চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২০

আমাদের আরেকটি ভাষা আন্দোলন দরকার!

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

আমাদের আরেকটি ভাষা আন্দোলন দরকার!

পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার মধ্যে মাতৃভাষা জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রতীক। এ ভাষা আমাদের গৌরবের ও অহংকারের। আমাদের পুরো স্বাধীনতা জুড়ে আমাদের ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই আমাদের প্রথম ঐক্যবদ্ধ হওয়া। ভাষা আন্দোলন আমাদের অনেক সাহস যুগিয়েছে, আমাদের আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এই আত্মবিশ্বাস ও সাহস আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীন হয়েছি।

পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর একশো বছর কোম্পানির শাসন ও একশো বছর ব্রিটিশ এর প্রত্যক্ষ শাসন থেকে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি স্বাধীন দেশের জন্ম হয়। শুধুমাত্র ধর্মগত কারণে ভৌগোলিক সীমারেখায় অনেক দূরে অবস্থান করেও আমরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হই। পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আমাদেরকে মেনে নিতে পারেনি। ব্যর্থ রাষ্ট্রের তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান সেই স্বাধীনতার পর থেকে। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতার পর পাকিস্তান একটি সংবিধান রচনা করতে পারেনি। জোড়াতালি দিয়ে সংবিধান রচনা করতে সময় লেগেছিল নয় বছর, যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান রচনা করতে আমাদের সময় লেগেছিল মাত্র নয় মাস। যে সকল কারণে পাকিস্তান সরকার সর্বসম্মতক্রমে একটি সংবিধান রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছিল তারমধ্যে অন্যতম কারণ ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়টি নিয়ে। পাকিস্তানিরা বোকা ভেবে প্রথমত আমাদের মায়ের ভাষা মাতৃভাষাকে চিরতরে বিলীন করে দেয়ার জন্য এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সংবিধানে উল্লেখ করার পায়তারা করেছিল। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা রুখে দেয়। দিতে হয়েছিল শহীদ সালাম জব্বার রফিক বরকতের বুকের তাজা রক্ত। পাকিস্তানের সংবিধানে স্বীকৃতি পায় বাংলা ভাষা। বাঙালিরা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা কখনো বাঙ্গালীদের অধিকারের মূল্যায়ন করবেনা। তাই ভাষা আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে এক ধরনের জাতীয়তাবোধ জন্ম লাভ করে। ভাষা আন্দোলনে জয়লাভ এই জাতীয়তাবোধের অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মৌলিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত করতে প্রচেষ্টা চালায়। আমাদেরকে একটি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে তৈরি করতে চেয়েছিলো। পৃথিবীর বুকে আমরা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারি সে ষড়যন্ত্রে তারা লিপ্ত হয়েছিল।

বাঙালিরা বীরের জাতি সহজে তারা হার মানতে চায়না। রুখে দাঁড়ায় সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। আমাদের অধিকার অমর্যাদা থেকে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে আমাদেরকে অনুপ্রেরণা আত্মবিশ্বাস যোগায় আমাদের ভাষা আন্দোলন। পৃথিবীতে আমাদের মত জাতি বিরল যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। প্রমাণ করেছে বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা, আমাদের অহংকার। আমরা পৃথিবীর অন্যদের থেকে আলাদা।

কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৭ বছর পর আমরা আরো একটি ভাষা আন্দোলনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। যে স্পৃহা ও যে উদ্দেশ্য নিয়ে মাতৃভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানী কলোনিয়াল গুষ্টি থেকে রক্ষা করেছিল, যে কারণে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে আমরা আন্দোলন করেছিলাম আজকে মনে হয় আমরা নিজেরাই আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পারছিনা। আমরা নতুন একটি ভাষাগত উপনিবেশবাদের সম্মুখীন। ভাষার প্রশ্নে আজকে আমরা বিভক্ত। আমাদের মাতৃভাষা, আমাদের প্রাণের ভাষা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অবহেলিত। আমরা নিজেরাই আমাদের মাতৃভাষাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি ভাষাতে রূপান্তরিত করছি। কাগজে-কলমে মাতৃভাষা রক্ষায় অনেক প্রণোদনা দিলেও বাস্তবে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়না। বিশ্বায়নের ফলে নব্য ও শংকর সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটে। সাংস্কৃতিক হাইব্রিডাইজেশন, শিক্ষাগত হাইব্রিডাইজেশন ও ভাষাগত হাইব্রিডাইজেশন আমাদের উপর আবির্ভূত হয়েছে। পশ্চিমা সংস্কৃতি ও ইংরেজি ভাষার প্রতি আমাদের দুর্বলতা দিন দিন বাড়তে থাকে। জাতীয়ভাবে ইংরেজি ভাষার প্রতি কেন জানি একটি অতিরিক্ত দরদ পরিলক্ষিত হয়। ২-৪ লাইন ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারলে জ্ঞানী হওয়া যায়। পুরো জ্ঞান যেন ইংরেজি ভাষার মধ্যেই লুকায়িত। আমাদের মধ্যে এমন এক ধরনের বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয় যে যত বেশি ইংরেজি জানেন তিনি ততো বেশি জ্ঞানী।

ইংরেজি ভাষা জানা দোষের কিছু নয়। এটি একটি অতিরিক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতা। কিন্তু নিজের মাতৃভাষা না জেনে, শুদ্ধভাবে মাতৃভাষার চর্চা না করে ইংরেজি ভাষার চর্চা ও দক্ষতা অর্জন করা শুধু অন্যায়ই নয় বড় ধরনের অপরাধও। আমাদের স্কুল কলেজগুলোতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের মহাসমারোহ পরিলক্ষিত হয়। শিশুরা ইংরেজি বলতে পারলে শিক্ষক, অভিভাবক, মা-বাবারা অনেক গর্ববোধ করেন। একবারও প্রশ্ন করেননা তারা শুদ্ধভাবে বাংলা বলতে ও লিখতে পারে কিনা। আমাদের সমাজে শিক্ষাব্যবস্থার হাইব্রিডাইজেশন হয়েছে অনেক আগে। বাংলা ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক দশকে আমাদের সমাজের উপর নতুন একটি শিক্ষাব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটে। ত হচ্ছে ইংরেজি ভার্সন। আমাদের বাংলা ভাষার পাঠ্য বইগুলো অশুদ্ধ ইংরেজিতে অনুবাদ করে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করা হয় ইংরেজি ভার্সন। উচ্চ শিক্ষার কথা বাদই দিলাম। উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি চর্চা হতে পারে কারণ উচ্চশিক্ষা হচ্ছে বিশেষায়িত শিক্ষা, কিন্তু আমাদের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা হচ্ছে মৌলিক শিক্ষা। এখানে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবোধের একটি ভিত্তি তৈরি হবে। আর সেখানেই বড় ধরনের হাইব্রিডাইজেশন লক্ষ করা যায়। আমাদের সন্তানরা ভালো করে বাংলাও জানেনা ইংরেজিও জানেনা। তুলনামূলকভাবে বাংলার তুলনায় তারা ইংরেজিকে ভালোবাসে। তাদের কাছে বাংলা এক ধরনের ভীতিকর বিষয়।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে বাংলার তুলনায় ইংরেজির প্রতি অতিরিক্ত আহ্লাদ বাংলা ভুলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করছে। আমাদের অভিভাবকরা এই ধরনের হাইব্রিড স্কুল গুলোর প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আমাদের একক কোন সমাজ নেই একক কোন সংস্কৃতি নেই একক কোন ভাষা নেই আমরা অনেকগুলো সমাজের সৃষ্টি করেছি আমাদের দেশের ভেতরে আরেক ধরনের দেশ তৈরি করছি ভাষার ভেতরে আরেক ধরনের ভাষা তৈরি করছি। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা ভাষা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাষায় পরিণত হবে। ইংরেজির প্রতি আমাদের অতিরিক্ত কদর আমাদের মধ্যে এক ধরনের বিভক্তি তৈরি করছে। শহীদ সালাম জব্বার রফিক বরকতরা মনে মনে ভাবছেন যে ভাষাকে রক্ষা করার জন্য বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়েছি, যাদের জন্য দিয়েছি আজকে তাদের কাছে আমাদের মাতৃভাষা হচ্ছে অবহেলিত। আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের মাতৃভাষার অর্জন অনেক। জাতিসংঘের ইউনেস্কো এক সিদ্ধান্তে আমাদের মাতৃভাষা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। মাতৃভাষা দিবস একযোগে বিশ্বের সকল দেশ পালন করছে। এই অর্জন আমাদের বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
আমরা ইংরেজি ভাষার প্রতি অতিরিক্ত দুর্বলতা প্রকাশ করছি তা দোষের নয়। ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা। আমাদেরকে ইংরেজি জানতে হবে। তবে তা বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়। আমার কাছে মনে হয় আমাদের মনোভাব প্রকাশ করার জন্য, আমাদের সাহিত্য চর্চার জন্য ইংরেজি একটি পরিপূর্ণ ভাষা নয়। ইংরেজি আমাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দরিদ্র ভাষা। কারণ ইংরেজি ভাষা

আমাদের মনোভাব প্রকাশ করতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ। উদাহরণস্বরূপ আমাদের বাংলা ভাষায় চাচা, খালু, ফুফা এই সম্পর্ক গুলোর আলাদা আলাদা অর্থ আছে। ইংরেজি ভাষায় এই সবগুলো সম্পর্ককে একটি শব্দে বোঝানো হয়েছে। আমরা ফুফা বলতে যা বুঝি চাচা বলতে তা বুঝি না, চাচাতো ভাই বলতে যা বুঝি খালাতো ভাই বলতে তা বুঝি না, চাচি বলতে যা বুঝি খালা বলতে তা বুঝি না। আমাদের প্রত্যেকটি সম্পর্ক আলাদা। কিন্তু ইংরেজিতে আমাদের এই সম্পর্কগুলোকে অনুবাদ করতে পারেনি। আমাদের সন্তানরা আর চাচা মামা খালু ফুফার মধ্যে পার্থক্য বুঝবেনা, শালী ও ভাবির মধ্যে পার্থক্য বুঝবে না। তারা বাজারে কাঁঠাল দেখবে কিন্তু কাঁঠাল গাছ চিনবেনা। পৃথিবীর আর কোন জাতি তার নিজেদের ভাষাকে এভাবে অবহেলা করে তার নজির নাই। আমরা যদি ইউরোপের স্ক্যান্ডেনেভিয়ানদের, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, ইতালি ও এশিয়ার চীন, জাপান, কোরিয়া, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এই দেশগুলোতে তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এই দেশগুলোর শহরগুলোতে ইংরেজি মিডিয়াম অনেক স্কুল আছে। আন্তর্জাতিক শহরের পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বসবাস করে তাই তারা এই ধরনের স্কুলের ব্যবস্থা করেছে কিন্তু তাদের নিজস্ব নাগরিকদের জন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোর প্রতি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আমাদের ইংরেজি ভার্সনের মত হাইব্রিড স্কুল পৃথিবীর অন্য কোন দেশে আছে বলে আমার জানা নাই।

ভাষা আন্দোলনের মাসে মাতৃভাষার প্রতি আমাদের অতিরিক্ত দরদ পরিলক্ষিত হয়। সভা সেমিনার বক্তৃতায় আমরা অনেক মুখরোচক কথা বলে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার কথা বলি। মহামান্য হাইকোর্ট থেকে শুরু করে সরকারি সকল অফিসে বাংলা চর্চার কথা বলি কিন্তু উচ্চ আদালতে ইংরেজিতে রায় লিখা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিসে ইংরেজি চর্চা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আমরা যদি ইংরেজির প্রতি এতটাই দুর্বলতা থাকে, পশ্চিমাদের প্রতি যদি আমাদের এতই ভালোবাসা থাকে, পশ্চিমা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি যদি আমাদের এতই দরদ থাকে তাহলে এত সংগ্রাম করে ব্রিটিশদেরকে তাড়িয়েছিলাম কেন? কেন পাকিস্তানিদের ও তাদের দালালদের বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলাম? আমরা কী আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি? না। আমাদের মাতৃভাষাই আজকে আমাদের কাছে অনিরাপদ। আসুন পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, অফিস-আদালতে, সরকারি ও বেসরকারি ভাবে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়াই। বাংলা ভাষাকে রক্ষা করি। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করি। ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত উপনিবেশ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করি। সেজন্য প্রয়োজন হলো আরও একটি ভাষা আন্দোলন। এই ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানিদের মত অন্য কোন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, এই ভাষা আন্দোলন হবে আমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে। বাংলা ভাষা রক্ষা ও চর্চায় জাতীয় আন্দোলন এখন সময়ের দাবি।

ড. মো: কামাল উদ্দিন অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়

The Post Viewed By: 184 People

সম্পর্কিত পোস্ট