চট্টগ্রাম শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

একটি সময়োচিত সিদ্ধান্ত ভর্তির জন্য ডোপ টেস্ট

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

একটি সময়োচিত সিদ্ধান্ত ভর্তির জন্য ডোপ টেস্ট

বর্তমান সময়ে দেশে মাদক এক ভয়ংকর রূপে আবির্ভুত হয়েছে। এখন দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেছে মরণনেশা ইয়াবাসহ নানা মাদক। মাদকের এই ভয়ংকর বিস্তারে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় যুবসমাজ, যাদের হাতে রয়েছে স্বয়ম্বর বাংলাদেশ গড়ার চাবিকাঠি। এ প্রেক্ষাপটে মাদকের ভয়ংকর থাবা থেকে দেশের যুবসমাজকে রক্ষার জন্যে সরকার নানামাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একদিকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আলোকে চলছে মাদকবিরোধী অভিযান, অন্যদিকে মাদকের কুফল বিষয়ে প্রচার-প্রচারণাও জোরদার করা হয়েছে। সারাদেশে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে এখন মাদকের প্রসার অনেকটাই কমে গেছে। এটি আশা জাগানিয়া সুসংবাদ, সন্দেহ নেই। তবে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির আগে ডোপটেস্ট বা বিশেষ স্বাস্থ্যপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার যে উদ্যেগ নেয়া হয়েছে তাও প্রশংসাযোগ্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশক্রমে মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। রবিবার জাতীয় সংসদে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে অবশ্যই ডোপটেস্টে উর্ত্তীর্ণ হতে হবে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সাধুবাদযোগ্য। নৈর্ব্যক্তিক প্রয়োগ হলে এ সিদ্ধান্ত দেশের জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, দেশের সব সরকারি চাকরিতেও প্রবেশের আগে ডোপটেস্ট করা বাধ্যতামূলক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের আওতাধীন সকল অধিদফতর ও সংস্থাকে নির্দেশনা দেয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখা থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে সকল শ্রেণির সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে ডোপটেস্ট অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়, যা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। আগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সময় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শুধু প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা করার বিধান চালু ছিল। দেশে মাদকাসক্তির পরিমাণ আশংকাজনকহারে বাড়ার প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টের বিধান বাধ্যতামূলক করা হয়। ডোপটেস্ট বাধ্যতামূলক করার পর গত বছর দুটি নিয়োগ পরীক্ষায় ২৪ জনকে চিহ্নিত করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। সরকারের এ পদক্ষেপের পর চাকরি প্রার্থীরা মাদক গ্রহণ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে। অর্থাৎ সরকারের এ সিদ্ধান্তের সুফল মিলছে। এখন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রেও ডোপ টেস্টের বিধান চালু করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে। ডোপ টেস্টকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে সর্বক্ষেত্রে কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে পুরো দেশকেই মাদকমুক্ত করার পথ মসৃণ হয়ে যাবে।

নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। দেশের এমন কোনো এলাকা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকের থাবা নেই। দেশজুড়ে এক বিশাল জাল বিস্তার করে আছে এই মরণ নেশার ভয়াবহ সিন্ডিকেট। আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র মাফিয়াদের সঙ্গেও রয়েছে এদের শক্ত ও গভীর যোগাযোগ। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, মাদকের ভয়াবহতায় নিষ্পাপ শৈশব-কৈশোর হিংস্র বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। এখন গ্যাং কালচারে আসক্ত হয়ে কিশোররা নানা অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। তাতেও ইন্ধন দিচ্ছে মাদক। সড়কে নৃশংসতার মূল কারণও চালকদের মাদকাসক্তি। দিনদিন বাড়ছে মাদকজনিত অপরাধ। এ অবস্থায় সরকারি চাকরিতে প্রবেশকালে ও উচ্চশিক্ষালয়ে ভর্তির সময় ডোপ টেস্টের বিধান অত্যন্ত সময়োচিত বলতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরি ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে ডোপটেস্টে উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত মাদক প্রতিরোধে বড় রকমের ভূমিকা রাখবে। তবে, কাক্সিক্ষত ফল পেতে হলে এ বিষয়ে যথাযথ নজরদারীও দরকার। ডোপটেস্ট যাতে যথাযথ স্বচ্ছতার সঙ্গে হয়, তার নিশ্চয়তাও বিধান করতে হবে। একইসঙ্গে মাদকব্যবসার সাথে যুক্তদের শণাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া এক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন স্থানের মাদকচক্রে রাজনীতিকদের জড়িত থাকার চিত্র ফুটে উঠেছে। এটি একটি ভয়ঙ্কর বার্তা। সর্বনাশা মাদকচক্র ভেঙে দিতে চাইলে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। শুধু সেবন নয়, মাদকের উৎপাদন, অনুপ্রবেশ, বাজারজাতকরণ, কেনাবেচাসহ সব ক্ষেত্রেই কঠোর পদক্ষেপ থাকতে হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে মাদকদ্রব্যের প্রাপ্তি সহজলভ্য যাতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। যে কোনো মূল্যে ঠেকাতে হবে মাদকের অনুপ্রবেশ। দেশেও যাতে মাদকদ্রব্য উৎপাদন হতে না পারে, সে ব্যাপারেও সচেতন থাকতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক সচেতনতা ও নীতিনৈতিকতার উন্মেষ ঘটানোর কর্মসূচিও দরকার।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 88 People

সম্পর্কিত পোস্ট