চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

শীতের পাখি শেখ

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ

একেএম জাকারিয়া

শীতের পাখি শেখ

মানুষসহ সচরাচর সব প্রাণীদেরই সীমান্তরেখা থাকে। পাখিদের কোনও সীমান্ত রেখা নেই। পাখিরা স্বচ্ছন্দে সীমাহীন অন্তরীক্ষে পাখনা মেলে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঈষৎ মেহনতে উড়ে বেড়ায়। পাখিরা বাঁচার তাগিদে,খাদ্যের অন্বেষণে প্রত্যহ উড়ে চলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। বড়ো বিস্ময়কর তাদের বাসা বুনার সাধনচাতুর্য, সন্তান জন্মদান ও লালনপালন। প্রচ- ঝড়বাদল, প্রখর সূর্যকিরণ, তুষারপাতসহ প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতা অগ্রাহ্য করে পাখিরা রওনা দেয় বহুসহ¯্র মাইল দূরের দেশে। পাখি সম্পর্কে প্রাণিতত্ত্বে বিশদ বিবৃতি রয়েছে। পাখির সহজবোধ্য সংজ্ঞা হচ্ছে, ‘সচরাচর উড়তে পারে এমন,পালকে আবৃত দেহ, তীক্ষ দৃষ্টি ও প্রখর শ্রবণশক্তিসম্পন্ন উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট ডিম্বাজ মেরুদ-ী প্রাণিবিশেষই পাখি। অথবা ‘দুই ডানা ও দুই পা-যুক্ত এবং সাধারণত আকাশে ওড়ার ক্ষমতাযুক্ত ডিম প্রসবকারী প্রাণীই পাখি।’ বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে পাখির বিভিন্ন নাম দেখতে পাওয়া যায়। তারমধ্যে পক্ষী, বিহগ, বিহঙ্গ, খগ ইত্যাদি উল্লেখ্য।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এসব পরিযায়ী পাখি তাদের গমনের লক্ষ্যস্থল শতভাগই ঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারে। শীতঋতু এলেই অতিথি পাখির মধুর গুঞ্জনধ্বনিতে দি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ খ্যাত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের নয়কুড়ি কান্দা, ছয়কুড়ি বিল মুখরিত হয়ে ওঠে। এ হাওরের কান্দা ও বিলে প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে। ২০১১ সালের পাখিগণনাতে এই হাওরে চটাইন্নার বিল ও তার খাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই বিল, হাতির গাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিলে প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি বা ওয়াটারফাউলের মোট ২৮,৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। এ গণনাতে অপরাপর পাখির পাশাপাশি নজরে আসে কুট, মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়ংহাস; সাধারণ ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা শোভেলার, লালচে মাথা ভুতিহাঁস, লালশির, নীলশির, পাতিহাঁস, লেনজা, ডুবুরি, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখিও।

ওপরে বা পূর্বে লিখিত পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পাখি হচ্ছে জেন্ডা সিগলা (জাডানিক) বা সরালী হাঁস। এসব হাঁস দলবেঁধে শিস দিতে দিতে উড়ে চলে এক বিল থেকে অন্য বিলে, এক হাওর থেকে অন্য হাওরে, একদেশ দেশ থেকে অন্য দেশে। কালচে, বড় ও লম্বা গলার এ হাঁস দেখতে অবিকল দেশীয় পাতিহাঁসের মত। টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ে বসবাসরত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায়, সরালী হাঁস দিনের প্রথমভাগে ও শেষভাগে দলবেঁধে হাওর জলে সাঁতার কাটে ও মাছ ধরে। দিনের হালকা মিষ্টি রোদ এদের খুব প্রিয়। এই যে অবাধে আমাদের দেশে পাখি শিকার ও ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে এসব কিন্তু আদতে প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর জন্য নয়, শুধুমাত্র রুচির পরিবর্তনের জন্যই তারা নিজেরা শিকার করে অথবা কিনে নেয় নানারকমের পরিযায়ী পাখি। একটা লেনজা কিংবা একটা সরালী হাঁস-এ আর কতটুকুইবা মাংস হয়? এসব পরিযায়ী পাখি ব্যাতিরেকেও প্রোটিনের চাহিদা মেটানো কিংবা রুচির পরিবর্তন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা ও নিসর্গের প্রতি অনুরাগই সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে।
পাখি শিকারের মত নিষ্ঠুর কাজ বন্ধ করতে হলে আমাদের গণসচেতনতা বাড়ানো খুবই জরুরি। এর জন্য পত্র-পত্রিকায় নিউজসহ রেডিও-টেলিভিশনে বিবিধ ডকুমেন্টারি প্রচার করা উচিত।

সবুজ হলুদ ছায়াঘন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ, পাখির দেশ, গানের দেশ, কবিতার দেশ বাংলাদেশ পেয়েছে অতিথি পাখি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিশেষ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ফ্রেন্ডশীপ ইস্ট এশিয়ান-অস্ট্রেলিয়ান ফ্লাইওয়ে নামক অতিথি পাখি সংরক্ষণ ও গবেষক সংস্থা বাংলাদেশকে এ স্বীকৃতি দিয়েছে। সংস্থাটির দেয়া সনদ অনুযায়ী বাংলাদেশের টাঙ্গুয়ার হাওর, হাকালুকি হাওর, হাটল হাওর, নিঝুম দ্বীপ ও সোনাদিয়া-এই পাঁচটি এলাকা পরিযায়ী পাখিসমৃদ্ধ অঞ্চল।
পরিশেষে দেশের সবমানুষকে বলতে চাই, আমাদের হরিৎ হরিদ্রা ছায়াঘন অমলিন প্রকৃতিতে এসব পরিযায়ী পাখি যেন পায় মেহমানের যতœ-আত্তি ও নির্মল সুস্থিরতা, তাদের যেন যৎকিঞ্চিৎ অনিষ্টও না হয়। তারা যেন নিজেদের জ্ঞাতি-কুটুম্ব বন্ধুবান্ধব পরিজনসহ স্বদেশে সুস্থ ও সুন্দরভাবে ফিরে যেতে পারে এ সুযোগ তাদের দিতে হবে।

শেখ একেএম জাকারিয়া
কবি ও ছড়াকার, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট সদর হাসপাতাল,
সুনামগঞ্জ,বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 219 People

সম্পর্কিত পোস্ট