চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২০

সর্বশেষ:

নিরুপদ্রব রাখতে হবে খাদ্য ও বিচরণক্ষেত্র হাতির আক্রমণে বাড়ছে প্রাণহানি

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ

নিরুপদ্রব রাখতে হবে খাদ্য ও বিচরণক্ষেত্র হাতির আক্রমণে বাড়ছে প্রাণহানি

চট্টগ্রামের লোকালয়ে হাতির পালের হানা দেয়ার খবর সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই গণমাধ্যমের আসছে। বিশেষ করে পাহাড়-অরণ্যের কাছাকাছি জনপদগুলোতে হাতির পদচারণা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি হতাহতের ঘটনাও ঘটছে প্রচুর। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা আইইউসিএন, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রামে হাতির আক্রমণে প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত ৫ বছরে হাতির আক্রমণে প্রাণ গেছে ৫৪ জনের। সর্বশেষ বোয়ালখালী উপজেলায় ৯টি হাতির একটি পাল লোকালয়ে প্রবেশ করে তিন জন সাধারণ মানুষ ও একটি গরুকে হত্যা করার খবর প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক পূর্বকোণে। এভাবে বিভিন্ন স্থানে বার বার লোকালয়ে হাতির পালের অনুপ্রবেশ এবং ফসলহানিসহ হতাহতের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত, খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগকর। তবে এসব ঘটনা যে বন-প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর প্রতি মানুষের আগ্রাসী তৎপরতার পরিণাম, তাতে দ্বিমতেরও সুযোগ নেই।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত দুই বছর ধরে বারবার পাহাড় ছেড়ে লোকালয়ে চলে আসছে হাতি। সেসব এলাকাগুলোতেই হাতি আসছে, যেখানে আগে কখনো হাতির এমন বিচরণ দেখা যায়নি। হাতির আক্রমণে প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে পাহাড়-বন উজাড়, দখল আর অপরিকল্পিত উন্নয়নে হারিয়ে যাচ্ছে বিচরণ ক্ষেত্র। দেখা দিয়েছে খাদ্যসঙ্কট। আর এই কারণে লোকালয়ে চলে আসছে হাতির পাল। ফলে হাতি পাল বেঁেধ খাদ্যের খোঁজে ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। এতে বিশালকায় অথচ শান্ত এই পশুর আক্রমণে ঘটছে প্রাণহানি। প্রসঙ্গত, একটি হাতি প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কেজি খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু বনে-জঙ্গলে মানুষের লোলুপ দৃষ্টি পড়ার ফলে হাতির খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আর এই খাদ্যঘাটতি মিটাতেই হাতি ঝুঁকি নিয়ে প্রবেশ করছে লোকালয়ে। আবার আবাসস্থল ধ্বংস, চলাচল পথ বা করিডোর বাধাগ্রস্ত হওয়া ও হাতির চলাচলপথে মানববসতি স্থাপনের কারণে লোকালয়ে বুনো হাতির তা-বও বেড়ে গেছে। উল্লেখ্য, খাওয়ার পর হাতি স্থির থাকতে পারে না। দৈনিক ১৫-১৬ ঘণ্টা হাঁটতে থাকে। একটি হাতির দৈনিক ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। কিন্তু বনজঙ্গল উজাড় হতে থাকায় হাতির ৬০-৭০ কিলোমিটার হাঁটার জায়গা নেই। ফলে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে হাতির আক্রমণে প্রাণ হারায় ৪ জন। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ৯ জন, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ১৮ জন, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ জন এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে গত দেড় বছরে আনোয়ারায় হাতির আক্রমণে মারা যায় ৭ জন। এছাড়াও চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, রাঙ্গুনিয়া, চকরিয়া, বান্দরবানের লামা-নাইক্ষ্যংছড়ি ও কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় হাতির আক্রমণে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কারণ এই রুটটি হচ্ছে হাতির চলাচলের (করিডোর) পথ। অন্য এক পরিসংখ্যান বলছে, গত নয় বছরে হাতির পায়ে পিষ্ঠ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৪৮ জন। চরম খাদ্যাভাব, দুর্ঘটনা আর মানুষের হামলাসহ নানা কারণে হাতিও মারা যাচ্ছে সমান তালে। পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৮ বছরে মারা গেছে ৮৮টি হাতি। খোদ সরকারের বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে মহাবিপদে আছে হাতি। বিচরণ ক্ষেত্রসহ নিরাপদ আশ্রয় ও খাবার নিশ্চিত করা না গেলে বিপন্ন হতে পারে বন, বন্যপ্রাণি ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু ঐরাবত। একইসঙ্গে বিভিন্ন জনপদেও পাগলা হাতির তা-বে ফসল ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটবে। বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ের বন কেটে উজাড় করার ফলে হাতি চলাচলের পথ নষ্ট হয়েছে। মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় হাতির প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। আবাসস্থল এবং মিয়ানমারে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় টেকনাফ থেকে হাতিগুলো এসেছে চুনতি অভয়ারণ্যে। সেই হাতিগুলো এখন চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া ও বোয়ালখালী পর্যন্ত আসে। পাহাড়ে হাতি যদি ঠিকমত খাওয়ার পেত এবং বসবাসের জায়গা থাকতো তাহলে হাতি বারবার লোকালয়ে আসতো না।

আমরা মনে করি, হাতির আক্রমণ থেকে লোকজনকে বাঁচাতে সর্বাগ্রে বন্ধ করতে হবে নির্বিচারে বন-জঙ্গল উজাড়করণ ও পাহাড় দখল তৎপরতা। প্রশস্ত করতে হবে হাতির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র। পর্যাপ্ত খাদ্যেরও ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ে বনায়নের সময় হাতির খাদ্যের উপযোগী গাছপালা লাগাতে হবে। বন-জঙ্গলে শিকারিদের অপতৎপরতাও বন্ধ করতে হবে। তারা খাবার ও পানির সন্ধানে যেসব পথ দিয়ে নিয়মিতভাবে চলাচল করে, সেগুলোকে মানুষের উপদ্রব থেকে মুক্ত করার উদ্যোগও নিতে হবে। হাতি অধ্যুষিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সীমানা হতে বাইরের দিকে কমপক্ষে দুই কিলোমিটারের মধ্যে বন্ধ করতে হবে যে-কোনো ধরনের চাষাবাদ, ইটের ভাটা ও বসতি স্থাপন। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার বলিষ্ঠ উদ্যোগও থাকতে হবে। যদি হাতিকে পর্যাপ্ত খাদ্য ও পরিবেশ দিয়ে নির্বিঘœ রাখা যায়, তাহলে লোকালয়ে তারা হানা দেবে না। এতে ফসল ও জনহতাহতের ঘটনাও ঘটবে না।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 93 People

সম্পর্কিত পোস্ট