চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

শিক্ষায় বিশ্বমান অর্জন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা

২ মার্চ, ২০২০ | ২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ মুসা খান

শিক্ষায় বিশ্বমান অর্জন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা

“বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ বিশ্বমানের নয়”-এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এদিকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও র‌্যাংকিং এর দিক হতে পেছনের দিকে রয়েছে। আবার একটু খতিয়ে দেখলে বুঝা যাবে যে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের কিছুটা হলেও সীমাবদ্ধতার কারণে স্কুল-কলেজ পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যও অভিভাবকরা ভারতসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকে পড়েন। এতে দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যায়। অথচ আমরা যদি একটু সজাগ হই, একটু মনোযোগ দিই, তাহলে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহও বিশ্বমান অর্জন করতে পারবে। প্রসঙ্গক্রমে সামান্য আলোকপাত করা যেতে পারে যে, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে মানে শুধুমাত্র ইউনির্ভাসিটি অব অক্সফোর্ড, ক্যামব্রীজ, স্ট্যানফোর্ড ইউনির্ভাসিটি, এমআইটি, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনির্ভাসিটি অব টেকনোলজি ইত্যাদিকে বুঝায় না।

বিশ্বমানের অনেক প্রতিষ্ঠান ভারত, মালয়েশিয়া, চীনসহ অনেক দেশেই রয়েছে। দুঃখজনক সত্য হলো- বিশ্বের এক হাজার র‌্যাংকিং এর মধ্যে আমাদের কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং ১৩০০ এবং বুয়েটের র‌্যাংকিং ২১০০ হতে ৩০০০ এর মধ্যে। অন্যান্য ইউনির্ভাসিটির র‌্যাংকিং আরও নীচে। বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ইউনির্ভাসিটিগুলোর দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে সাধারণভাবে বলা যায় যে, সেখানে ”অনিয়ম” বা ”বিশৃংখলা” বলতে কোন শব্দ নাই। এই দুটি শব্দের সাথে অর্থাৎ ওৎৎবমঁষধৎরঃু বা ঈযধড়ং শব্দের সাথে তাঁরা পরিচিত কিনা সন্দেহ। আর পরিচয় থাকলেও তারা হয়তো এই দুই শব্দকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছে, যা আমরা পারিনি।

বিশ্বমানের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশৃংখলভাবে পড়ালেখা হয়, গবেষণা হয়, জ্ঞানার্জন হয়, যথাসময়ে পরীক্ষা হয়, রেজাল্ট হয়। সেখানে সেশনজট নাই, ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক-রাজনীতি নাই, হলের সীট দখল নাই, র‌্যাগিং নাই, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা নাই, গণরুম বলতে কোন রুম নাই, টেন্ডারবাজি নাই, চাঁদাবাজি নাই, সন্ত্রাস বা অস্ত্রবাজি নাই, সরকারি খবরদারি নাই। ভিসি নিয়োগে দলীয় আনুগত্য বিবেচনা হয় না। বরং মেধাকেই ভিত্তি ধরা হয়। মূলতঃ অনিয়ম বা বিশৃংখলা নেই বলেই তারা আজ বিশ্বমান অর্জন করতে পেরেছে এবং ধরেও রেখেছে।
অন্যদিকে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্র ঠিক উল্টো, যা আমরা সকলেই অবগত রয়েছি যে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে সেশনজট অবশ্যম্ভাবী। হোস্টেল সমূহে সীট দখল নৈমিত্তিক ঘটনা। ছাত্ররাজনীতির কারণে মারামারির ঘটনাকে আজকাল আমরাও তেমন মাইন্ড করি না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্র সংঘর্ষ আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। একজন ছাত্রকে যে কোন কারণে একদল ছাত্র পেটাতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের (অনেকের) নোংরা রাজনীতি আমাদের বিস্মিত করে। কিছু শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকার ফলে কোর্স শেষ করতে পারেন না, ফলে পরীক্ষাও পেছাতে হয়। আবার পরীক্ষা হলেও খাতা মূল্যায়ণে বিলম্বের কারণে ফল প্রকাশেও বিলম্ব হয়। অধিকাংশ ভিসি রাজনৈতিক পরিচয়ে নিয়োগের কারণে তাঁরা নিজেদেরকে জবাবদিহিতার উর্ধ্বে মনে করেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, যা মারাত্মক অনিয়মের পর্যায়ভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষক সংকটের কথাও শোনা যায়। অনেক নতুন বিভাগ খোলা হলেও শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না। পিএইচডি ডিগ্রির ৯৮% নকল বলেও কয়েকদিন আগে পত্রিকার খবরে জানা গেলো। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের কাজ হয় ধীরগতিতে এবং দুর্নীতিও সেখানে ওৎপ্রেত ভাবে জড়িত থাকে। অনেক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ ক্যান্টিন চালু না করার কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়-বলে আমরা জেনেছি। শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র যে এরকম তা নয়। অনেক স্বনামধন্য কলেজেও বিভিন্ন রকম বিশৃংখলা বিরাজমান। ফলে লেখাপড়া বিঘিœত হয়। ছাত্রছাত্রীরা জ্ঞানার্জনের চেয়ে রোজগারের দিকে ঝুঁকে পড়ে বেশি। মূলকথা হলো, শিক্ষাঙ্গনে এক ধরণের অরাজক বা বিশৃংখল পরিস্থিতি বিরাজ করে। এধরণের বিশৃংখল পরিস্থিতিতে ”বিশ্বমান” অর্জন আদৌ সম্ভব নয়।
ইদানিংকালে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বিদেশমুখীতা ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। এবং এর অন্যতম কারণ হলো, আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের এসব ”অরাজক পরিস্থিতি”। এই অরাজকতার কারণে ছাত্রছাত্রীরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ে ভীত হয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। প্রসংগক্রমে বিদেশে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে শিক্ষাজীবন শেষ করার সংক্ষিপ্ত চিত্র উল্লেখ করছি। বাংলাদেশি একজন ছাত্র যদি ইউরোপ, আমেরিকা বা কানাডার কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, এবং হোস্টেলে থাকার বিষয়টি কনফার্ম করেন, তাহলে তাঁর ক্লাস শুরুর তারিখ, সেমিস্টার পরীক্ষার ও ফাইনাল পরীক্ষার তারিখ শুরুতেই জানতে পারেন।

অর্থাৎ চার বছর ধরে তাঁর পরীক্ষা সমূহের রুটিন প্রথমেই জানিয়ে দেয়া হয়। এমনকি কনভোকেশনের তারিখও জানিয়ে দেয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো ৪ বছর পরও এই তারিখ সমূহের কোন নড়চড় হয় না। তাছাড়া যে হোস্টেলে থাকার জন্য হোস্টেল ফি জমা দেয়া হয়েছে, সে হোস্টেলের (ডরমেটরি) রুম নম্বরও তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইমেইল দিয়ে ছাত্রের কাছে জানতে চান যে, এয়ারপোর্ট হতে তাঁকে পিকআপ করার প্রয়োজন আছে কিনা। ছাত্র যদি হাঁ সূচক জবাব দেন, তাহলে নির্ধারিত তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রের জন্য বিমানবন্দরে গাড়ি পাঠিয়ে দেন। এবং তাঁকে হোস্টেলের নির্দিষ্ট রুমে পৌঁছে দেন। এই তথ্যসমূহ কারও কারও কাছে গল্প মনে হলেও এটাই বাস্তব চিত্র (অথচ আমাদের দেশে এমন রেওয়াজ সৃষ্টি হয়েছে যে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকলে হল-এ সীট পাওয়াই দিবা স্বপ্নের মতো)। বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাঁরা অধ্যয়ন করেন এবং যে সব শিক্ষকরা পড়ান, তাঁরা মনে করেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র এমনই হওয়া উচিত। বিদেশের ৯৯% শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে, করিডোরে কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে শ্লোগান শোনা যায় না। যা আমাদের কাছে অবাস্তব মনে হবে। আমাদের রাজনীতিকরা যুক্তি দিয়ে থাকেন যে, বিশ^বিদ্যালয়ের সচেতন ছাত্রসমাজ অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁরা এটা বুঝেও হয়তো বুঝেন না যে, এই রাজনীতি করতে গিয়ে তাঁদের পড়ালেখার বারোটা বেজে যাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। তাঁরা অনৈতিক পথে ধাবিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ দেশের জন্য ক্ষতি হবে।

আমাদের বিশ^বিদ্যালয় সমূহের ২০% শিক্ষক বিভিন্ন কারণে ক্লাসে অনুপস্থিত বা ছুটিতে থাকেন (পত্রিকার প্রকাশিত সংবাদ হতে জানা গেছে)। অনেক শিক্ষক বিদেশে ডিগ্রী নিতে গিয়ে আর ফিরে আসেন না। যা বিশ^মানের বিশ^বিদ্যালয় সমূহে কল্পনাও করা যায় না। আমরা মনে করি আমাদের বিশ^বিদ্যালয় সমূহকে বিশ^মানে নিয়ে যাওয়ার প্রধান অন্তরায় হচ্ছে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁরা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেন না। বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও প্রশাসনের জবাবদিহিতা না থাকায় পড়ালেখার মানও লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। একজন ভিসি যখন কর্মস্থলে থেকে তাঁর প্রতিষ্ঠান ভালভাবে চলছে কিনা-এটা পর্যবেক্ষণ না করেন, -তখন ফেরেশতারা এসে তো চালাবেন না! ভিসিদের যেখানে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে থাকার কথা, সেখানে একজন ভিসি অনুপস্থিত থেকে দিনের পর দিন তদবিরবাজি করেন বা টক শো করেন-কোন আইনে? শিক্ষক সংকটও বিশ^মান অর্জনে অন্যতম বাঁধা। ইউজিসি’র প্রতিবেদন হতে জানা গেছে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাতও হতাশাজনক। ২০১৫ সনের প্রতিবেদন হতে জানা গেছে, ৩৪টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ লাখ ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ১২ হাজার ৫৩ জন শিক্ষক রয়েছে। যার অনুপাত ৬২ ঃ ১। অবশ্য কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে-এর ব্যতিক্রম রয়েছে। আমাদের স্কুল-কলেজ গুলোর ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত আরও খারাপ। একটি ক্লাসে শতাধিক ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতির চিত্রও দেখা যায়।
আমরা এটাও মনে করি যে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে বিশ^মানের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন ক্যাম্পাসকে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত রাখা। সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় না দেয়া। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা বিহীন সৎ, মেধাবী ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষককে ”প্রধান” হিসেবে নিয়োগ দেয়া। হলসমূহকে দখলমুক্ত করা। র‌্যাগিংকে কঠোর হস্তে দমন করা। সন্ত্রাসী-মাস্তান ছাত্রদের বহিস্কার করা। সর্বোপরি অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া। সরকারের সবোর্চ্চ মহল যদি এসব বিষয় নিশ্চিত করেন, তাহলে আমরাও বিশ^মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা করতে পারি।

মুহাম্মদ মুসা খান কলামিস্ট, সমাজকর্মী।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 118 People

সম্পর্কিত পোস্ট