চট্টগ্রাম সোমবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২০

৩ মে, ২০১৯ | ১২:৫৮ পূর্বাহ্ণ

তাপস কুমার নন্দী

স্বপন ভট্টাচার্য : সমাজকাক্সিক্ষত এক ব্যক্তিত্ব

 

স্বপন ভট্টাচার্য – মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য নামে তিনি সমধিক পরিচিত। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা নিজের কীর্তিকে, নিজের কর্মময় জীবনের বর্ণাঢ্য সময়টাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখতে ভালবাসেন। তাঁদের ধারণা, নিজের কর্ম এবং নিজের জীবনের ঘটনা প্রবাহ একান্ত নিজের। তাই তাঁরা নীরবে বিনয়ের সাথে জীবনের সুন্দর ঘটনা প্রবাহকে আড়াল করে চলতে পছন্দ করেন। জীবনের এই চলমান ধারাকে অব্যাহত রেখে যিনি আপন অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে আদৃত হয়েছেন তিনি আমাদের প্রিয়জন স্বপন ভট্টাচার্য। যাঁরা তাঁকে চেনেন, জানেন এবং তাঁর জীবনধারার সাথে পরিচিত সকলে একবাক্যে স্বীকার করবেন সময়ের এ কালবেলায় শিক্ষাবিদ মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য নিরহংকারী একজন আদর্শ পুরুষ।
ব্যক্তি হিসেবে স্বপন দা অতুলনীয়। তিনি অত্যন্ত খাঁটি মানুষ এবং অতিশয় ন¤্র ও ভদ্র। এলাকার অনেকেই তাঁকে ‘সোনার মানুষ’ বলতেন। বাঁশখালীর আপামর জনগণ ভাবতেন, স্বপন বাবু নিতান্ত ভালমানুষ। যিনি সত্যিকার অর্থে সামাজিক দায়বদ্ধ যথার্থ সমাজ দরদী ও পরহিতব্রতী। তাঁর অন্যসব পরিচয়ের পাশে নিরঙ্কুশ এই পরিচয়েই তিনি আপামর জনসাধারণের কাছে সম্মান ও নেতৃত্বের অধিকার পেয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন, স্বপনদা স্বভাবগতভাবে যে পরিপূর্ণতাকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তা তার চাকুরীতে, শিক্ষকতায়, রাজনীতির অঙ্গনে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনে এক আদর্শ ও আকাক্সক্ষার পরিবৃত্তিতে হয়ে উঠেছে যেন এক নিরন্তর “ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটাবার খেলা।”
স্বপন দা’কে আমি যতটুকু দেখেছি, যতটুকু জেনেছি, তিনি ছিলেন এক বিস্ময়। আদর্শে ছিলেন তিনি আপোষহীন, আচরণে ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, কখনো বজ্রের মতো বহ্নিগর্ভ, আবার কখনো কমলপর্ণের মতো সুকোমল। তাঁর চক্ষুজুড়ে দেখার তৃষ্ণা ছিল, তৃপ্তি ছিল না।
বক্ষ জুড়ে জানার ইচ্ছা ছিল, অন্ত ছিল না। সম্পদের সুখশয্যা ছিল, আসক্তি ছিল না। সম্মানের প্রাচুর্য ছিল, বিকার ছিল না। দানের অধিকার ছিল, অহংকার ছিল না।
স্বপন দা সংসারের মধ্যে ছিলেন, কিন্তু সংসার তাঁর মধ্যে ছিল না। তাঁর সুযোগ্য সহধর্মিনী সর্বজন শ্রদ্ধেয়া মঞ্জু ভট্টাচার্য একজন আদর্শ গৃহিনী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ সময় তিনি শিক্ষকতায় রত রয়ে সমাজে আলো ছড়িয়েছেন। স্বামীর অন্তকরণের অভিপ্রায়কে উপলব্ধি করার মতো বিচক্ষণতা তাঁর ছিল। স্বামীর ইচ্ছাকে প্রাণপণে সম্মান করাই ছিল তাঁর ব্রত।
গুণী ও স্বচ্ছ একজন মানুষ স্বপন ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন হৃদয়বান ও অমায়িক। একজন স্বল্পভাষী মানুষ। তিনি সুন্দর করে গুছিয়ে অল্পতেই অনেক প্রকাশ করতে পারতেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, যা বলতেন নির্ভয়ে বলতেন। স্পষ্ট এবং সত্য বলা তাঁর অভ্যাস ছিল। দেশ, সমাজ, ধর্ম এবং চলমান জীবন নিয়ে তিনি সর্বদা ভাবতেন। পরমত সহিষ্ণুতা তাঁর একটি অন্যতম বড়গুণ ছিল। তিনি ছিলেন সমস্ত গতানুগতিকতার উর্ধ্বে। তিনি ছিলেন একজন পরীক্ষিত সমাজ হিতৈষী ব্যক্তিত্ব। তাঁকে সবসময় দেখেছি ধীর, স্থির, তারুণ্যের দীপ্ত, নিরাভিমান, অজ¯্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, সহৃদয় ও পরম হিতৈষী হিসেবে। বিশেষ করে গ্রামীণ চলমান পরিস্থিতির সঠিক বিশ্লেষন ও যথাযথ সিদ্ধান্ত দিয়ে গ্রামবাসী সকলের অন্তর জয় করেছিলেন। তাঁর সুন্দর রুচিশীল মনোবাসনা তাঁকে করেছিলেন উদার, বিন¤্র, সংবেদনশীল, শান্তি ও সুন্দরের সন্ধানী।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দিনের পর দিন, রাতের পর রাত বিশেষ করে বাঁশখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানমালায় তাঁর নিরন্তর উপস্থিতিতে তিনি গ্রামবাংলার গণমানুষের অত্যন্ত প্রাণের মানুষ হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশেষ করে ধর্মীয় ভাবাদর্শে প্রচার ও প্রসারে, তার বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য ছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার মূর্ত প্রতীক। মঠ মন্দিরের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করতো।
জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য এর চরিত্রের বিস্ময়ের ব্যাপারটি হলো তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তির সাথে হৃদয়বৃত্তির মিলন। তাঁর মনটি ছিল স্ফটিকশুভ্র, একটু গভীরভাবে দেখলে অন্তঃস্থল পর্যন্ত দেখা যেত। তিনি ছিলেন অজাতশত্রু। তাই স্বপন ভট্টাচার্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে সমাদৃত ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি উপলব্ধি করেছি, সর্বস্তরের মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ মেলামেশার ফলে তাঁর আচরণে ও ব্যবহারে মধ্যে দেখা যেত উদ্ধত আভিজাত্যের পরিবর্তে উদার মাধুর্য, স¯েœহ, আত্মীয়তা। অন্যদিকে সবার সঙ্কোচ এবং গোপন হিংসার পরিবর্তে অসঙ্কোচ প্রসন্নতা ও শ্রদ্ধাঙ্কিত গুণমুগ্ধতা, তাঁর বিদ্যা ও মনীষা গভীরতর ও তীক্ষ্মতর।
মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য কোন সময়ই ধর্মবিচারে মানুষকে মূল্যায়ন করতেন না। জ্ঞানী ও উন্নত চরিত্রের লোকজন ছিল তাঁর পছন্দের। অন্য ধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা এবং পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা তাঁর চরিত্রের আরো একটি উন্নত দিক। নিজে সব সময় ধর্ম, কর্ম ও সামাজিকতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি ছিলেন এ সমাজের আদর্শের দর্পণ। তাঁর ছড়ানো আলোতে অনেকে আলোকিত হয়েছেন। বর্তমান সময়ে ক্ষণজন্মা মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য এর মতো ব্যক্তির খুবই প্রয়োজন।
সংসার জীবনে স্বপন কুমার ভট্টাচার্য তিনকন্যার জনক। তাঁর কন্যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কন্যারা চলে গেছেন স্বামীর সংসারে। সামাজিক জীবনে তিনি আমার অতীব আপনজন। গেল দু’বছর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে তার নাম অন্তর্ভুক্তি করার প্রস্তাব এলো, তখন তার সমাজের প্রতি উদার মানসিকতা আমি দেখেছি। তিনি বাঁশখালী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সম্মানিত সদস্য ছিলেন।
কোন অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতি আমি দেখি নেই। স্বল্প সময়ে তার কৃতকর্মের জন্য তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশ থেকে অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস এ অ্যাওয়ার্ড তিনি দেখে যেতে পারেননি। অশ্রু বিজরিত কণ্ঠে স্বপন দা’র আদরের মেয়ে মিশু ঐদিন দুদক থেকে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন। আমি তাঁর প্রশংসা করা এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা আমার নৈতিক কর্তব্য। এটা না করলে সৃষ্টিকর্তার দৃষ্টিতে অকৃতজ্ঞতার নামান্তর। আমার অত্যন্ত ভাল লাগছে বীর মুক্তিযোদ্ধা এর পরলোকগত প্রাণকে এখনো মানুষ ভালোবাসে। সমাজের জন্য কতো ত্যাগ, মানুষের জন্য কতো করলে ব্যক্তি স্বপন ভট্টাচার্য এর জন্য একটি সংকলন হতে পারে। এটাই তার প্রমাণ।
জয়তুঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বপন ভট্টাচার্য।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 336 People

সম্পর্কিত পোস্ট