চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

২৮ এপ্রিল, ২০১৯ | ১:৫১ পূর্বাহ্ণ

মো.নিজাম উদ্দিন লাভলু

মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীর সেনানী শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের বীর উত্তম

পূর্ব প্রকাশিতের পর

এ অবস্থায় পার্বত্য এলাকায় পূর্ব ট্রেনিংবিহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রসদ এবং গোলাবারুদ সংকটও দেখা দেয় তাদের। এই প্রতিকূল ও দুর্বল মুহূর্তে ২৭শে এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পাকবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সৈন্য (১৩৬ জন) একটি মিজো ব্যাটালিয়নকে (১০০০ জন) সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ চালায় মহালছড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের উপর। মেজর মীর শওকত এবং চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের প্রকৌশলী ইসহাকের নেতৃত্বে ঐ সময় শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করা হচ্ছিল।
এরমধ্যে পাকবাহিনী হেলিকপ্টারযোগে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আরও এক কোম্পানি সৈন্য এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়।
দুই পক্ষের প্রচ- এ যুদ্ধের মধ্যে বেলা তিনটায় ক্যাপ্টেন কাদের-এর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মহালছড়ি এসে পৌঁছে। অসীম সাহস আর সুদক্ষ যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে টগবগে তরুণ সেনা অফিসার কাদের সঙ্গীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুর মোকাবিলায়। তাদের এ সম্মিলিত কঠিন প্রতিরোধের মুখে মিজো বাহিনী প্রথম অবস্থায় পিছু হটতে শুরু করে। এতে পাকসেনারা বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা মিজোদের সামনে রেখে একটার পর একটা আক্রমণ চালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। প্রতিবারই মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা জবাব দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে শত্রুদের। চোখের সামনে সঙ্গীদের মৃত্যু দেখে আতঙ্কিত ভীতসন্ত্রস্ত মিজোরা সামনে এগুতে না চাইলে পাকসেনারা অস্ত্র তাক করে এমন ভাব দেখাতো যে, অগ্রসর না হয়ে পিছু হটতে চাইলে তারা নিজেরাই মিজোদের গুলি করে হত্যা করবে। এ অবস্থায় মিজো ও চাকমা মুজাহিদরা ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে যায়। তিন চারগুণ অধিক সংখ্যক শত্রুপক্ষ বীভৎস উল্লাস ধ্বনি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চারিপাশ ঘিরে ফেলে। চরম এ বিপজ্জনক অবস্থায় সহযোদ্ধারা পশ্চাদাপসরণের পরামর্শ দেন ক্যাপ্টেন কাদেরকে। কিন্তু অকুতোভয় তেজোদীপ্ত বীর সেনানী সহযোদ্ধা ছাত্র শওকত, ফারুক এবং দুই ইপিআর সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি এলএমজি’র অবিরাম গুলি বৃষ্টি কোণঠাসা করে ফেলে শত্রুদের।
এই চরম মুহূর্তে হঠাৎ এক সহযোদ্ধার এলএমজি’র ফায়ারিং বন্ধ হয়ে যায়। শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার জীবনকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখার তিনটি এলএমজি’র একটি অচল হয়ে পড়ায় অস্থির হয়ে পড়েন ক্যাপ্টেন কাদের। মেরামতের জন্য দ্রুত অস্ত্রটি তাঁর কাছে নিয়ে আসার নির্দেশের পরও সহযোদ্ধা শওকতের আসতে খানিক দেরি হওয়ায় যুদ্ধরত কাদের নিজেই ক্রলিং করে এগিয়ে যেতেই শত্রুর অস্ত্রের কয়েকটি গুলি এসে বিঁধে তাঁর ডান বগলের কয়েক ইঞ্চি নিয়ে এবং পেটের বাম পাশে। গুলিবৃষ্টির মধ্যেই গুরুতর আহত কাদেরকে বহন করে একটু নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন শওকত, ফারুক ও ইপিআরের ড্রাইভার আব্বাস। সেখান থেকে চিকিৎসার জন্য জিপ গাড়িযোগে রামগড় আসার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এ তরুণ বীরযোদ্ধা। তখনও তাঁর বিয়ের মেহেদীও হাত থেকে মুছে যায় নি। ঐদিন শেষ বিকেলে সহযোদ্ধা ফারুক, শওকত ও ড্রাইভার আব্বাস বীর শহীদের মরদেহ নিয়ে রামগড় এসে পৌঁছলে এখানে সকলের মাঝে নেমে আসে শোকের ছায়া। সন্ধ্যার প্রাক্কালে রামগড় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ মোস্তফার পরিচালনায় শহীদ কাদের এর জানাজার নামাজ শেষে কেন্দ্রীয় কবরস্তানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
শহীদ কাদেররের পরণের রক্তমাখা কাপড়-চোপড়, হাতের আংটি ও ঘড়ি সংরক্ষণ করে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তারা। রামগড় পতনের পর এসব জিনিসপত্র ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে চীফ অফ মেজর মোহাম্মদ আব্দুর রবের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে তিনি রক্তমাখা জামা-কাপড়, আংটি ও ঘড়ি ক্যাপ্টেন কাদের এর বড়ভাই সিরাজুল কাদের এর কাছে হস্তান্তর করেন।
ক্যাপ্টেন কাদের এর দুঃসাহসিক অবস্থান ও ভূমিকার কারণে মেজর শওকতের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর কমপক্ষে ৫শ সদস্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ঐদিন রক্ষা পেয়েছিল। আর ২৭শে এপ্রিলের এ যুদ্ধে মিজো ব্যাটালিয়নের ৪শ সৈন্য এবং পাকবাহিনীর কমান্ডো কোম্পানীর ৪০ জনের মত সৈনিক হতাহত হয়। ঐদিন খাগড়াছড়ি সদরেরও পতন হয়। আর, এর মাত্র পাঁচদিন পর ২রা মে পতন হয় রামগড়ের।
লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের টিওরী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক মরহুম ড. এম আব্দুল কাদের এবং মরহুমা রওশন আরা বেগম এর পঞ্চম পুত্র ক্যাপ্টেন কাদের ১৯৪৭ সালের ২৫শে ডিসেম্বর পিতার তৎকালীন কর্মস্থল দিনাজপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৬৬ তে আনন্দ মোহন কলেজ হতে আই এ পাশ করার পর আফতাব আল কাদের ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগে বিএ অনার্সে। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ভর্তির ইন্টারভিউ দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন কোয়েটায়। দুই বছর এর (লংকোর্স) প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর ১৯৬৯ সালে তিনি আর্টিলারি কোরে কমিশন প্রাপ্ত হন। তাঁর অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ চাকরিতে যোগাদনের আট মাস পর লেফট্যানেন্ট এবং তারও চার মাস পর ক্যাপ্টেন পদে পদন্নোতি পেয়ে তিনি যোগদান করেন হায়দ্রাবাদের ৪০ ফিল্ড রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে।
মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৭৩ সালে সরকার ক্যাপ্টেন আফতাব আল কাদেরকে মরণোত্তর ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের ছাড়াও তাঁর আরও তিন ভাই সিরাজুল কাদের, রেজাউল কাদের এবং আহসানুল কাদের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার ছোট ভাই ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্র আহসানুল কাদের মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে আজও ফিরে আসেনি। স্বাধীনের পর দেশ-বিদেশে বহু খুঁজেও স্বজনরা তাকে পায় নি।
রামগড়ের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জনাব মরহুম সুলতান আহমেদের উদ্যোগে রামগড় কবরস্থানে শহীদ কাদের এর কবরটি সংরক্ষণের সর্বপ্রথম ব্যবস্থা নেয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) কর্তৃপক্ষ এবং খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব সমীরণ দেওয়ানের উদ্যোগে সর্বশেষ শহীদের এই কবরটি সুদৃশ্যভাবে উন্নয়ন করা হয়।
২০০০ সালে মহালছড়ির প্রবেশদ্বারে নির্মাণ করা হয় বীর শহীদের স্মরণে একটি স্মৃতি ভাষ্কর্য। মহালছড়ি সেনা জোনের তৎকালীন কমান্ডার জনাব লে. কর্নেল আবু সায়েদ খানের উদ্যোগে নির্মিত সুদৃশ্য এ ভাষ্কর্যটির শিল্পী হচ্ছে, চট্টগ্রাম কর্ণফুলী শিশু পার্কের তৎকালীন চিফ ডিজাইনার জনাব শামীম আহাম্মদ । এছাড়াও এই বীর শহীদের বীরত্ব গাঁথা গৌরবোজ্জ্বল অবদান ইতিহাস নবপ্রজন্মের কাছে চির স্মরণীয় করে রাখতে শহীদ ক্যাপ্টেন কাদের এর নামে চট্টগ্রাম সেনানীবাসের প্যারেড গ্রাউন্ড, রামগড় ও খাগড়াছড়ি জেলা শহরে একটি সড়কের নামকরণসহ রামগড় ও গুইমারায় দুইটি শিশু স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে। সমাপ্ত
ি তথ্যসূত্র: শহীদ ক্যাপ্টেন কাদেরের পরিবার ।

লেখক : দৈনিক পূর্বকোণ প্রতিনিধি, রামগড়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 319 People

সম্পর্কিত পোস্ট