চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১ মে, ২০১৯ | ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

প্রফেসর ড. মো. আবু তাহের

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও আমাদের করণীয় প্রসঙ্গ মে দিবস

এক. মে দিবস এলেই মনে পড়ে শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস এবং তাদের অধিকার ও রুটি-রুজি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে সংগঠিত শ্রম আন্দোলন-সংগ্রামের কথা। অনিবার্যকারণে এসে যায় মে দিবসের মূল চেতনা কি ছিল, বর্তমান বিশ্বায়ন প্রেক্ষাপটে তা কতটুকু অর্জিত হয়েছে অথবা স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও মহান মে দিবসের চেতনা বাংলাদেশে কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে সে সব কথা। উপরন্তু যে দেশে লক্ষ কোটি দক্ষ ও অদক্ষ, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকার যে কোন শর্তে কাজের জন্য নির্দ্বিধায় নিজের মেধা ও বিবেক বিকিয়ে দেয়, সে দেশে মে দিবসের চেতনা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তা ভেবে দেখার বিষয়।
মে দিবসের চেতনা বলতে বুঝায় বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, প্রশাসক/ব্যবস্থাপকদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বৃদ্ধি পাবে এবং সর্বোপরি দৈনিক আট ঘন্টা কর্মদিবস যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে। বিশ্বায়নের কথা বলে শিল্প, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের দায়বদ্ধতা যতই হ্রাস করা হোক না কেন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করা, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, শ্রমজীবী মানুষ যাতে শোষণ বঞ্চনার শিকার না হয় সে দিকে লক্ষ্য রাখা, দেশের উন্নয়নে সকলের ভূমিকা স্বীকার করা এবং উন্নয়নের সুফলে সকলের ন্যায্য প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে বর্তায়। বস্তুতঃ রাষ্ট্রের এ ভূমিকার ব্যত্যয় ঘটায় ১৮৮৬ সালে মে দিবসের সূত্রপাত ঘটে।
দুই. বাংলাদেশে প্রতি বছর মহান মে দিবসের অনুষ্ঠানটি পালিত হয়ে থাকে। শহরাঞ্চলে শ্রমজীবী মানুষ মে দিবসের কিছুটা তাৎপর্য উপলদ্ধি করলেও এদেশের গ্রামাঞ্চলে যে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করে তাদের মে দিবস সম্পর্কে ধারণা নেই বললেই চলে। বিগত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে লুটেরা মুৎসুদ্দী পুঁজির দাপটে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে একজন শ্রমিক ৮ ঘন্টা শ্রমের বিনিময়ে যে সাপ্তাহিক মজুরি পায় তা দিয়ে সংসার চালানো খুবই কষ্টসাধ্য। ফলে, শ্রমিকরা ৮ ঘন্টার অনেক বেশী সময় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ পোশক শিল্প শ্রমিকদের কথা বলা যায়। আমাদের পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের শতকরা ৯৫ ভাগ গরীব ও গ্রামীণ মহিলা। এসব অসহায় মহিলাদের কম মজুরি দিয়ে আমাদের চোখের সামনেই দৈনিক ১৪/১৫ ঘন্টা খাটানো হচ্ছে। অধিকাংশ শিল্প মালিক স্বল্প মজুরি দিয়ে শ্রমশক্তি ক্রয়, বিশেষ রেটের চেয়ে কম মজুরি দিয়ে ওভার টাইম করানো, এমনকি কোন নিযুক্তি পত্র না দিয়ে তাদের শ্রম ব্যবহার করার মত অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করছে হোটেল, রেঁস্তোরা ও ব্যক্তি মালিকানাধীন দোকান বা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও।
শিশু শ্রমিকদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এরা হাটে-বাজারে কিংবা রাস্তার পার্শ্বে বা বিভিন্ন পার্কে পলিথিন বিক্রি, মুটেগিরি থেকে শুরু করে জুতো পালিশ, ইট ভাঙ্গা, ফুল বিক্রি, চা দোকানো পানি টানা পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। অথচ, বিনিময়ে দু-বেলা পেট ভরে খাওয়ার টাকা এদের ভাগ্যে জোটে না। রাজধানী শহরে যখন দেখি একটি পরিবার বছরের পর বছর রেল লাইনের ধারে বস্তিতে বসবাস করে; একজন ফেরীওয়ালা নজরানা দিয়ে ফুটপাতের পসরা সাজিয়ে বসে পুলিশের গলাধাক্কার আতঙ্কে থাকেন; একজন ভিখারী রাজপথের ক্রসিংয়ে লালবাতির কাছে থেমে যাওয়া গাড়ির কাছে টোকা দিয়ে হাত পাতেন; তাদের কাছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কোন মূল্য নেই। তারা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (গএউং) কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝএউং) কিছুই বোঝে না। বাংলাদেশের সংবিধানে বিধৃত ধারাগুলো তাদের কাছে অস্পষ্ট। তাদের কাছে দু’বেলা ভাত ও মাথা গোঁজার ঠাঁই-ই যথেষ্ট। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও কি আমরা সেটার নিশ্চিয়তা দিতে পেরেছি!
তিন.
বর্তমানে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের পর তৃতীয় পেরিয়ে আমরা পা ফেলেছি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দরজায়। এ বিপ্লবে প্রযুক্তির গতি ও বিস্তার কর্মসংস্থানের উপর বেশী আঘাত হানবে। অধ্যাপক ক্লাউস শোয়াব তা মোকাবেলার জন্য দু’টো সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমতঃ প্রযুক্তি শ্রমের জায়গা দখল করে নিলে কর্মীবাহিনী হয় বেকার হয়ে পড়বে কিংবা অস্তিত্বের লড়াইয়ে নিজের দক্ষতাকে বিকল্প পেশায় নিয়োজিত করবে। দ্বিতীয়তঃ নিত্য নতুন পণ্য ও সেবা উদ্ভাবনের ফলে সৃষ্টি হবে নতুন নতুন ব্যবসা, শিল্প ও পেশা। অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে কর্মহীনতা সৃষ্টি করলেও ভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও সম্পদ বৃদ্ধি করবে। ফলে, একদিকে মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান। শোয়াব তাঁর “ঞযব ঋড়ঁৎঃয ওহফঁংঃৎরধষ জবাড়ষঁঃরড়হ” শীর্ষক গ্রন্থে ভবিষ্যৎবাণী করেছেন যে, “চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আগাম ফসল হিসেবে ২০২৫ সলের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের পরিধেয় বস্ত্র কিংবা চশমার সাথে ইন্টারনেট সংযুক্ত থাকবে, পাওয়া যাবে মানুষের শরীরে স্থাপনযোগ্য মোবাইল ফোন, ৯০ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করবে, আমেরিকায় ১০ শতাংশ গাড়ী হবে চালকবিহীন, ৩০ শতাংশ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের অডিট হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট দিয়ে, এমনকি কোম্পানীর বোর্ডের একজন পরিচালক হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট”।
এ ধরণের আরো বহু অবিশ্বাস্য উদ্ভাবন ও আবিষ্কার পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিবে। প্রযুক্তির এ অভাবনীয় অগ্রগতি, সাফল্য, বিস্তার ও কর্মসংস্থানের উপর এর প্রভাব মানুষে মানুষে, দেশের সাথে দেশের বৈষম্যের মাত্রা অনেকাংশে বৃদ্ধি করবে। কেননা, ইতিমধ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রযুক্তির উৎকর্ষে স্বল্পোন্নত তথা উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থনৈতিকভাবে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে। এমতাবস্থায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবেলায় আমাদের কালক্ষেপণ করার কোন সুযোগ নেই। বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করে আমাদের বিশাল অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ কর্মীবাহিনীর দক্ষতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির দ্রুতগামী ট্রেনে আমরা চড়তে পারব না। ফলে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের জন্য যেমন অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে তেমনি মে দিবসের মূল চেতনা বাস্তবায়ন অনেকটা অধরাই থেকে যাবে।
চার.
মুক্তিযুদ্ধোত্তর প্রায় পাঁচ দশক একটি জাতির জীবনে কম সময় নয়। অত্যন্ত কম সময়ে জাপান, কোরিয়া, চীন, মালোয়েশিয়া, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্র তাদের অর্থনীতিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গেছে। অথচ পারস্পারিক হানাহানি ও সহিংসতা, দুর্নীতি এবং সত্যিকারের আইনের শাসনের অভাবে এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের আর্থ-সামাজিক মুক্তি যথাযথভাবে সুনিশ্চিত হয়নি। তবে, বর্তমানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সাথে কেন সামাজিক ও আয় বৈষ্যম্য বাড়ছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ অবস্থা থেকে সাধারণ মানুষের মুক্তির নিমিত্তে দায়ী উপাদানগুলো চিহ্নিত করে সে মোতাবেক দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। উপরন্তু শ্রমিকদের অস্তিত্ব ও শিল্পায়নের প্রয়োজনে ট্রেড ইউনিয়নসমূহকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মে দিবসের প্রেরণায় উজ্জীবিত এবং শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আন্দোলনকে আরো কার্যকর ও সৃজনশীল করা যেতে পারে।
আর, এ ক্ষেত্রে বহুধা বিভক্ত ট্রেড ইউনিয়ন, সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতৃত্ব, শ্রমিক নেতাদের দালালী এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও দলবাজী পরিহার করে এ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক মনস্ক শ্রম আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় চাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং শিল্পের বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শ্রমজীবী মানুষকে বৃত্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় এনে দক্ষতা উন্নয়ন ত্বরাণি¦ত করতে হবে। নইলে আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে পারব না। আর এক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই সক্রিয় (ঈধঃধষুংঃ) ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মহান মে দিবসের আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং সত্যিকারঅর্থে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগ্রতির চেতনায় বিশ্বাসী সকলের মধ্যকার জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তুলে সম্মিলিত কর্মপ্রয়াসের উদ্যোগ গ্রহণপূর্বক দ্রতগতিতে এগিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
মহান মে দিবস চিরঅম্লান হোক।

লেখক : প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি; ডিরেক্টর, বোর্ড অব ডিরেক্টরস্, জীবন বীমা কর্পোরেশন এবং একাডেমিক এডভাইজার, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 373 People

সম্পর্কিত পোস্ট