রূপ পাওয়ার পূর্বেই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাকে স্থিতি রেখেই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলার বাঙালিরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে সাংস্কৃতিক প্রেরণা পেয়েছে রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল থেকে। এই জাতির মনোজগতের প্রধান অংশ জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ যতই না ভারতীয় তার চেয়ে বেশী বাঙালি। কারণ, ভারতের অন্যান্য জাতির ( ভারতীয়রা এক জাতি নয়, বহুজাতির সমষ্টি) মনোজগতে রবীন্দ্রনাথের এত প্রভাব নাই, যত প্রভাব আছে বাঙালিদের কাছে। ভারতের বাঙালিরা ভারতে জনসংখ্যার এক দশমাংশের চেয়েও কম। তাই, রবীন্দ্রনাথ ভারত রাষ্ট্রে কখনও প্রাধান্য পাবে না। ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী একসময় কলকাতায় থাকলেও বর্তমানে মুম্বাইয়ে স্থানান্তরিত। ফলে, ভারতীয় সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ধীরে ধীরে কমে আসবে। ভারতের রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে বাঙালিদের অবস্থান এমনিতেই দুর্বল। তার উপর সাংস্কৃতিক অবস্থান যেটুকু ছিল তা ধীরে ধীরে কমে আসবে। রবীন্দ্রনাথকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণই লালন করবে। ধারণ করবে তাঁর সাহিত্য গান এবং কবিতা। এর থেকে চিন্তা-চেতনা এবং সৌন্দর্যবোধ আহরণ করবে। মনের মাধুরী দিয়ে আরো বিকশিত করবে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের একটি অংশ রবীন্দ্রনাথকে ধারণ এবং মাতামাতি যতই করুক, একসময় তা কমে আসবে। কারণ, ভারতের ভবিষ্যত সংস্কৃতি নির্মাণে ভারতীয় অর্থনীতি এবং রাজনীতি মূল ভূমিকা রাখবে। ভারতের অর্থনীতির মূল কেন্দ্র মুম্বাই, যেখানে প্রাধান্য গুজরাটিদের। ভারতের রাজনীতির মূল কেন্দ্র দিল্লী এবং তৎসংলগ্ন হিন্দিভাষী – উত্তর প্রদেশ, বিহার ও মধ্যপ্রদেশ। প্রযুক্তির মূল কেন্দ্র বাঙ্গালুরু। যেখানে প্রাধান্য ইংরেজী ভাষার। সংস্কৃতিতে প্রাধান্য মুম্বাই এবং চেন্নাইর। যেহেতু বাজারভিত্তিক অর্থনীতির কারণে গুজরাটি এবং মারাঠি ভাষার চেয়ে হিন্দি ভাষী ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই হিন্দি ভাষা উঠে আসছে প্রধান বা জাতীয় ভাষা হিসেবে।
হিন্দি ভাষা ক্রমাগত মূল ভূমিকায় চলে আসবে। যেহেতু হিন্দিভাষীর বলয় ভারতের রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে একটি নিয়ামক শক্তি, হিন্দি ভাষা এবং ভারতীয় পুঁজি এক অন্যের সম্পুরক হয়ে উঠেছে। এর সাথে ভারতীয় সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ভারতের মুম্বাইয়ে সিনেমায় একচেটিয়া প্রাধান্য হিন্দি ভাষার। ভারতীয় পুঁজি যতই শক্তিধর হবে, ততই হিন্দি ভাষা অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়বে। অন্যান্য ভাষা গৌণ হয়ে যাবে। ফলে, রবীন্দ্রনাথও ভারতবাসীর কাছে হয়ে পড়বেন অপাংক্তেয়। বিশ^পুঁজির পৃষ্ঠপোষকতা এবং দক্ষিণ ভারতের নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চেন্নাই এবং নতুন প্রযুক্তি কেন্দ্র কর্নাটক হিন্দি ভাষার চেয়ে ইংরেজী ভাষাকে প্রাধান্য দেয়। হিন্দির বিপরীতে ইংরেজী ভাষাকে নিয়ে আসার চেষ্টা হবে। ভবিষ্যতে হিন্দি এবং ইংরেজী ভাষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে।
সুতরাং ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় , সমাজ ও রাজনীতিতে, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলা ভাষা উপেক্ষিত থাকবে। এই উপেক্ষার বলী হবেন রবীন্দ্রনাথ। তাই, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভারতে তেমন একটা মাতামতি হবে না। ভারতের জন্য এবং ভারতীয় পুঁজির জন্য রবীন্দ্রনাথকে খুব একটি প্রয়োজন হবে না। কলকাতাতেও যে পুঁজি আছে তাঁর অধিকাংশই অবাঙালি ডালমিয়াদের দখলে। কলকাতার অধিকাংশ ভূমি অবাঙালিদের দখলে। তাই, খোদ কলকাতাতেই বাংলা ভাষা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ কলকাতা থেকেও নির্বাসিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তাই, ভারত তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যত ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসবে।
তবে, ব্যতিক্রম এই বাংলাদেশ। বাঙালির জন্য, বাংলাদেশের জন্য রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য। কারণ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে বাংলায় ইংরেজী চালু থাকলেও বাংলা হবে বাংলাদেশের প্রধান ভাষা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতি বিশ^ব্যাপী। জাতিসংঘ ঘোষিত ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সারা পৃথিবীর মানুষ মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে। অতএব, বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে বাঙালি বিকশিত হবে। বাংলা ভাষা আমাদের বাঙালিদের পথচলার সাথী। বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে অন্তরের মর্মমূলে।
বাঙালি অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই এগিয়ে যাওয়ার ফল স্বরূপ বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্রমাগত সমৃদ্ধি অর্জন করবে। এই সমৃদ্ধি ও উৎকর্ষ ধরে রাখতে হলে রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া চলবে না। রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া যেমন বাঙালির মধ্যবিত্তকে কল্পনা করা যায় না, তেমনি নি¤œবিত্তের ভেতরে প্রভাব আছে লালনের। গ্রামীণ সমাজের লালন, তথা বাউলরাও নাগরিক সমাজের রবীন্দ্রনাথ – যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। লালনের মর্মবাণী যেন রবীন্দ্র সাহিত্য, কবিতা ও সঙ্গীতে নবরূপে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে গিয়েছে। লালন এবং রবীন্দ্রনাথকে বিচ্ছিন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই, আমাদের মননশীলতায়, সাংস্কৃতিক জগতে, বিনোদনে, আত্মপরিচয়ে আমরা বার বার রবীন্দ্রনাথের কাছে আশ্রয় নেব। বাঙালি যতই এগিয়ে যাবে, ততই বিশ^-নাগরিক হয়ে উঠবে। সেখানেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাথে থাকবেন। কারণ, তিনি বিশ^কবি। তিনি বাংলা ভাষার কবি। তিনি বাঙালির কবি। যে ভাষায় লিখে তিনি বিশ^কবি হয়েছেন সে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে বাংলাদেশের বাঙালি। বাংলাদেশের বাঙালিদের সাথে যেমন বাংলাভাষা অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি বাংলা ভাষার , বাংলা সাহিত্যের, বাংলা সঙ্গীতের আত্মা হচ্ছেন এই রবীন্দ্রনাথ। সুতরাং রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালির অবিচ্ছেদ্য অংশই নয়, তার সাথে বাংলাভাষা, বাঙালি জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আত্মার ও অস্তিত্বের।

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 678 People

সম্পর্কিত পোস্ট