চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০

সর্বশেষ:

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

৭ মার্চ, ২০২০ | ৩:২১ পূর্বাহ্ণ

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ

আজ বাঙালি জাতির ইতিহাসের অবিস্মরণীয় দিন ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার এক সভায় স্বাধীনতাসংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রাক্কালে পরাধীনতার শিকলে বন্দি বাঙালি জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য অধীর অপেক্ষায়, তখন তিনি লাখো জনতার মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব, ইনশাাল্লাহ!’ দেশের জনগণকে স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে… প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।’ বঙ্গবন্ধুর সেই ডাকে জেগে উঠেছিল মুক্তিপাগল জনতা। পেয়েছিল স্বাধীনতার দিকনির্দেশনা। মুক্তিকামী বাঙালি নিয়েছিল চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ স্বাধীনতার ইতিহাসে মহামূল্য এক অধ্যায়, মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। একইসঙ্গে বাঙালি জাতির এগিয়ে চলার পথে প্রেরণাদায়ী শক্তি।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের ৭৭টি ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্য দলিলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ যুক্ত করেছে ইউনেস্কো। বস্তুত ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তার একটি বিশাল ও রক্তক্ষয়ী পটভূমি রয়েছে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পর ২৩ বছরের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা ধীরে ধীরে গড়ে উঠে। এজন্য এ দেশের মানুষকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, অনেক আত্মত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার গর্বে উন্মাতাল পাকিস্তানী শাসকরা কখনও তা উপলব্ধি করেনি। পরিণামে আত্মনিয়ন্ত্রণাধীকারের জন্যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে এর স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। ১৯ মিনিটের এই ভাষণেই সাড়ে সাত কোটি নিরস্ত্র বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন। আগুন জ্বালিয়েছিলেন কোটি প্রাণে। এ ঘোষণার পরিণতির কথাও তিনি আগেভাগেই চিন্তা করেছিলেন। যার কারণে ৭ মার্চের ভাষণে তিনি এও বলে দিয়েছিলেন, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধুর এই অগ্নিগর্ভ ভাষণ জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে যেভাবে উজ্জীবিত করেছিল, তার তুলনা মেলা ভার। তিলে তিলে জাতিকে স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্যে তৈরি করেই তিনি অন্তিম মুহূর্তে এই ঘোষণা দেন। অল্প সময়ের ওই ভাষণেই বঙ্গবন্ধু তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিক বিষয়ে আলোকপাত করেন, জাতিকে দেন প্রয়োজনীয় দিকনিদের্শনা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যেই ছিল হাজার বছরের লালিত স্বাধীনতার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা। বাঙালি জাতির মুক্তিলাভের উপায়। একইসঙ্গে বীরদর্পে আগামির এগিয়ে চলার নির্দেশনা। তার এই ঐতিহাসিক ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। নয় মাসের সেই সশস্ত্র সংগ্রামের পর আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পরাজিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই আত্মসমর্পণের দলিলে সই করে। সংগত কারণে বাঙালি জাতির কাছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য কখনো ম্লান হবে না। এই কালজয়ী ভাষণ বাঙালি জাতির হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতার সঙ্গে, দৃঢ়পায়ে বাঙালি জাতির এগিয়ে চলার সঙ্গে, উন্নয়ন-অগ্রগতির সঙ্গে এর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আজ অশুভশক্তি আমাদের ওপর জেঁকে বসার পাঁয়তারা করছে। নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বাঁধার সৃষ্টি করছে। মাথাচাড়া দেয়ার চেষ্টা করছে মৌলবাদী অপশক্তি। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মর্মকথা হৃদয়ে ধারণ করে দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলার শপথ নিতে হবে আজ। অশুভশক্তির মূলোৎপাটনের সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে শুভবোধসম্পন্ন সবাইকে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে আমাদের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করলে অবশ্যই আমরা একাত্তরের মতো এ লড়াইয়ে জয়ী হবো। প্রসঙ্গত, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ৭ মার্চকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস’ ঘোষণা করে এক মাসের মধ্যে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। একাত্তরের পরাজিত শক্তি একদিন যে ভাষণ নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল, সে ভাষণই আজ জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃত হলো। এখন প্রশাসনের কাজ হবে এক মাসের মধ্যে একটি গেজেট জারি করা এবং সেই গেজেটের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দিবসটি জাতীয় ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা। একইসঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে ৭ মার্চের ভাষণের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগও নিতে হবে। মুজিববর্ষের মধ্যে দেশের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলা কমপ্লেক্সে রাষ্ট্রীয় খরচে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপনেরও নির্দেশ দিয়েছেন হাই কোর্ট। আগামী এক মাসের মধ্যে এই আদেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এ বিষয়েও যথাযথ পদক্ষেপ দরকার। জাতির জনকের প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা।

The Post Viewed By: 80 People

সম্পর্কিত পোস্ট