চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ জুলাই, ২০২০

সর্বশেষ:

পবিত্র তিরমিযী শরীফের মর্যাদা ও ফজিলত

১২ মার্চ, ২০২০ | ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মনিরুল ইসলাম রফিক

ইসলামের আলোকধারা

পবিত্র তিরমিযী শরীফের মর্যাদা ও ফজিলত

ওয়া মান কা-না ফি বায়াতিহি হাজাল কিতাব, ফাকাআন্নামা ফি বায়াতিহী নাবীয়া ইয়ানতিকু।’ যার ঘরে এ কিতাবখানি (তিরমিজী) থাকবে, মনে করা যাবে যে, তার ঘরে স্বয়ং নবী করীম (স.) অবস্থান করেছেন এবং কথা বলছেন।’ গোটা মুসলিম দুনিয়ায় সমাদৃত ছয় বিখ্যাত ও বিশুদ্ধ হাদীস সংকলনের অন্যতম ‘পবিত্র তিরমিজী শরীফের’ মর্যাদা ও ফযীলত তুলে ধরতে গিয়ে উপরোক্ত দাবী পেশ করেছেন খোদ সংকলনটির লেখক ইমামুল হাদীস হাফিজ আবু ঈসা মুহাম্মদ তিরমিজী (রহ.)। (আল বিদায়া, ইবনে কাসীর ১১/৬৭)। হাদীস সংকলনটির ব্যাপারে এ মন্তব্য মোটেই অমূলক নয়। তবে এ কথাটি কেবল তিরমিজী শরীফ সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ মনে করলে চলবে না । বরং সকল সহীহ হাদীস সংকলন সম্পর্কে প্রযোজ্য এ অকাট্য সত্য। এ সব গ্রন্থ আছে বলেই নুর নবীর (স.) জীবন, সুন্নাহ ও আদর্শ মুসলিম সমাজে চির অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে ।
অবশ্য এখানে ঘরে ঘরে হিফাযত করা বা সংরক্ষণ করার অর্থ হলো অধ্যয়ন করা, চর্চা করা ও জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভক্তির সাথে আমল করা বুঝায় । কিন্তু মুসলমানদের দুর্ভাগ্য, অনেকেই এসব গ্রন্থ সংরক্ষণ না করে নানা উপকার লাভ থেকে দূরে সরে আছে। আমাদের ড্রয়িংরুম বেডরুমগুলো কত কম গুরুত্বপূর্ণ বই পুস্তক, পুতুল, খেলনায় ভর্তি। অথচ চির মূল্যবান নানা প্রশ্ন ও অনুভূতির সুপরিবর্তন যেখানে সাধিত হবে সে ধরনের বই-পুুস্তক, কিতাবাদির সমাহার আমাদের শো-রুমগুলোতে স্থান পায়না। এজন্য আমাদের জীবনে, আমাদের সন্তানদের জীবনে সুপরিবর্তনের চেয়ে কুপরিবর্তনের ভাগই বেশি। কখনো যদি এ ধরণের বই-কিতাব কোন গুণীজন আমাদের ঘরে উপহার নিয়ে আসেন আমরা বাড়তি বোঝা মনে করে তা মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিনকে দান করে দেই। অনেকের হাবভাব এমন যে, এ ধরনের বই আমাদের মূল্যবান শো কেসে থাকার উপযুক্ত নয়। হায়রে মুসলমান, হায়রে মুসলমানী জিন্দেগী!
ইসলামকে সহজভাবে জানার ক্ষেত্রে তিরমিজী শরীফ সাধারণ পাঠকদের জন্য একখানি সুখপাঠ্য ও সহজবোধ্য হাদীস গ্রন্থ। হাফিজ আবু ইসমাঈল আনসারী (রহ.,মৃ-৪৮১ হিজরী ) এক আলোচনায় বলেছেন : আমার দৃষ্টিতে এ সংকলনটি বুখারী ও মুসলিম শরীফ থেকেও অধিক ব্যবহারোপযোগী। কেননা বুখারী ও মুসলিম এমন গ্রন্থ যে, কেবল মাত্র বিশেষ পারদর্শী আলিম ভিন্ন অপর কেউ তা হতে ফায়দা লাভ করতে সমর্থ হয় না। কিন্তু তিরমিজী শরীফ হতে যে কোন লোক ফায়দা লাভ করতে পারে। ইমাম তিরমিজী (রহ.) তার এ অক্ষয় কীর্তি জা’মি সুনান রচনার সময় ইমাম বুখারী ও আবু দাউদকে (রহ.) অনুসরণ করেছেন। তবে এখানে ইসলামী আইনের ঐতিহ্যগত ধারায় অধ্যায়সমূহ রচিত হয়েছে। ব্যবহারিক প্রয়োজনের দিকেও সযতেœ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। গ্রন্থটি রচনার পর তিনি এটি তদানিন্তন মুসলিম জাহানের হাদীস বিশেষজ্ঞদের সামনে পেশ করেন। বিশেষ করে হিজাজ ও খোরাসানের মুহাদ্দিসগণ তা দেখে অকৃপণ সন্তোষ প্রকাশ করেন। তার গ্রন্থপাঠের মজলিশের শ্রোতা ছিল অসংখ্য, অগণিত।
হাফিজ ইবনে রশীদ তিরমিজী শরীফের নি¤েœাক্ত বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন: (১) কিতাবটি অধ্যায় অধ্যায় করে বর্ণনা করা হয়েছে, (২) ইসলামী আইনের বর্ণনা করা হয়েছে, (৩) হাদীস বিজ্ঞানের মতে কোন হাদীসটি সহীহ কোনটি দুর্বল তা চিহ্নিত করা হয়েছে। (৪) কোন বর্ণনাকারীর মধ্যে কোন ত্রুটি থাকলে তা স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে। কোন কোন গবেষক এ গ্রন্থের আরো কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন । যেমন ঃ এখানে বর্ণনাকারী সাহাবাদের নাম ও গুণগান তুলে ধরা হয়েছে, যাতে সন্দেহের অবকাশ না থাকে । মতভেদজনিত মাসালা-মাসায়েল বর্ণনার ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক ভাবে ইমাম ও মাজহাবের মত ও মন্তব্য তুলে ধরা হয়েছে ইত্যাদি।
মহান গুণী ব্যক্তিত্ব ইমাম তিরমিজী (রহ.) হিজরী ২০৯ সালে ট্রান্স আফ্রিয়ানার তিরমিজ নামক প্রাচীন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এ শহরে আরো বেশ ক’ জন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও প্রখ্যাত ওলামাদের জন্মগ্রহণের কারণে এটি মদিনাতুর রিজাল নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইমাম তিরমিজী নিজ শহরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। তার পর ইরাক, হিজাজ, খোরাসান, বসরা প্রভৃতি বিখ্যাত অঞ্চলে বছরকে বছর ধরে হাদীসের সাধনায় অবিশ্রান্ত ঘুরে বেড়ান এবং অন্তত: এক হাজার বিশেষজ্ঞদের শরণাপন্ন হন। তন্মধ্যে দুনিয়া বিখ্যাত হাদীস ও তাফসীরের উস্তাদ ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম (রহ) অন্যতম। তিনি ছিলেন অসামান্য স্মৃতিশক্তির অধিকারী। কোন হাদীস একবার শুনলে দ্বিতীয়বার শোনার প্রয়োজন পড়তো না। সাথে সাথে তা স্মৃতিপটে আকড়ে যেত । অসাধারণ মেধার কারণে ইমাম বুখারী (রহ.) তার বহু প্রশংসাসূচক কথা বলতেন।
আবু সাঈদ ইদ্রিস (রহ.) বলেছেন: একবার এক মুহাদ্দিস হতে তার হাদীস শুনতে আগ্রহ জাগে । মুহাদ্দিসটি তাকে কষ্ট করে বহু হাদীসই মুখস্ত শুনান। দেখা গেল তৎক্ষণাৎ শুনতে শুনতে সব হাদীসই ইমাম তিরমিজীর মুখস্ত হয়ে যায় এবং তিনি পুনঃ পাঠ করে শুনান। এতে উক্ত হাদীস বিশেষজ্ঞ বিষ্ময়াভিভূত হয়ে পড়েন এবং তার মেধা পরীক্ষার জন্য তিনি আরো ৪০ টি হাদীস পাঠ করেন। অল্পক্ষণের মধ্যে এগুলোও তিনি ওস্তাদকে শুনাতে সক্ষম হন (সুবহানাল্লাহ)। ইমাম তিরমিজী বহু মূল্যবান গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। যেমনঃ শামায়েলে তিরমিজী, কিতাবুত তারিখ, মুফরাদ প্রভৃতি। তার উল্লেখযোগ্য ক’জন ছাত্র হলেন আবু হামেদ ইবনে আব্দুল্লাহ মারুফী, আহমদ নাসায়ী, মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ প্রমুখ। ইমাম তিরমিজীর খোদাভীতি ও পরহিজগারী ছিল খুবই উচ্চ পর্যায়ের। তিনি সর্বদা খোদার ভয়ে ক্রন্দন করতেন। ফলে অল্প জীবনে তার দৃষ্টি চলে যায় । হিজরী ২৭৯ সালের ১৩ (মতান্তর ২৭) রজব ৭০ বছর বয়সে নিজ শহরে ইন্তেকাল করেন।
ইমাম তিরমিযীর কিছু মূল্যবান হাদীস: জনৈক মিসরীয় ব্যক্তি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবুদ দারদা (রা.) কে মহান আল্লাহর বাণী: ‘‘পার্থিব জীবনে তাদের জন্য আছে সুসংবাদ’’ (সূরা ইউনুস: ৬৪) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্ল­াল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর থেকে আজ অবধি একমাত্র তুমি ও অপর এক ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আমি এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন: এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর থেকে আজ অবধি তুমি ছাড়া আর কেউ এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করেনি। আর তা (বুশরা) হল সত্য স্বপ্ন, যা মুসলিম ব্যক্তি দেখে বা তাকে দেখানো হয়।
আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: নিশ্চয়ই রিসালাত ও নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা শেষ হয়ে গেছে। অতএব আমার পরে কোন রাসূলও আসবে না এবং নবীও আসবে না। রাবী বলেন, লোকজনের কাছে বিষয়টি হৃদয়বিদারক মনে হল। অত:পর তিনি বলেন: তুবে মুবাশশিরাত কি? তিনি বলেন, মুসলিম ব্যক্তির স্বপ্ন। আর তা নবুওয়াতের অংশসমূহের একটি অংশ (আ, হা)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কিয়ামত নিকটবর্তী হলে মুমিনদের স্বপ্ন খুব কমই মিথ্যা হবে। তাদের মধ্যে অধিক সত্যবাদীর স্বপ্নও তদনুরূপ সত্য হবে।
মুসলিম ব্যক্তির স্বপ্ন হল নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। আর স্বপ্ন তিন প্রকার। ১. ভাল স্বপ্ন হল আল্ল­াহর পক্ষ থেকে সুসংবাদস্বরূপ। ২. আরেক ধরনের স্বপ্ন হল শয়তানের পক্ষ থেকে মুমিন ব্যক্তির জন্য দুশ্চিন্তাস্বরূপ। আরেক ধরনের স্বপ্ন হল মানুষের মনের চিন্তাÑভাবনা ( সে যা ভাবে তাই স্বপ্ন দেখে)। কাজেই তোমাদের কউ অপছন্দনীয় কিছু স্বপ্ন দেখলে সে যেন উঠে যায় এবং (বাম দিকে) থুথু ফেলে এবং তা লোকের কাছে না বলে। রাবী বলেন, আমি স্বপ্নে (পায়ে) শৃঙ্খল দেখা পছন্দ করি; কিন্তু (গলদেশে) শৃঙ্খল দেখা অপছন্দ করি। (পায়ে) শিকলের তাৎপর্য হল দীনের উপর স্থিতি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম বলেছেন: যার হাতে আমার প্রাণ সে সত্তার শপথ! তোমরা বেহেশতে যেতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা ঈমানদার হবে, আর ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না পরস্পর ভালবাসা স্থাপন করবে। আমি কি তোমাাদের এমন একটি কাজের কথা বলে দিবনা, যখন তোমরা তা করবে, পরস্পর ভালবাসা স্থাপিত হবে? তোমরা পরস্পরের মধ্যে সালামের প্রসার কর।
ইমরান ইবন ইসাইন (রা) থেকে বর্র্ণিত। জনৈক ব্যক্তি নবী (সা) কাছে এসে বলল আসসালামু আলাইকুম। নবী (সা.) বললেন, দশ নেকী। অত:পর আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্ল­াহ। নবী (সা.) বলেন, বিশ। আরেক ব্যক্তি এসে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। নবী (সা.) বললেন, ত্রিশ।

মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক, কলামিস্ট, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব।

The Post Viewed By: 419 People

সম্পর্কিত পোস্ট