চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৮:২৯ অপরাহ্ণ

ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব

সবকিছুরই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা। প্রত্যেক ভাষার সৃষ্টির্কতাও তিনি। সৃষ্টিকুলের মধ্যে তিনি মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ হলো ভাব প্রকাশের ক্ষমতা; যা অন্য জীবের মধ্যে অনুপস্থিত। ভাব-প্রকাশের মাধ্যমই ভাষা। ভাব-প্রকাশের পদ্ধতিও শিখিয়েছেন আল্ল­াহ তায়ালা। তাই মাতৃভাষা মানবজাতির জন্য মহান আল্ল­াহর বড় দান। মাতৃভাষাচর্চা এবং এর মাধ্যমে ভাব বিনিময় করা মানুষের জন্মগত অধিকারও বটে। এ অধিকার পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত। আল্লাহতায়ালা বলেন, “তিনি (আল্ল­াহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং ভাব-প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন” (সুরা আর-রহামান: ২-৩)। মাতৃভাষার প্রতি মানুষের ভালবাসাও প্রকৃতিগত ও সহজাত। মায়ের ভাষায় ভাব-প্রকাশ করতে কাউকে বাধা প্রদান করা মানে তার জন্মগত অধিকার হনন করা। বাঙালী জাতির এ অধিকার হনন করতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। তারা বাঙালীর ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। তাদের একটি যুক্তি ছিল, উর্দু ইসলামি ভাষা। সুতরাং পাকিস্তনের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু। তাদের এ সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ এবং কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী। এমন আগ্রাসনের কারণে তাদের সাথে বাঙালীদের সংঘাত লেগেছে; যার পরিণতিতে সংঘটিত হয়েছে “বায়ান্নো”-এর ভাষা আন্দোলন। আত্মাহুতি দিতে হয়েছে রফিক, সালাম, জাব্বার, শফিকসহ অনেক বাঙালীকে। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙালীরা পেয়েছে মাতৃভাষার অধিকার। বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাংলা ভাষার মর্যাদা। সুসংহত হয়েছে বিশ্বের সব জাতির মাতৃভাষার অধিকার।

আল্ল­াহতায়ালা মানবজাতিকে বিভিন্ন জাতি, গোত্র ও শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। এ বিভক্তির ভিত্তি হলো ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল, সংস্কৃতি ইত্যাদি। তিনি বলেন, “হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক মানব ও এক মানবী হতে এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পার” (সুরা আল-হুজুরাত: ১৩)। মূলত বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের ভিন্নতার পথ ধরেই অজস্র ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। কেননা, প্রত্যেক জাতিরই স্বতন্ত্র ভাষা থাকে; যা প্রকাশ, বর্ণনাভঙ্গি এবং মৌলিকত্বে অন্যদের থেকে ভিন্ন হয়। ভাষার এই বৈচিত্র্য মানবজাতির মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। ভাষায় বাহুল্য এবং জ্ঞানে আধিক্য দানের মাধ্যমেই আল্ল­াহ তায়ালা হযরত আদম (আ.)-কে ফেরেস্তাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তাঁকে প্রত্যেক ভাষা শিক্ষা দিয়ে তাঁর অনাগত সব সন্তানের ভাষার মর্যাদা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিয়েছেন” (সুরা আল-বাকারা: ৩১)। এখানে “যাবতীয় নাম” দ্বারা পৃথিবীর সব ভাষাকে বুঝানো হয়েছে।

ভাষার বৈচিত্র্য আল্লাহতায়ালার কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। এটি তাঁর সৃজনক্ষমতা এবং অস্থিত্বেরও প্রমাণ। যারা জ্ঞানবান তাঁদের জন্য এতে রয়েছে চিন্তার খোরাক। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “তাঁর মহিমার নিদর্শন হচ্ছে মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে অবশ্যই জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে” (সুরা রোম: ২২)। সুতরাং মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি অন্যের ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া ও সম্মান করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। কারণ, প্রত্যেক ভাষা আল্লাহর সৃষ্টি এবং আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর ভাষা, যদিও ব্যবহারকারী হিসেবে একেক ভাষাকে একেক জাতির ভাষা বলা হয়। ধর্মীয় বাধ্য-বাধকতার কারণে অবশ্যই আরবি ভাষা আয়ত্ত করা এবং এর প্রতি সম্মান দেখানো প্রত্যেক মুসলমানের নৈতিক দায়িত্ব। সুতরাং ইসলামি বিধান মতে কোন ভাষাকে অবজ্ঞা করা যাবে না। কোন ভাষা কারো ওপর চাপিয়ে দেয়াও যাবে না। কেউ যদি ভাষা বা ভূমির ভিত্তিতে তার পরিচয় দেয় তাতে তার ধর্মীয় পরিচয়ে কোন আঘাত আসবে না। এ দেশের কোন মুসলমানের ‘বাঙালী’ বা ‘বাংলাদেশি’ বলে পরিচয় দেয়াটা ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ধর্মের ভিত্তিতে পরিচয় দেয়াটাও অযৌক্তিক নয়। যেমন আমাদের জাতীয় কবি দিয়েছেন, “ইসলাম আমার ধর্র্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।”
আল্লাহতায়ালার প্রেরিত নবি-বাসুলগণ (আ.) নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতেন। তাঁদের প্রতি নাজিলকৃত আসমানি কিতাব এবং ছহিফাসমূহ তাঁদের স্ব স্ব মাতৃভাষায় অবতীর্ণ হয়েছিল এবং তাঁরা মাতৃভাষায় সেগুলোর চর্চা এবং প্রচার করতেন। এভাবে আল্লাহ তায়ালা সব জাতির ওপর মাতৃভাষার চর্চা আবশ্যক করেছেন এবং প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “আমি প্রত্যেক রাসুলকে স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যেন তিনি তাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন” (সুরা ইব্রাহিম: ৪)। হযরত দাউদ (আ.)-এর উম্মাহর ভাষা ছিল ইউনানি। সেই ভাষায় ‘যাবুর’ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত ঈসা (আ.)-এর উম্মাহর মাতৃভাষা ছিল সুরিয়ানি। সুরিয়ানিতে ‘ইঞ্জিল’ কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে। হযরত মুহাম্মদ (দ.) ছিলেন আরবি। তাঁর মাতৃভাষায় আল-কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘‘নিশ্চয় আমি আরবি ভাষায় আল-কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যেন তোমরা বুঝতে পার” (সুরা ইউসুফ: ৩)।

ভাষাবিদগণের মতে, অন্য ভাষাভাষী লোকদের সম্পর্কে জানতে হলে তাদের ভাষা শিখতে হবে। আজ যে কোন ভদ্রলোকের অন্তত তিনটা ভাষা শেখা ছাড়া উপায় নেই। ইসলামেও দ্বিতীয় ভাষা, বিদেশি ভাষা, আন্তর্জাতিক ভাষা স্বীকৃত। হযরত যায়েদ (র.) বলেন, “আল্লাহর রাসুল (দ.) আমাকে সুরিয়ানি ভাষা শিখার নির্দেশ দিলেন। আমি অর্ধমাসের মধ্যেই শিখে নিলাম। এ ভাষা আয়ত্ত করার পর থেকে ঈহুদিদের নিকট যে কোন চিঠি আমি লিখতাম এবং তাদের চিঠি আল্ল­াহর রাসুল (দ.)-কে পড়ে শোনাতাম” (আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৬৪৫)। দ্বীনের দাওয়াতি কাজে বিদেশি ভাষা খুবই সহায়ক। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “তাদের দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীন বুঝে নেয় এবং সতর্ক করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে; যেন তারা সতর্ক হতে পারে” (সুরা তাওবা: ১২২)। এ আয়াতের আলোকে প্রত্যেক জাতি, গোত্র, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কিছু ব্যক্তির ওপর দ্বীনের বিশেষ জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। তাদের জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য হবে আপন জাতি বা গোত্রকে কুকর্মের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা। এ জ্ঞান অর্জনের জন্য তাদেরকে নিজ দেশ বা এলাকা থেকে বের হওয়া আবার স্বদেশে ফিরে এসে নিজের জাতিকে সচেতন করার কথা বলা হয়েছে। স্বজাতিকে বুঝাতে হবে মাতৃভাষায়। সুতরাং মাতৃভাষায় দক্ষতা না থাকলে দাওয়াতের কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। উপরন্তু দাওয়াতের আরেকটি মাধ্যম হলো লেখালেখি। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা ও লেখালেখির যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তাই পৃথিবীর সব দা‘য়ী (দ্বীন প্রচারক) ও দ্বীন বিশেষজ্ঞ নিজের মাতৃভাষায় পা-িত্য অর্জনপূর্বক বক্তব্য, ওয়াজ-নসিহত, লেখালেখি ইত্যাদির খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।

মৌলিক কিছু ইবাদতের ব্যাপারে আরবি ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ঈমানিয়্যাতের (বিশ্বাগত) বিষয়গুলো মাতৃভাষায় বুঝা আবশ্যক। এগুলো আরবিতে বলা বা বুঝা আবশ্যক নয়। তবে যাদের ভাষা আরবি তারা আরবিতে বুঝতে হবে। যেমন, তাওহিদ (আল্ল­াহকে এক হিসেবে জানা) ও রিসালত (হযরত মুহাম্মদকে রাসুল হিসেবে জানা) ইসলামের মৌলিক দুটি বিষয়। ইসলামের প্রথম কালিমা হলো, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ” অর্থাৎ আল্ল­াহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, হযরত মুহাম্মদ (দ.) তাঁর বান্দা ও রাসুল। এখানে কালিমার বিষয়টি নিজের মাতৃভাষায় বুঝে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এভাবে সপ্ত ঈমানের সব বিষয় বুঝতে হবে নিজের ভাষায়। কারণ, এখানে মূল বিষয় ঈমান; যার সম্পর্ক বিশ্বাসের সাথে, ভাষার সাথে নয়। যে ভাষায় সে বলুক না কেন, তার বুঝার বিষয়টি প্রথম ভাষার সাথে সম্পৃক্ত। আর প্রথম ভাষাই হলো মাতৃভাষা। সুতরাং নামাযে আরবি ভাষায় কুরআন শরিফ পাঠ করাসহ কয়েকটি বিধান ব্যতিত বাকি সবগুলো বিষয় নিজের ভাষায় বুঝে নিতে হয়। তাই ইসলামি বিধানে মাতৃভাষাচর্চা করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে আল্লামা রূমির বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “সব ফারসিতে বলো যদিও আরবি শ্রেয়” (শাখছিয়্যাতুল মুসলিম, পৃ. ৬৮)।

ইসলাম শুধুমাত্র ভাষাচর্চাকে উৎসাহিত করেছে তা নয়; বরং বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চা, শুদ্ধ উচ্চারণ, ভাষার প্রাঞ্জলতা অর্জন ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। বিশুদ্ধ মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) ছিলেন অনন্য। তিনি আরব বেদুইনদের নিকট থেকে মাতৃভাষা রপ্ত করেছেন। তৎকালীন আরবে বেদুইনরা ছিল সবচেয়ে শুদ্ধভাষী। তাই সম্ভ্রান্ত আরব বংশগুলো তাদের শিশুদেরকে আরব বেদুইন গোত্রগুলোর নিকট প্রেরণ করত। হযরত মুহাম্মদ (দ.)-কে আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধভাষী গোত্র বনু সা‘দের হালিমা সা‘দিয়ার নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। তিনি হযরত হালিমার নিকট ছয় বছর ছিলেন এবং বিশুদ্ধভাবে মাতৃভাষা রপ্ত করেন। তিনি বলছেন, “আমি আরবের সবচেয়ে শুদ্ধভাষী। কারণ, আমি কুরায়শ বংশে জন্মগ্রহণ করেছি এবং সা‘দ বিন বকর গোত্রে শৈশব কাটিয়েছি” (আন-নিহায়া, পৃ. ৪৪৭)। তিনি এমন বিশুদ্ধভাবে কথা বলতেন যে, তাঁর বিশুদ্ধ উচ্চারণে বাকপটু আরবরাও বিস্মিত হতেন।
সারকথা হলো, মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও চিন্তা-চেতনার পদ্ধতিগুলো ভাষার সাথে ঘনিষ্টভাবে জড়িত। মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশ করা যায় মাতৃভাষায়। তাই বলা হয়েছে, “নানান দেশের নানান ভাষা। বিনা স্বদেশীয় ভাষা, পুরে কি আশা?” দ্বীনচর্চা এবং বুঝার ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত মুহাম্মদ (দ.)-এর মাতৃভাষা আরবি ছিল বিধায় আল-কুরআন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল বুঝা ও অনুধাবন করা। বুঝার প্রধান অবলম্বন মাতৃভাষা। সুতরাং মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে সঠিকভাবে দ্বীন বুঝা সম্ভব নয়। তাই ইসলাম ধর্মে আরবিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেকের মাতৃভাষাকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী এ বাস্তব সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়ায় বাঙালীদেরকে রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ভাষার অধিকার আদায় করতে হয়েছে। বাঙালীদের সে সংগ্রাম ছিল কুরআন-সুন্নাহ সম্মত। বীর বাঙালীদের সে আত্মত্যাগের ফসল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাবৎ বিশ্বের সব জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাঙালী জাতির অবদান অনস্বীকার্য। এ জন্য আমরা গর্বিত।

ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 192 People

সম্পর্কিত পোস্ট