চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ১:১২ পূর্বাহ্ণ

লেখক : ডা. হাসান শহীদুল আলম, চর্ম ও যৌন রোগে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, পটিয়া, চট্টগ্রাম।

চিকিৎসা শ্রমিকের দিনলিপি সাবানের স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবহার, কতিপয় পরামর্শ

অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। অপরাহ্ন ঘনিয়ে এসেছে। পটিয়াস্থ চেম্বার। জানালার পাশর্^স্থ আমগাছের পাতার ফাঁকে ফাঁক টুকরো টুকরো অন্ধকার জমে উঠেছে। নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে। দৃষ্টি চেম্বারের ভেতরে ফিরিয়ে নিতেই দরজায় মধ্যবয়স্কা মহিলা আদাব জানালেন। সাথে তাঁর ত্রিশোর্ধ জাও এসেছেন। জা-এর অভিযোগসমূহের সার সংক্ষেপ হচ্ছে : বিগত মাসখানেক গোসলের পর গায়ে লাল লাল চাকা দেখা যাচ্ছে যেগুলো ঘণ্টাখানেক পর চলে যায়। তাঁর উভয় হাতের তালু এবং আঙ্গুলের ডগার কাছাকাছি খসখসে হয়ে গিয়েছে। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে জানালেন যে, বিদেশী গায়ের সাবান দ্বারা প্রায়ই গোসল করছেন ইদানীং। আপাতঃ রোগ নির্ণয় হলো কনটাক্ট্ ডারমাটাইটিস। যথারীতি ব্যবস্থাপত্রসহ রোগীনী ও মহিলার বিদায়ের পর চর্মরোগ জনিত ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। এ প্রসংগে পাঠকদের কাছে দেহত্বক এর স্তরসমূহ, গায়ের সাবানের উপাদানসমূহ কার্যকারিতা ও ব্যবহারের স্বাস্থ্যসম্মত নিয়মসমূহ ইত্যাদি ব্যাপারে তথ্যাদি পেশ করবো।
দেহত্বক এর স্তরসমূহ সম্পর্কে তথ্যাদি :
দেহত্বক হচ্ছে মানবদেহের সবচেয়ে বাহিরের আচ্ছাদন যাহা এপিডার্মিস ও ডার্মিস নামক প্রধান দুটি কোষীয় স্তর দ্বারা গঠিত এবং যাহা দেহের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশের মধ্যস্থলে অবস্থান করে দেহকে বহিঃপরিবেশের নানাবিধ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। দেহত্বক তিনটি স্তরে বিভক্ত : ১) এপিডার্মিস বা বহিঃত্বক বা বাহিরের স্তর ২) ডার্মিস বা অন্তঃত্বক বা ভেতরের স্তর ৩) সাবকিউটেনিয়াস কলা বা নীচের স্তর। এপিডার্মিস পাঁচটি উপস্তরে বিভক্ত এবং ডার্মিস দু’টি উপস্তরে বিভক্ত। সাবকিউটেনিয়াম কলা ডার্মিসের নীচে অবস্থিত। ত্বকের এই স্তর নি¤œবর্তী পেশী, কলা এবং অন্যান্য অঙ্গকে রক্ষা করে। ডারমিস এর ভিতর জালের মতো ছড়িয়ে আছে অসংখ্য রক্তনালী, শিরা,¯œায়ু অজ¯্র কোষ, ঘামের ও তেলের গ্রন্থি। ঘর্মগ্রন্থি রক্তের ভেতর থেকে শুষে নেয় পানি, লবন এবং কিছু রেচন পদার্থ। তারপর ঘাম আকারে ঘর্মনালীর মধ্যে বেরিয়ে আসে দেহের বাইরে। এই ঘর্ম গ্রন্থি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বিরাট ভূমিকা রাখে। তৈলগ্রন্থি থেকে বেরোয় তেলজাতীয় পদার্থ বা সেবাম। এই সেবাম ত্বক ও লোমকে মৃসণ রাখে।
মুখের ত্বক-এর স্তরসমূহের বিশেষত্ব :
মুখের ত্বকে অম্লত্ব, আর্দ্রতা, তৈলাক্তভাব দেহের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অধিকতর থাকে। তৈলগ্রন্থিসমূহের নালিকাসমূহের মুখ ত্বকের সকল স্তর ভেদ করে বাইরে অবস্থান করে। ত্বকের সংবেদনশীলতা অতিমাত্রায় বেশী থাকে। স্বাভাবিক অবস্থাতেও ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ও ভগ্নত্বক এর সংখ্যা থাকে অধিকতর। উপকারী ব্যাকটেরিয়া সর্বক্ষণ অবস্থান করে এবং ত্বকের প্রয়োজনীয় ভিটামিন প্রস্তুত করতে থাকে।
যৌনাংগের ত্বক-এর স্তরসমূহের বিশেষত্ব :
যৌনাংগের ত্বক এর স্তরসমূহে প্রচুর এপোক্রাইন গ্রন্থি থাকে যেগুলোর নিঃসরণ থেকে বিশেষ সুগন্ধ ছড়ায়। এ অঞ্চল সমূহে ঘর্মগ্রন্থি ও তৈলগ্রন্থি দেহের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশী থাকে। এ অঞ্চল সমূহের অম্লত্ব, আর্দ্রতা, তৈলাক্তভাব দেহের অন্যান্য অঞ্চল সমূহ থেকে অনেক বেশী থাকে। এ কারণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক স্বাভাবিক অবস্থাতেও অধিক সংখ্যার অবস্থান করে এবং ত্বকের প্রয়োজনীয় ভিটামিন উৎপন্ন করে।
সাবানের ইতিহাস :
সাবানের ইতিহাস ছয় হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন ব্যাবিলনে প্রথমবারের মতো সাবান তৈরী হয়েছিলো খৃস্টপূর্ব ২৪০০ শতকের দিকে। ব্যাবিলনীয় ছাড়াও মিসরীয়, গ্রিক ও রোমানরা সাবান ব্যবহার করতো। খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে প্রকাশিত চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক লেখা থেকে জানা যায় যে, সে যুগে মিশরে পশুর চর্বি ও সবজির তেলের সঙ্গে অ্যালকাইন লবণ মিশিয়ে অনেকটা সাবানের মতো দ্রব্য প্রস্তুত করা হতো। সে সাবান জাতীয় পদার্থ চর্মরোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হতো। ১৭৯১ সালের দিকে লে ব্লঁ নামের এক ফরাসী ব্যক্তি সাবান তৈরীর একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। ১৯৭০ সালে পৃথিবীতে প্রথম হাত ধোয়ার তরল সাবান বাজারজাত করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশ শাসন আমলে ইংলেন্ড এর লিভার ব্রাদার্স ভারতের জামসেদজী টাটা মাধ্যমে গায়ের সাবান ব্রান্ড আকারে সর্বপ্রথম ১৯১৮ সালে এদেশে বাজারজাত করে।
সাবান কি? কিভাবে প্রস্তুত করা হয়?
সাবান হচ্ছে উচ্চতর জৈব এসিড যেমন স্টিয়ারিক এসিড, পামিটিক এসিড ইত্যাদি এসিডের সোডিয়াম বা পটাশিয়াম লবণ। চর্বি বা তেলের সাথে অ্যালকালি বা ক্ষার ফুটিয়ে ফ্যাটি এসিডের লবণ তৈরী করা হয়। কস্টিক সোডার দ্রবণ ও তেলের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সাবান ও গ্লিসারিন তৈরী হয়।
গায়ের সাবান কি?
সাবানের সাথে বিশেষ কিছু রাসায়নিক দ্রব্য এমনভাবে মিশ্রণ করা হয় যাতে দেহত্বকের ধৌতকরণ স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সম্পন্ন হয় এবং দেহত্বক এর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সার্বক্ষণিক বজায় থাকে। এরূপ সাবানকে গায়ের সাবান বলা হয়।
গায়ের সাবানের উপাদানসমূহ :
ক) ত্বক পরিষ্কারক খ) আর্দ্রতা রক্ষা কারক গ) ফেনা উৎপাদক ঘ) ত্বক মোলায়েম কারক ঙ) চর্বি অপসারণ চ) উপরিতল প্রস্তুতকারক : উপরিতল প্রস্তুত করা যাতে ত্বকের বর্জ্য সমূহ দ্রবীভূত হয়ে দ্রবণের উপরের স্তরে ভাসতে থাকে এবং সহজে গড়িয়ে চলে যেতে পারে ছ) নির্যাস প্রস্তুত কারক : ত্বকের বর্জ্য পদার্থের তরল দ্রবণের সাথে চর্বি জাতীয় পদার্থের মিশ্রণের ফলে নির্যাস তৈরী করা যাতে সহজে আলাদা করা যায়।
গায়ের সাবানের ক্রিয়াকলাপের পর্যায়ক্রমিক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা : পানির সংস্পর্শে এসে সাবানের উপাদানসমূহ দ্রবীভূত হয়। উক্ত দ্রবণে অবস্থিত ফেনা উৎপন্নকারী উপাদানসমূহের বিক্রিয়ার ফলে ফেনা উৎপন্ন হয়। অতঃপর দ্রবণে অবস্থিত পরিষ্কারক উপাদান ত্বকের বর্জ্যসমূহকে আলাদা করে ফেলে। চর্বিজাতীয় বর্জ্যসমূহকে তরলীকৃত করে আলাদা করে ফেলে এবং বর্জ্য পদার্থের তরল দ্রবণের সাথে তরল চর্বি বজ্যকে মিশ্রিত করে নির্যাস তৈরী করে। দ্রবণে অবস্থিত উপরিতল প্রস্তুতকারক এর ক্রিয়ার ফলে ত্বকের বর্জ্যসমূহ দ্রবণের উপরের স্তরে ভাসতে থাকে এবং গড়িয়ে অপসারিত হয়। সাবানের দ্রবণে অবস্থিত আর্দ্রতা রক্ষাকারক ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা রক্ষা করে এবং মোলায়েমকারক ত্বককে মোলায়েম করে।
সাবনের ফেনা সাদা হয় কেন?
সাবানে থাকা সোডিয়াম স্টিয়ারেট অথবা পটাশিয়াম স্টিয়ারেট এর কারণেই সাবানের ফেনা তৈরী হয়। সাবান যখন গলে যায় তখন জল, বাতাস আর সাবানের মিশ্রণে তৈরী হয় বুদবুদ। সাবানের ফেনা হলো ছোট ছোট বুদবুদ এর সমষ্টি। ফেনার মধ্যে যখন আলো প্রবেশ করে তখন তা নানাদিকে প্রতিফলিত হতে থাকে। তাই সাবানের ফেনাকে স্বচ্ছ মনে হয়। এক্ষেত্রে আলো সব রংকে ভেদ করে যায়। কোন বস্তুর ক্ষেত্রে এমন হলে তার রং হয় সাদা। আর সে কারণেই সাবানের ফেনাকে সাদা মনে হয়।
ফেসওয়াশ, বডিওয়াশ এবং হে-ওয়াশ বলতে কি বুঝায়?
ক) ফেসওয়াশ হচ্ছে জেল, ক্রিম বা লোশন আকারে এমন সাবান যাহা মুখ পরিষ্কার করার জন্যে গায়ের সাবানের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় এবং যাহাতে মুখের ত্বকের স্বাস্থ্যবান পরিবেশ বজায় রাখার জন্যে উপযোগী বিভিন্ন উপাদান মিশ্রিত থাকে। খ) বডিওয়াশ হচ্ছে বিশেষভাবে নির্মিত তরল সাবান যাহা শরীরের অতি সংবেদনশীল স্থানসমূহ পরিষ্কার করার জন্যে গায়ের সাবানের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় যাহাতে শরীরের সংবেদনশীল স্থানসমূহের ত্বক গায়ের সাবানের রাসায়নিক উপাদানসমূহ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সেখানে স্বাস্থ্যপ্রদ পরিবেশ বজায় থাকে। গ) হেন্ডওয়াশ হচ্ছে বিশেষভাবে প্রস্তুত ব্যাকটেরিয়া নাশক, সংরক্ষণকারক ও সুগন্ধসৃষ্টি কারক দ্রব্যাদি সংযুক্ত তরল সাবান যাহাতে গায়ের সাবানের সকল উপাদান প্রয়োজনীয় মাত্রায় বজায় থাকে এবং যাহা হাতের ত্বকের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকে।
ফেসওয়াশ-এর উপাদানসমূহ কি কি? কিভাবে ক্রিয়া করে?
ফেসওয়াশ-এ অবস্থিত ফেনা উৎপাদক মুখ ধোয়ার পানিয় সাথে বিক্রিয়া করে ফেনা উৎপন্ন করে এবং ত্বকের কোষসমূহকে বাষ্পায়িত করে যাতে লোমকূপের ছিদ্র সমূহের মুখ অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য দ্বারা বন্ধ হয়ে থাকলে সেগুলোর মুখ খুলে যায়। অতঃপর ভগ্ন ত্বক এর ক্ষুদ্রাকৃতির টুকরোসমূহ ভগ্নত্বক অপসারক দ্বারা অপসারিত হয়। সে সঙ্গে নির্যাস প্রস্তুতকারক ত্বকের বর্জ্য পদার্থের তরল দ্রবণের সাথে চর্বি জাতীয় বর্জ্যপদার্থসমূহকে মিশ্রিত করে নির্যাস তৈরী করে যা সহজেই ত্বক থেকে আলাদা হয়ে যায়। পাশাপাশি ফেসওয়াশ এ অবস্থিত ত্বকস্তর ছিন্ন হওয়া রোধক, ত্বক কনডিশনার, আর্দ্রতা রক্ষাকারক, মোলায়েম বা নমনীয় কারক এবং পানিরোধক গুণাবলী সম্পন্ন উপাদানসমূহ যথাক্রমে ত্বকস্তর ছিন্ন হওয়া রোধ করে, ত্বককে কনডিশনড করে তোলে, ত্বকের প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা রক্ষা করে, ত্বককে মোলায়েম বা নমনীয় করে এবং ত্বকের প্রয়োজনীয় পানির মাত্রা রক্ষার জন্য পানি অপসারণ রোধ করে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, মুখের ত্বকের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রেখে ফেসওয়াশ শুধুমাত্র বর্জ্য পদার্থ সমূহকে অপসারিত করে।
গায়ের সাবান ও ফেসওয়াশ এর মধ্যে পার্থক্যসমূহ : ক) উপাদানগত : লোমকূপের ছিদ্র বাধামুক্ত কারক, ত্বক স্তর ছিন্ন হওয়া রোধক, ভগ্নত্বক অপসারক, পানি রোধক, বাষ্পায়িত কারক Ñ এ সমস্ত উপাদান গায়ের সাবানে থাকে না। ত্বক পরিষ্কারক, উপরিতল প্রস্তুতকারক, চর্বি অপসারক Ñ এ সমস্ত উপাদানসমূহ ফেসওয়াশ এ থাকে না। খ) রাসায়নিক বিক্রিয়াগত : ত্বকের আর্দ্রতা, তৈলাক্তভাব ও পিএইচ ফেসওয়াশ ব্যবহারে পরিবর্তিত হয় না। কিন্তু গায়ের সাবান এগুলোকে পরিবর্তন করে। গ) কার্যকারিতা অনুযায়ী পার্থক্য : গায়ের সাবান ত্বকের ময়লা এবং তৈলাক্তভাব দুটোই দূরীভূত করে। অপরপক্ষে ফেসওয়াশ ত্বকের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য দ্রবণে উপরিতল প্রস্তুত করে না এবং ত্বকের চর্বি অপসারণ করে না। ঘ) ব্যবহারিক পার্থক্য : গায়ের সাবান মুখম-ল, যৌনাংগ ও অন্যান্য সংবেদনশীল তৈলাক্ত ত্বকে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এ সমস্ত জায়গায় ফেসওয়াশ ব্যবহার করা যাবে।
ফেসওয়াশ ক্রয় করার সময় যা দেখতে হবে :
১। ব্যবহারকারীর ত্বকের ধরন জানতে হবে, ২। ত্বকের দু’ধরনের সাথে উপযোগী ফেসওয়াশ বেছে নিতে হবে, ৩। উপাদানসমূহ সঠিক আছে কিনা দেখতে হবে।
ফেসওয়াশ ব্যবহারে যা মনে রাখতে হবে : ১। অতিরিক্ত ব্যবহার করবেন না, ২। কয়েকটি ফেসওয়াশ একসঙ্গে ব্যবহার করা যাবে না, ৩। বেশী ফেনা তৈরী করতে যাবেন না, ৪। ত্বকে ঠা-াভাব বা জ¦ালাপোড়ার ভাব দেখা গেলে উক্ত ফেসওয়াশ বর্জন করবেন, ৫। প্রথমে পানিতে মুখ ভিজিয়ে তারপর ফেসওয়াশ লাগাবেন, ৬। তিনদিন পর পর সপ্তাহে দু’বারে এর বেশী ব্যবহার করবেন না, ৭। মুখ মোছার জন্য হালকা পাতলা তোয়ালে ব্যবহার করবেন, ৮। মুখ ধোয়ার তিন মিনিট পর শুষ্ক ত্বকে ক্রিমসহ ময়েশ্চারাইজার লাগাবেন এবং তৈলাক্ত ত্বকে ক্রিম ছাড়া ময়েশ্চারাইজার লাগাবেন।
গায়ের সাবান ব্যবহার সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণাসমূহ : ১)সাবান সহকারে গোসলে অতিরিক্ত গরম পানি ত্বক বেশী পরিষ্কার করবে, ২) প্রতিদিন গায়ে সাবান মাখা উচিৎ ত্বককে স্বাস্থ্যবান রাখতে হবে, ৩) অ তিরিক্ত ফেনা না হওয়া পর্যন্ত সাবান ঘষে যেতে হবে, ৪) অতিরিক্ত ফেনা হওয়া মানে অতিরিক্ত পরিষ্কার করা, ৫) সাবান মেখে খসখসে কাপড় দ্বারা ত্বক ঘসলে ত্বক বেশী পরিষ্কার হবে, ৬) গায়ের সাবান মুখে ঘসা যাবে, ৭) এন্টি ব্যাকটেরিয়াল যুক্ত সাবান প্রতিদিন ব্যবহার করলে ত্বক জীবাণুমুক্ত থাকবে, ৮)সাবানে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক ভিটামিন যুক্ত থাকলে ত্বকে উক্ত ভিটামিন শোষিত হবে, ৯) বিদেশী সাবান মানেই উত্তম সাবান, ১০) যৌনাংগে প্রতিদিন সাবান ঘষলে সে স্থানসমূহ জীবানুমুক্ত থাকবে।
গায়ের সাবান এর অপব্যবহারজনিত ক্ষতিসমূহ : ১) অতিরিক্ত গরম পানি দেহত্বককে সংবেদনশীল করে তুলবে এবং ত্বকের আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, তৈলাক্তভাব এর স্বাভাবিকতা নষ্ট করে দেবে, ২) প্রতিদিন গায়ে সাবান মাখলে বা ঘন ঘন এন্টিব্যাকটেরিয়াল যুক্ত সাবান ব্যবহার করলে দেহত্বক বিশেষতঃ যৌনাংগে উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক মারা যাবে এবং ত্বকে ভিটামিন এর অভাব হবে। এ ছাড়া প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যাবে এবং বিবিধ চর্মরোগ বেড়ে যাবে, ৩) সাবান মেখে খসখসে কাপড় দ্বারা ঘষলে ত্বকের কোষ ছিঁড়ে যাবে, ভগ্নত্বক বেড়ে যাবে, ত্বক অনুভূতিহীন ও মোটা হয়ে যাবে।
মুখের ত্বক গায়ের সাবান ব্যবহারে কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয় : সাবানের ক্ষারীয়ভাব মুখের ত্বকের অম্লীয়ভাব কমিয়ে দেয়। এতে ত্বকের পিএইচ বেড়ে যায়। এতে ভিটামিন প্রস্তুতকারী উপকারী ব্যাকটেরিয়া সমূহ মারা যায়। এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যায়। সংক্রমণ বাড়ে। ব্রন ও চর্মরোগ বেড়ে যায়। গায়ের সাবান মুখের ত্বকের আর্দ্রতা ও তৈলাক্তভাব কমিয়ে দেয়। এতে ত্বকের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ত্বক নমনীয়তা হারায়। সাবানের মধ্যে থাকা ফ্যাটি এসিড মুখের ত্বকের লোমকূপের ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। মুখের ত্বকের সংবেদনশীলতা বাড়ে। বিবিধ চর্মরোগ বাড়ে।
যৌনাংগের ত্বক গায়ের সাবান দ্বারা কেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
যৌনাংগের চারপাশের ত্বকে প্রচুর পরিমাণে এপোক্রাইন গ্রন্থি থাকে। গায়ের সাবানের ক্ষারীয়ভাবের কারণে এ অঞ্চলের ত্বকের অম্লত্ব কমে যায় বিধায় উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকসমূহ মারা পড়ে। এতে সংক্রমণ বাড়ে। এ অঞ্চলের আর্দ্রতা ও তৈলাক্তভাব পরিবর্তিত হওয়ায় গ্রন্থির নালিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নিঃসরণ কমে যায়, ভগ্নত্বক বেড়ে যায়, যৌনাংগের স্বাভাবিক গন্ধ বজায় থাকে না। আর্দ্রতা বেশী কমে গেলে মলদ্বারে ত্বক ফেটে গিয়ে রক্ত পাত হতে পারে। বিশেষ করে লিঙ্গের অগ্রভাগ, যোনীদ্বার, পায়ু ইত্যাদি অঞ্চলে এ ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
বিভিন্ন ধরনের সাবানের ব্যবহার : ১)সাধারণ সাবান বা বিউটি বার : শুষ্ক ত্বকের জন্য প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, ২) ময়েশ্চারাইজিং সাবান : শুষ্ক ত্বকের জন্য এ সাবান সহনীয়। এটিতে ক্ষার কম থাকে। পিএইচ নিউট্রাল থাকে। তেলের পরিমাণ বেশী থাকে। এ ধরনের সাবান ত্বককে আর্দ্র করে। ৩) গ্লিসারিনযুক্ত সাবান : সংবেদনশীল ত্বকের জন্য উপযোগী ৪) ডিওডারেন্ট বা গন্ধনাশক সাবান : ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা উচিত নয়। এটিতে এন্টি ব্যাকটেরিয়াল থাকে। মুখের ত্বকে এটি কখনও ব্যবহার করা যাবে না ৫) ভেষজ বা মেডিকেটেড সাবান : এটিতে ওষুধ সংযুক্ত থাকে। ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
সাবান ক্রয় করার সময় যা মনে রাখতে হবে :
১) ব্যবহারকারীর ত্বকের ধরন মেনে নিতে হবে, ২) ত্বকের ধরন অনুযায়ী সাবান নির্বাচন করতে হবে, ৩) মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ দেখে নিতে হবে
সাবান প্রস্তুতকারকদের প্রতি পরামর্শ : ১)সাবানে ব্যবহৃত রাসায়নিক ও উপাদানসমূহের নাম এবং পরিমাণ প্যাকেটের উপরে বাংলায় ও ইংরেজীতে স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে, ২) কি ধরনের ত্বকের জন্য এটি ব্যবহারযোগ্য তা উল্লিখিত থাকতে হবে, ৩) মেয়াদউত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টাক্ষরে লিপিবদ্ধ রাখতে হবে।
উপসংহার : দেহত্বকের স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে হলে এবং সাবান সৃষ্ট ক্ষতি থেকে দেহত্বককে রক্ষা করতে হলে দেহের পরিচর্যায় সাবানের স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবহার সম্পর্কে সাবান প্রস্তুত কারক এবং সাবান ব্যবহারকারী সকলেরই সচেতন হওয়া উচিৎ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 809 People

সম্পর্কিত পোস্ট