চট্টগ্রাম রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

পুকুরে ডুবে শিশুমৃত্যু

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ

পুকুরে ডুবে শিশুমৃত্যু

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রতিদিনই ঘটে চলেছে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা। কিন্তু এমন অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা রোধে বলিষ্ঠ কর্মসূচি নেই বললেই চলে। গত শনিবারও রাউজানে পুকুরে ডুবে পরিবারের একমাত্র ছেলেসন্তানের মৃত্যু হয়েছে। পুকুরে ডুবে এমন করুণ মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
গতকাল দৈনিক পূর্বকোণে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, শনিবার সকাল ১০টায় হাবিবুল্লাহ নামের ৬ বছর বয়সী এই ছেলেটি পরিবারের সবার অজান্তে খেলতে খেলতে পেছনের পুকুরে পড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর তার দেহ পানিতে ভেসে উঠে। পরিবারের সদস্যরা পানি থেকে শিশুটির ভাসমান দেহ উদ্ধার করে গহিরা জে কে মেডিকেলে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে জানান। শিশুটির এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এর আগে লোহাগাড়ায় নানাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মোহাম্মদ আরফাত নামের তিন বছরের অন্য এক শিশুরও মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার বিকেল ৩টায় উপজেলার পূর্ব কলাউজানের মিয়াজি পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি মায়ের সাথে নানাবাড়ি বেড়াতে যায় শিশুটি। বুধবার খেলতে গিয়ে বাড়ির পাশের পুকুরে পড়ে যায় সে। পরে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করলে শিশুটিকে পুকুরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। দ্রুত উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবে প্রতিদিনই সারাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় ৯৯ ভাগই সাঁতার জানে না। আবার তাদের গতিবিধির ওপর থাকে না পরিবারের নজরদারীও। বোঝাই যাচ্ছে, শিশুদের প্রতি পরিবারের লোকজনের যথাযথ নজর না থাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে। যদি যথাসময়ে তাদের সাঁতার শেখানো হতো এবং কোথায় যাচ্ছে, কী করছে ইত্যাদি বিষয়ে নজর রাখা হতো তাহলে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে হতো না নিশ্চয়ই। নানা গবেষণাপ্রতিবেদন বলছে, আমাদের দেশে শিশুদের অন্যতম ঘাতক হচ্ছে পানিতে ডুবে মৃত্যু। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের সচেতনতা ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবেই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বিভিন্ন রোগে শিশুমৃত্যুহার কমেছে। কিন্তু বিপরীতে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুহার বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পানিতে ডোবাসহ বিভিন্ন ধরনের জখমে মৃত্যু ও আহতদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপ মতে, দেশে প্রতিদিন ৫৩ জনের মৃত্যু হচ্ছে পানিতে ডুবে। এর মধ্যে ১ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোর ৪০ জন এবং বয়স্ক ১৩ জন। সেভিং লাইভস ফ্রম ড্রাউনিং প্রজেক্ট (সলিড) ইন বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যা মোট শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশ। আর প্রতিদিন গড়ে ৪০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। প্রসঙ্গত, দেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বেশিরভাগ খবর গণমাধ্যমে আসে না। ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনায় শিশুমৃত্যুর হার আরো বেশি হতে পারে। আর বাংলাদেশে এ মৃত্যু ঘটে প্রধানত গ্রামাঞ্চলের পুকুর, ডোবা, নালা, লেক ও নদীতে। শিশুদের ওপর নজর না রাখা, সাঁতার না জানা, পুকুরে বা নালায় সুরক্ষা না থাকা পানিতে ডোবার ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পানিতে ডুবে মৃত্যু বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলেও তা প্রতিরোধে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে দেশব্যাপী কোন বলিষ্ঠ কর্মসূচি নেই।
আমরা মনে করি, পানিতে ডুবে মৃত্যুকে ‘নিয়তি’ বলে আর নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ নেই। মৃত্যুর কার্যকারণগুলো ব্যাখ্যা করে সে অনুযায়ী জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের সাঁতার শেখার ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাড়াতে হবে শিশুদের প্রতি পরিবারের নজরদারীমূলক দায়িত্বশীলতা। এ ব্যাপারে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 87 People

সম্পর্কিত পোস্ট