চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (র.)

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৩:১৬ পূর্বাহ্ণ

ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন

ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (র.)

ওফাতের আগ পর্যন্ত হযরত আবু বকর (র.) ইসলাম ও মুসলমানদের এমন সেবা করে যান; যা সর্বকালের মানুষের জন্য অনুসরণীয়। মূলত যেসব মহামনীষীর আদর্শ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, মেধা, শ্রম আর বীরত্বের কারণে ইসলামের গৌরবদীপ্ত ইতিহাস রচিত হয়েছে তাঁদের মধ্যে হযরত আবু বকর (র.)-এর নাম সর্বাগ্রে ও সর্বোর্ধ্বে। কারণ, তিনি প্রাকইসলামি যুগে যেমন ছিলেন একত্ববাদী, সৎ-চরিত্রের অধিকারী ও জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব তেমনি ইসলামের আবির্ভাবের পর তিনি হলেন প্রথম মুসলমান, দ্বীনের স্বার্থে সর্বত্যাগী, শ্রেষ্ঠ নবিপ্রেমিক এবং সর্বক্ষেত্রে সুন্নাহর অনুসারী। সাহাবিগণের মাঝে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব আল-কুরআনের একাধিক আয়াত ও বহু হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং তৎযুগ হতে অদ্যাবধি পর্যন্ত তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি সর্বজন বিধিত ও স্বীকৃত। তাই আল্লাহর নবি (দ.)-এর প্রত্যেক সাহাবি ন্যায়পরায়ণ ও অনুসরণীয় হলেও তাঁদের মাঝে হযরত আবু বকর (র.)-এর অবস্থান একক ও অদ্বিতীয়। ইবাদত-বন্দেগি, সুন্নাতে নববির অনুসরণ, নবিপ্রেম, দ্বীনের জন্য আর্থিক-শারীরিক ও মানসিক ত্যাগ, দ্বীনের প্রচার-প্রসার, চারিত্রিক দৃঢ়তা, শাসনকার্যে দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন বিধায় পূর্বাপর সর্বযুগের সত্যপন্থী আলেম-ওলামা ও সাধারণ মুসলমান তাঁকে নবিগণ (আ.)-এর পর শ্রেষ্ঠ মনীষী বলে আখ্যায়িত করেছেন। ইসলামের দুঃসময়ে তাঁর ভূমিকার কারণে ঐতিহাসিকগণ তাঁকে ঝধারড়ঁৎ ড়ভ ওংষধস বা ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবেও মূল্যায়ন করেন।

আল্ল­াহতায়ালা তাঁর নবিগণ (আ.)-কে নিষ্পাপ হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে হেফাজতের পর্দায় আবৃত করে রাখেন। যে কোন দুর্যোগ ও কঠিন সময়েও তাঁরা আল্ল­াহ তায়ালার বিশেষ দয়ায় পাপ ও ত্রুটিমুক্ত থাকতে সক্ষম হন। তাই জাহেলি যুগের মানুষেরা নানাবিদ অপকর্ম আর অমানবতার চর্চায় লিপ্ত থাকলেও হযরত আবু বকর (র.) ছিলেন ব্যতিক্রম। মদ-জুয়া, খুন-খারাবি, মিথ্যা, প্রতারণা, মূর্তিপূজা, পাথরপূজা ইত্যকার অপকর্ম ও বদআকিদায় আরব সমাজ যখন আকন্ঠ নিমজ্জিত তখন তিনি সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিনম্রতা, দয়া-দাক্ষিণ্য ও একত্ববাদে বিশ্বাস ইত্যাদি গুণাগুণের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। আমানতদারিতায় ছিল তাঁর সবিশেষ খ্যাতি। উপরন্তু একজন বিদ্বান, কবি, সুবক্তা ও সৎ-ব্যবসায়ী হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল আরবজুড়ে। মূলত তাঁর এ সব স্বভাব-চরিত্র ও আকিদা-বিশ্বাসের কারণে তাঁর সাথে আল্ল­াহর রাসুল (দ.)-এর সাথে বাল্যকাল থেকেই তাঁর সখ্য গড়ে উঠে। ফলে নুবুয়্যতের ঘোষণার সাথে সাথে বিনা তর্কে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং প্রথম মুসলিম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

দ্বীন প্রচারে হযরত আবু বকর (র.) সদা রাসুলুল্ল­াহ (দ.)-এর সঙ্গী ছিলেন। তিনি তাঁর মেধা, শ্রম আর অর্থের বিণিময়ে ইসলামের প্রচার কার্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথম তিন বছর আল্ল­াহর নবি (দ.)-এর সাথে গোপনে গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তীতে প্রকাশ্যে দ্বীনের প্রচার শুরু হলে তিনি শারীরিকসহ নানা নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু তিনি এক দিনের জন্যেও থামেননি। তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে যাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান, হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস, হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ, হযরত যুবাইর (র.)-এর মত সাহাবিগণও রয়েছেন। অপরদিকে তাঁর আর্থিক বদাণ্যতায় ইসলামগ্রহণকারী অনেক মুসলমান দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্তি লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে হযরত বেলাল, হযরত আম্মার বিন ইয়াসির, হযরত খাব্বাব (র.)-এর নাম উল্লেখযোগ্য। এভাবে তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ব্যক্তিগতভাবে আর পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রচার করে সাহাবিগণের মাঝে প্রথম ও প্রধান দা‘য়ী বা ইসলামপ্রচাকের ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দাওয়াতে অসংখ্য মুশরিক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে হযরত আবু বকর (র.) দ্বীনের প্রয়োজনে যে কোন ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। যেমন, তিনি সর্বপ্রথম ইসলামগ্রহণকারী। তাঁর সমস্ত সম্পদ তিনি ইসলামের স্বার্থে ব্যয় করেন। তিনি সব জিহাদে অংশ গ্রহণ করে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসলাম গ্রহন করার পূর্বাপর তিনিই রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর বেশি ছুহ্বাত বা সহচার্য লাভ করেন। তাঁর সাহাবি হওয়ার বিষয়টি আল-কুরআনের সূরা তাওবার ৪০তম আয়াতের সরাসরি শব্দ থেকে প্রমাণিত। মে‘রাজের ঘটনা বিনা সংশয়ে বিশ্বাস করার কারণে আল্ল­াহর রাসুল (দ.) তাঁকে ‘ছিদ্দীক’ বা অতিসত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত করেন। হাদিস শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী নবিগণ (আ.)-এর পর কবর থেকে তিনিই প্রথম উঠবেন এবং জান্নাতে প্রথম প্রবেশ করবেন। রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর উপস্থিতিতে তিনি নামাযের ইমামতি করেন। ৯ম হিজরিতে রাসুলুল্লাহর (দ.)-এর প্রতিনিধি হিসেবে হজের নেতৃত্ব দেন। হযরত ওমর (র.)-এর পরামর্শে তিনিই সর্বপ্রথম আল-কুরআনের সংকলন করেন। খলিফাতুররাসুল একমাত্র তাঁরই উপাধি। তিনিই ইসলামের প্রথম খলিফা। নবি (দ.)-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী হযরত আয়েশা (র.)-এর পিতা হিসেবে তিনিই রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর সাথে আত্মীতার বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। ইবাদত-বন্দেগি, সুন্নাতের অনুসরণ, অপর মুসলমান ভাইয়ের হক আদায় ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। হযরত আবু হুরায়রা বলেন, “একদা আল্লাহর রাসুল (দ.) তাঁর সাহাবিগণকে প্রশ্ন করেন, তোমাদের মধ্যে কে আজ রোযা (নফল রোযা) পালন করছে? হযরত আবু বকর বললেন, আমি। তিনি প্রশ্ন করলেন, কে আজ জানাযায় শরিক হয়েছ? হযরত আব বকর বললেন, আমি। তিনি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, কে আজ নিঃস্বকে আহার দিয়েছ? হযরত আবু বকর বললেন, আমি। এবার তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কে আজ রোগীর সেবা করেছ? এবারও হযরত আবু বকর বললেন, আমি। তখন তিনি বললেন, যার মধ্যে এ সব চরিত্রের সমাহার ঘটবে সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে” (ছহিহ মুসলিম, হাদিস নং-১০২৮)।

ইসলামি খেলাফত হলো নুবুয়্যতের আদলে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করা। এক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান মডেল হলেন হযরত আবু বকর (র.)। তিনি নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, খোদাভীতি, নবিপ্রেম ও তাঁর অনুসরণ, বয়োজৈষ্ঠতা, অবদান, বংশীয় মর্যাদা ইত্যাদির বিবেচনায় সরাসরি জনগণের রায়ে ত্রয়োদশ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসে (৬৩২ খ্রি.) প্রথম খলিফা নির্বাচিত হন। রাসুলুল্ল­াহ (দ.) তাঁকে সরাসরি খলিফা নিয়োগ করেননি। খেলাফতের সূচনা হয়েছে জনগণের ভোটে, গণতান্ত্রিক পন্থায়। মাত্র আড়াই বছরের খেলাফতকালীন তিনি যে যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন- তা ইতিহাসে বিরল। সিরিয়া বিজয়, ধর্মত্যাগী ও যাকাত অস্বীকারারীদের দমন, ভ-নবিদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান, আল-কুরআনের সংকলন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ইসলাম প্রচার ইত্যাদি তাঁর অনন্য অবদান। নবিপ্রেমেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তিনি তাঁর জান-মাল, অর্থ-স্বার্থ, সন্তান-সন্ততি সব কিছুর চেয়ে আল্লাহর নবি (দ.)-কে বেশি ভালবাসতেন। ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে মৃত্যু অবধি তিনি তাঁর বিশ্বাস ও কর্মকা-ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ নবিপ্রেমিকের প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি নবি (দ.)-এর নুবুয়্যতের প্রচারকালীন কুরাইশ কর্তৃক আক্রমনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার হয়েছেন। নিজের সব সম্পদ তাঁর কদমে উৎসর্গ করেছিলেন। হিজরতের রাতে কঠিন বিপদের সময় নবির সাথী হয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে আল্ল­াহর নবি (দ.) কোন এক রাতে হিজরত করবেন- এ ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বিনিদ্রায় রাত কাটিয়ে ছিলেন এই ভেবে যে, আল্ল­াহর রাসুল (দ.) এসে যদি একাধিকবার কড়া নাড়তে হয় তাহলে তাঁর কষ্ট হবে এবং এটি তাঁর সাথে বেআদবির শামিল হবে। হিজরতকালীন সওর পাহাড়ে গর্তের পা রেখে নবির আরাম নিশ্চিত করতে গিয়ে সাঁপের দংশনের শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখী অবস্থানে এসেও নিজের জীবন থেকে নবির ঘুমকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ওহুদ ও হুনাইন যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন তখনও নবি (দ.)-এর পাশে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া আল-কুরআন সংকলনের ব্যবস্থা গ্রহণ, হুদায়বিয়ার সন্ধির পক্ষে অবস্থান নেয়া, নামাজ ও যাকাতের মধ্যে বিভাজনের বিরোধিতা করা, রাসুলুল্ল­াহ (দ.)-এর অন্তিম শয্যায় উচ্চারিত বাক্য (আল্ল­াহ তায়ালা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও তাঁর নৈকট্যের মাঝে এখতিয়ার দিয়েছেন) শুনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়া, সবার বিরোধিতা সত্বেও সিরিয়া অভিযানের সিদ্ধান্তে অটল থাকা, নবি (দ.)-এর ইন্তিকালের পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় পাগলপারা সাহাবীগণকে শান্তনা প্রদান এবং সময় উপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, খলিফা নির্বাচনে হিমশিম খাওয়ার সময় নীতি নির্ধারণী হাদিস (ইমাম হবে কুরাইশ থেকে) বর্ণনা করা ইত্যাদি বিষয় প্রমাণ করে যে, তিনিই সাহাবিগণের মধ্যে সবচেয়ে বিদ্বান ব্যক্তি।

আল্ল­াহর নবি (দ.)-এর প্রতি ভালবাসা, সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর অনুকরণে হযরত আবু বকর (র.)-এর মত অন্য কাউকে পাওয়া যায় না। তাই আল-কুরআনের ভাষায় তাঁকে “ছা-নিউস্ নাইন” বা দু’জনের অন্যতম তথা আল্ল­াহর রাসুল (দ.)-এর পর দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আর আল্লাহর নবি (দ.)-এর ইন্তিকালের পর ইসলাম ও মুসলমানদের দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে তাঁর বিচক্ষণতা ও অবিচলতার কারণে ইসলাম ধর্ম অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাই ঐতিহাসিকগণ তাঁকে ইসলামের ত্রাণকর্তা উপাধিতে ভূষিত করেছেন। কথিত আছে, খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরও তিনি কাপড়ের ব্যবসা চালিয়ে যেতে গেলে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যঘাত সৃষ্টি হয়। তাই পরামর্শ সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁর জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ব্যবস্থা করা হয়, যা দিয়ে তাঁর পরিবার কোনরকম চলত। একদিন তাঁর ঘরের কোণে কিছু শস্য জমা দেখে তিনি প্রশ্ন করলেন এগুলো কীভাবে সঞ্চিত হলো? তাঁর স্ত্রী বললেন, বায়তুল মাল থেকে আমাদের জন্য যা দেয়া হয় সেগুলো থেকে এক মুষ্টি করে করে এগুলো জামাইছি। তিনি বললেন, “তাহলে আমাদের পরিবারে কোষাগার থেকে প্রয়োজনাতিরিক্ত খাবার এসেছে, যেগুলো না হলে আমরা চলতে পারি। সুতরাং বায়তুল মাল থেকে যা দেয়া হয় তার চেয়ে এক মুষ্টি কম দেয়া হোক এবং সঞ্চিত এই শস্য বায়তুলমালে পাঠিয়ে দেয়া হোক”।

ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

The Post Viewed By: 251 People

সম্পর্কিত পোস্ট