চট্টগ্রাম শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বিশ^ঐতিহ্যের দলিল ৭ মার্চের ভাষণ

৯ মার্চ, ২০২০ | ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ

অধ্যাপক আয়েশা পারভীন চৌধুরী

বিশ^ঐতিহ্যের দলিল ৭ মার্চের ভাষণ

৭ মার্চ, ১৯৭১ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে। মহাকালের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর দ্বিবার্ষিক সভায় বিশ^ ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এত দূরদর্শীতা ও এত নির্দেশনা বিশে^র আর কোন ভাষণে নেই। এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য এক অনন্য গৌরবময় অর্জন। এই ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের কথা বলেছিলেন, গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলেছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, একটি ভাষণ কীভাবে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, তাদেরকে মুক্তি সংগ্রামের দিকে ধাবিত করে।
অসম-সাহসিকতায় লড়াই করতে উজ্জীবিত করে। কাল থেকে কালান্তরে সেই সাক্ষ্য বহন করে যাবে। মহাকালের মহাকাব্য ৭ মার্চের এই ঐতিহাসিক ভাষণ। স্বাধীনতার প্রায় ৪৬ বছর পরে হলেও এই স্বীকৃতির মাধ্যমে যুগান্তকারী এই ভাষণ নিজেদের পাশাপাশি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে বিশ^বাসীর মধ্যে নতুন করে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
মানবজাতির বিকাশের পথ পরিক্রমায় স্বাধীনতাকামী জাতিকে এই ভাষণটি সর্বদা অনুপ্রাণিত করবে, সাহস যোগাবে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও সঠিক মুক্তি সংগ্রামে বিশে^র অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ভাষণটি নিপীড়িত মানুষকে দেখাবে মুক্তির পথ। শুধু মাত্র বাঙালি জাতির নয়, বিশ^বাসীর জন্য অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ সরকার যদি এই ভাষণটির অনুবাদ করে বিশে^র বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিতে পারেন তাহলে যারা যেখানে শোষণের বিরুদ্ধে ও স্বাধিকারের দাবিতে সংগ্রাম করছে তারাও এই ভাষণ শুনে অনুপ্রেরণা লাভ করতে সমর্থ হবে। যা ছিল আমাদের হৃদয়ে গাঁথা তা আজ বিশ^ ঐতিহ্যের অংশ। সেই অবিসংবাদিত উচ্চারণ পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সেরা ভাষণ।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আগে ২০১৩ সালে ব্রিটিশ এক ইতিহাসবিদের বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ স্থান পায়। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ জ্যাকব জে ফিল্ডের উই শ্যালফাইট অন দ্য বিচেস, দ্য স্পিচেস দ্যা টইন স্পায়ার্ড হিস্ট্রি বইতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ভাষণ এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সত্য ইতিহাস চিরভাস্বর। ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারেনা। আজকে সেটাই প্রমাণিত। ইউনেস্কো, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কমিটি (আইএসি) ২৪/১০/১৭ থেকে ২৭/১০/১৭ পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে নানা পর্যায়ে বৈঠক করে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার-এ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ৩০ অক্টোবর প্যারিসে ইউনেস্কো হেডকোর্য়াটারে এই ভাষণকে “বিশ^ ঐতিহ্যের দলিল” হিসেবে ঘোষণা দেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা। এর বিষয় বস্তুর গভীরতা, সংবেদনশীলতা, সম্মোহনী শক্তি গত প্রায় চারযুগ ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও আনুষ্ঠানিক পরিবেশে দেশের মানুষকে শক্তি যুগিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন ভাষণ এত কবি ও শিল্পীকে তাদের সৃষ্টিকর্মে অনুপ্রেরণা দিতে সম্মত হয়নি। একমাত্র এই একটি ভাষণ সঞ্জীবনী মন্ত্রের মত পুরো জাতিকে এক করতে সম্মত হয়েছে। অনেক কবি ও সাহিত্যিক তাদের লিখনীর মাধ্যমে এই ভাষণের গুরুত্ব তুলে ধরে জাতীয় ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান নির্ণয় করার প্রয়াস চালিয়েছে।
পাকিস্তান নামক উপনিবেশেতার ২৩ বছর বসবাসের অভিজ্ঞতার সংহত রূপ ছিল ৭ মার্চের বক্তৃতা। সেই বক্তৃতা ছিল উপনিবেশে বসবাসকারী একজন রাজনীতিবিদের দিকনির্দেশনা। সেই বক্তৃতায় তিনি সাধারণ মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এবং মুক্তির পথে চলতে সাহস যুগিয়েছিলেন। তার এই বক্তৃতায় একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও সশস্ত্র পন্থার কথা উল্লেখ আছে।
তিন নেতার মাজারে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এক স্মরণ সভায় পূর্ব বাংলার নাম যে বাংলাদেশ হবে তা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। বাংলাদেশের যে পতাকা, সবুজের মধ্যে লাল, এটাও জাতির পিতার করে দেওয়া। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা……” ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গান। বঙ্গবন্ধু এই দেশের মানুষকে রাজনৈতিক মুক্তি দিয়েছেন, অর্থনৈতিক মুক্তির পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন। দেশও ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিনবছরের মাথায় তাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে শুধু হত্যা করা হয় নাই, যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদ রক্ত দিয়েছিল সেই আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে চেষ্টা চালানো হয়। ইতিহাসকে সম্পূর্ণরূপে বদলিয়ে দেওয়ার জন্য সত্য ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়। বিকৃত ইতিহাসের চাপে সত্যিকারের ইতিহাসকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পারেনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানী শাসকদের নিপীড়ন এবং বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পর ১৯৭০ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ জাতীয় নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। তারা উল্টো বাঙালিদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার ডাক দেন। সেদিনের জনসমুদ্রে তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দেন “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, জয় বাংলা।” বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণই ছিল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা, যা বদলে দিয়েছিল একটি জাতির ভাগ্য।
সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্খা, দাবি-দাওয়া, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, সংগ্রাম-বিদ্রোহ, অধিকার-চাহিদা সবই ব্যক্ত হয় মাত্র ১৯ মিনিটে এবং ১১০৫ শব্দের এই ভাষণটির মধ্যে। এর জন্য কোন পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। স্বতস্ফুর্তভাবে একটার পর একটা দাবি উত্থাপনের মধ্য দিয়ে এই জাতির ভাগ্য নির্ধারণের দিকে এগিয়ে গেছে। সেইদিন যারা রেসকোর্স ময়দানে ছিল একমাত্র তারাই সাক্ষ্য। একটি বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ কীভাবে তাদের ধমনীতে ধমনীতে স্বাধীনতার স্বাদ বয়ে দিয়েছিল।
৭ মার্চের ভাষণ শুধুমাত্র শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলনা। এমন বিজয়গাঁথা রচিত বক্তৃতাটি আজো প্রেরণার উৎস। যারা সেদিন এই বক্তৃতাটি শুনতে জমায়েত হয়েছিল তারা নিজেরাই জানেনা ইতিহাসে স্বাক্ষী হয়ে তারাও এই বক্তৃতার ব্যাপ্তী ও ব্যাপকতায় কতটুকু সমৃদ্ধ। এই বিশাল জমায়েতে অংশগ্রহণ এই বক্তৃতার মহিমাকে আরো বেশী জোরালো ও দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি দিকনির্দেশনার সাথে সাথে তাদের জোরালো সমর্থন যেন এই আরো বেশি গুরুত্ববহ করে তোলে। সেইদিন যারা রেসকোর্স ময়দানে ছিলেন দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে তারা বাঙলার ইতিহাসে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান হিসেবে বিবেচিত। শ্লোগানে শ্লোগানে ভরা পুরো ময়দানটি ছিল গণমানুষের আবেগের প্রকাশ। এই ভাষণটি ছিল অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে নিয়ে। অতীত যন্ত্রণাময় ও তিক্ত উপনিবেশের অভিজ্ঞতা, বর্তমানে মুক্তির তীব্র আকাঙ্খা এবং ভবিষ্যতে শত্রু মোকাবেলার মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পর শুধু ঢাকা শহরে নয়, পুরো দেশটি বদলে যায়। সেইদিন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনির্দেশনা হয়ে উঠে সরকারি নির্দেশ। ৭ কোটি মানুষ তাঁর নির্দেশ মেনে নেয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্র কাঠামো প্রত্যাঙ্খান করে স্বীয় দেশীয় রাষ্ট্র কাঠামোতে বিশ^াসী হয়ে পড়ে।

অধ্যাপক আয়েশা পারভীন চৌধুরী কলামিস্ট ও অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ডা. ফজলুল-হাজেরা ডিগ্রী কলেজ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 122 People

সম্পর্কিত পোস্ট