চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

লালন ও দোল পূর্ণিমা

১০ মার্চ, ২০২০ | ২:৪১ পূর্বাহ্ণ

স্বপন মজুমদার

লালন ও দোল পূর্ণিমা

দ্বাপর যুগে ফাল্গুনী পূর্ণিমাতে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। অন্যদিকে, ওই একই ফাল্গুনী পূর্ণিমায় জন্ম হয় শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর। শ্রী চৈতন্যদেবের সময়কাল ১৪৮৬ থেকে ১৫৩৪ সাল। ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে জন্মগ্রহণ করায় পরবর্তীতে এই তিথিকে গৌর পূর্ণিমাও বলা হয়।
দোল-পূর্ণিমাকে বৈষ্ণবগণই উৎসবের আঙ্গিকে মহিমান্বিত করে তুলেছিলো। এদিন শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দাবনে তাঁর গোপিনী ভক্তবৃন্দকে নিয়ে শ্রীরাধার সঙ্গে আবির খেলায় মগ্ন হয়েছিলেন। রাধা-কৃষ্ণ ও গোপিনীদের সেই প্রেমানন্দকে স্মরণ করতে বৈষ্ণবরা কীর্তন করে বেড়াতেন।
লালনের চিন্তায় এবং তাঁর গানের বিশাল অধ্যায় জুড়ে আছে চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাব। চৈতন্য, নিত্যানন্দ ও অদ্বৈত আচার্য, এই তিন যুগমানব নদীয়া লীলাভূমি থেকেই সারা বাংলার নব-জাগরণের চিন্তামনি হয়ে উঠেছেন।
তিনটি কথা তাঁরা বলে বেড়াতেন:
এক. ধনী-গরীব বৈষম্যহীন সমাজ।
দুই. নারী-পুরুষ অভেদ-চিন্তা।
তিন. জাতি-বর্ণ-গোত্র বিভেদ উচ্ছেদ।
বাংলার মানুষের অধিকারের লড়াইয়ে অগ্রগণ্য এই তিন ব্যক্তি-মানব লালনের চিন্তাগুরু। সিরাজ সাঁই তাঁর দীক্ষাগুরু। লালন সাঁই তাঁর গানে বা পদে বহুভাবে পূর্বোক্ত ওই তিন বক্তিত্বের উচ্চারিত বাণীকেই প্রচার করেছেন। তাঁর সেই বিখ্যাত গান, “তিন পাগলের হল মেলা নদে এসে” এখানে ‘নদে’ মানে ‘নদীয়ায়’।
নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসন আমলে সেকালে নদীয়া জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পচর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলো। তিন পাগলের মিলনমেলা ছিলো এই নদীয়া। গৌর-নিতাই-অদ্বৈত-তাঁরা মানবকল্যাণের প্রয়োজনে জাগতিকতা ও পরমার্থিকতাকে এক সাথে চর্চা করার কথা বলেছেন।
ফকির লালনের কাছে বৈষ্ণব, সহজিয়া, বাউল, কর্তাভজা, পীরভজা, পাঞ্জ শাহ দেলবর শাহ, সতীমার ঘর, চৌধুরী ঘর ও যে কোনো মতের মতাবলম্বীগণ স্থান পেত। পৃথিবীতে যত ধর্ম এসেছে, তা মানুষের মানুষের ভাগ করেছে। কিন্তু ফকিরী মতই হচ্ছে সবাইকে এক ছাদের নীচে রাখার মন্ত্র। ফকির লালন সবাইকে গ্রহণ করার প্রত্যাশাকল্পেই ফল্গুনের এই পূর্ণিমা তিথিতে সাবইকে তাঁর নিজের আখড়াতেই দাওয়াত দিতেন। আর, তা ছিলো, “দোল পূর্ণিমায় সাধুসঙ্গ”।
বসন্তকালের প্রাকৃতিক সুন্দর পরিবেশে সাধুদের সাথে সাধুদের মহা-মিলন আর মত-বিনিময় হতো। সেই ধারাবাহিকতায় লালন পরবর্তীকালে তাঁর শিষ্য-ভক্তরাও দোল পূর্ণিমায় সাধুসঙ্গের আয়োজন করে চলেছে। অবশ্য, সাম্প্রতিক আয়োজনে এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণা যুক্ত হওয়ায়, তাতে বাণিজিকীকরণের মাধ্যমে অতীতের ঐতিহ্য বিঘিœত হতে চলেছে বলে অনেকে মনে করছেন। তারপরও সাধুরা অনেকেই আপন আত্মার শান্তির জন্যে নিশ্চুপে ছেউরিয়াতে আসেন। আবার, কেউ কেউ নিজ নিজ আখড়ায় তা পালন করেন।
দোলযাত্রা, দোল উৎসব রা হোলি-এর কোনোটার সাথেই লালন সাঁইয়ের দোল পূর্ণিমার কোনো সাদৃশ্য নেই। বলা যায়, অন্যদৃষ্টি থেকে কোনো বিরোধও আবার নেই। সে সব থাক। আমাদেরক আলোচ্য বিষয় ভিন্ন।
প্রাকৃতিক জ্ঞানের আওতায় ‘দোল পূর্ণিমায় সাধুসঙ্গ’ বিষয়টাক নিয়ে আমরা এভাবেও ভাবতে পারি।
চন্দ্রের সাথে পৃথিবীর একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। আমরা জানি চন্দ্র পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটার কারণ। তেমনই, পূর্ণ চাঁদে সাধুরা মনে করেন, তাঁদের সদানন্দ প্রাণকে আরও উচ্ছ্বসিত করা যায়। মন যে অবস্থানে আছে তার থেকে মনের গতিকে বাড়ানো যায়। তাই, পূর্ণ চাঁদের ভাব হয় বেশি। আর তাতে প্রেমোৎসবে হারিয়ে যায় সাধুরা।
ইংরেজিতে চাঁদকে খটঘঊজ বলে। আর, চাঁদের জ্যোৎ¯œার রূপের ঘোরে মানুষ যখন তার স্বাভাবিক আচরণের সীমা পেরিয়ে ভাবের জোয়ারে ভাসে, তখন ওই পর্যায়টিকে আমরা একটু পাগলামো বলে আখ্যায়িত করি। আর, খটঘঅঞওঈ বলেই চিহ্নিত করি। এই প্রেমোন্মাদনা বা ভাবোন্মাদনা হল মানুষের স্বাভাবিক যুক্তিবোধের বাইরের একটি অবস্থান। যুক্তি শুধু বস্তুগত বিষয়কে বিচার করতে পারে। যুক্তির বাইরে মনের আরেকটি অবস্থান আছে। তা হচ্ছে, ভাব। যা, মানুষকে সুখী করে বা দুঃখী করে। সাধু মানে, তিনি সদানন্দ।
আর, এই অবস্থান থেকেই সাধুরা সাধুদের ভাব বিনিময় করে এবং সেই ভিাব থেকেই গেয়ে ওঠে:
“জগৎ বেড়ে জাতের কথা
লোকে গৌরব করে যথাতথা
লালন সে জাতের কাতা
বিকিয়েছে। সাত-বাজারে”
জাত-পাতের উর্ধ্বে ওঠার এই ভাব সাধারণ মানুষের বোধের অতীত। সাধুসঙ্গের জয় হোক। ছেউরিয়াতে ফির আসুক আখাড়া সংস্কৃতি।

The Post Viewed By: 77 People

সম্পর্কিত পোস্ট