চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

বুখারায় নক্শবন্দ বাহাউদ্দিন (রহ.)’র যেয়ারত

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ১:৩২ পূর্বাহ্ণ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুখারায় নক্শবন্দ বাহাউদ্দিন (রহ.)’র যেয়ারত

কালান্তরে দৃষ্টিপাত

রাজধানী তাশখন্দ থেকে প্রায় ৬০০ কি. মি দূরত্বে বিশে^র আলোচিত পরিচিত মহানগরী বুখারা। এখানে শায়িত নক্শবন্দিয়া তরিকার ইমাম হযরত বাহাউদ্দিন (রহ.)’র যেয়ারতে পর পর তিনবার যাওয়ার সুযোগ হয়। ৩০ অক্টোবর বুধবার দিবাগত মধ্যরাতের পর প্রায় আড়াই ঘণ্টার যাত্রায় দিল্লি থেকে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে পৌঁছি বাংলাদেশ ভারত মিলে প্রায় শতের কাছাকাছি যেয়ারতকারী। ট্যুর অপারেটর প্রতিনিধি চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারের মাধ্যমে আমাদের দেশের যেয়ারতকারীগণকে সংগ্রহ করে। তাশখন্দ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর পার হলে ট্যুর অপারেটরের সমন্বয়ক মালয়েশিয়ার বয়স্ক ব্যক্তি সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে ঘোষণা দিলেন আমাদেরকে তাশখন্দ থেকে বুখারা অভ্যন্তরীণ বিমানে নেওয়ার সময়সূচী দেওয়া ছিল। কিন্তু তা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন সকাল ৭টা ও ৯টার দুই ট্রেনে আমাদেরকে বুখারা নিয়ে যাবে। ৭টার ট্রেনের যাত্রী আমরা বাসে উঠে গেলাম। প্রায় ৮/১০ কি.মি দূরত্বে আমরা তাশখন্দ ট্রেন স্টেশনে পৌঁছলাম। ট্রেন স্টেশনে ওয়াইটিং রুমটা (ডধরঃরহম ৎড়ড়স) বিলাসবহুল। এখানে কনকনে ঠা-া। শেষ রাতে শীতের প্রকোপটা আরও বেশি। যে যেভাবে পারে সকলে ওযু করে ফজরের নামাজ পড়ে নেয়।
দিল্লিতে যথাযথ বিশ্রাম না হওয়ায় এবং সারারাত নির্ঘুমে আমি কাহিল হয়ে পড়ি। মন চাচ্ছে বিশ্রাম নিতে। কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না। ট্রেন নতুন আধুনিক চকচকে তকতকে। আয়োজক সকালের নাস্তার জন্য আমাদেরকে ২টি প্যাকেট দিল। যা মানে সন্তোষজনক এবং রুচিসম্মত। এ ট্রেন বাংলাদেশ ত নয়ই ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে এগিয়ে থাকবে বলতে পারি। তবে চায়নার সাথে তুলনায় আসবে না। ট্রেনের পক্ষ থেকেও চা কফি সমেত নাস্তা দিল। প্রায় ৪ ঘণ্টার যাত্রায় আমরা দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে বুখারা ট্রেন স্টেশনে পৌঁছলাম। এ চার ঘণ্টা কিভাবে পার করলাম তা স্মরণে নেই। ঘুমে ক্লান্ত শরীরে ট্রেন আমাকে টেনে নিয়ে যায়। ট্রেন স্টেশন থেকে আয়োজকের বাসে করে হোটেলে যাই। চার তারকামান স্থলে এ হোটেলটি তিন তারকামানের হলেও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য। দুই সিটের দুই গেস্ট করে এক কক্ষ। কাহিল শরীর নিয়ে কোন মতে যোহরের নামাজ পড়ে নিচে চলে আসি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে। যেহেতু খাবার খেয়ে বিশ্রামে যাব। নিচতলায় হোটেল রিসেপশনে এসে জানতে পারলাম আমাদের দুপুরে ও রাতের খাবার বাহিরে অন্যত্র রেস্টুরেন্টে। তখন এখনে মালয়েশিয়ার বয়স্ক সমন্বয়ক থাকায় তার কাছ থেকে জানতে চাইলাম এখানে খাবার ব্যবস্থা হল না কেন? সমন্বয়কের উত্তরটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হল না। তখন এডভোকেট মুহাম্মদ ইলিয়াসসহ সহযাত্রীগণকে বলে দিয়েছি আজকের প্রোগ্রামে যাওয়া হবে না, বিশ্রামে থাকব। কিছুক্ষণের ব্যবধানে বাহির থেকে একজন দরজা নক করলে , কে জিজ্ঞেষ করলে, তিনি গাইড বললেন। তিনি বাহির থেকে বড় কণ্ঠে জানতে চাইলেন আমি প্রোগ্রামে যাচ্ছি না কেন? তিনি হয়ত হালকাভাবে রুমের দরজা খুলে ছিলেন। উত্তর দিলাম আমি অতি ক্লান্ত যাওয়া সম্ভব না।

দীর্ঘ সময় নিয়ে বিশ্রামের পর শরীর হালকা অনুভব করতেছিলাম। বিকালের দিকে নিচে আসলাম চা নাস্তা খাওয়ার জন্য। তারা বললেন এখানে সকালের নাস্তা বাদে খাওয়ার জন্য আর কোন নাস্তা নাই। আমি অতিরিক্ত টাকা প্রদান করব বলার পরও খাবার পেলাম না। রুমে গিয়ে শুকনা খাবার ও পানি খেয়ে সময় কাটালাম। সন্ধ্যার পর হোটেল রেস্টুরেন্টে খাবার চাইলাম কিন্তু তারা সম্ভব নয় বলল। ভাগ্য ভাল প্রোগ্রামে যাওয়ার আগে সহযাত্রী নুরুল ইসলাম সাহেব নিকটে ব্যাংক থেকে ভাঙ্গিয়ে ৫০ ডলারের বিনিময়ে উজবেকিস্তানের সোম (টাকা) দিয়ে যান। এতে আমার উপকার হয়। রাত ১০টার পর প্রোগ্রাম থেকে ফিরে আসলে জানতে পারলাম তারা সকলে নক্শবন্দ তরিকার ইমাম হযরত খাজা নক্শবন্দ বাহাউদ্দিন (রহ.)’র যেয়ারতেও গিয়েছিলেন। এতে হোটেল রিসেপশনের মাধ্যমে ২০ ডলারের বিনিময়ে হযরত নক্শবন্দ বাহাউদ্দিন (রহ.)’র যেয়ারতের জন্য একটি টেক্সী ঠিক করি। বুখারায় প্রায় ৭টায় সূর্য উদয়।
টেক্সীকে ঐ সময় আসতে বলি। ভোরে রুম থেকে বের হওয়াকালীন সহযাত্রী এডভোকেট মুহাম্মদ ইলিয়াস পুনঃ যেতে বের হয়ে আসলেন। আমাদের হোটেল থেকে প্রায় ১০/১৫ কি.মি দূরত্বে। আমরা ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। টেক্সী থেকে বের হতেই কনকনে ঠা-া। যদিওবা শরীরে গরম পাঞ্জাবী, সুয়েটার, কোট মাথায় মাফলার পায়ে জুতা মৌজা। হেঁটে হেঁটে হযরত বাহাউদ্দিন (রহ)’র মূল কবরে পৌঁছলে কবরের পশ্চিম তথা কেবলার দিকে বড় বড় কার্পেট বিছানার মধ্য ৪০/৫০ জন তুর্কি যেয়ারতকারী মুরাকাবায় বসে আছেন। আমিও তরিকতের নিয়মে ফাতিহা শরীফ পড়ে ওখানে বসে পড়লাম।

কিছুক্ষণের ব্যবধানে তাদের সাথে মোনাজাতে শরীক হলাম। অতঃপর কুলাকুলি ও পরিচিতি। তারা ইংরেজি জানে না বললেই চলে। উজবেকিস্তানের গাইডের মাধ্যমে আলাপে জানলাম তারাও নকশবন্দিয়া তরিকার। ৩ রবিউল আউয়াল ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে সপ্তাহখানেকের জন্য পৃথকভাবে তুরস্ক থেকে যেয়ারতে এসেছেন। সংখ্যায় ৭৩জন। তৎমধ্যে ১০/১৫ জন মহিলাও আছে। অতঃপর মাজার কমপ্লেক্স ঘুরে ফিরে দেখতে থাকি। কম করে হলেও ৩০/৪০ একর বা তারও বেশি এরিয়া নিয়ে বিশাল মাজার কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে তিনটি মসজিদ। তৎমধ্যে একটি জুমা, একটি সাধারণ ও একটি মহিলাগণের জন্য। যেয়ারতের জন্য কিছুটা দূরত্বে বসার ব্যবস্থা রয়েছে। উজবেকিস্তানে টুলে চেয়ারে বসে যেয়ারত করা হয়। হয়ত ফ্লোরে বসে থাকতে তারা তেমন অভ্যস্ত নয়। আয়োজকের দেয়া প্রোগ্রাম সময়সূচী মতে আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় রওনা। কাজেই হোটেলে পৌঁছে চা নাস্তা করতে চাই। দ্রুততার সাথে ঠান্ডার মধ্যে সবদিকে হাঁটতে থাকি। প্রায় ৫/৬ শত মিটার দূরত্বে হযরত নক্শবন্দী (রহ)’র আম্মাজানেরও যেয়ারত করতে যাই। সবকিছু প্রায় ৪০/৫০ মিনিটের মধ্যে শেষ করে হোটেলে ফিরে আসি। পরদিন শনিবারের জন্য ২০ ডলারের ঐ টেক্সী আবারও বুকিং দিই। গতকাল শুক্রবারের অভিজ্ঞতায় বুঝে আসল আয়োজকের পক্ষে টাইম রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় ১৮৫ জন যেয়ারতকারীর তার অতিরিক্ত আয়োজকের স্টাফ গাইড মিলে প্রায় ২০০ জন। কাজেই আজ একই টাইমে ভোর ৭টার মধ্যে রওনা দিলাম। ড্রাইভার আন্তরিক উদার। আজ সহযাত্রী হলেন আলহাজ¦ নুরুল ইসলাম, আলহাজ¦ মুহাম্মদ শরীফ ও ডা. আবু বক্কর ছিদ্দিক। আজকেও প্রায় ঘণ্টার কাছাকাছি যেয়ারতে সময় দিলাম। হোটেলে গিয়ে চা নাস্তা করে সকলের সাথে বেরিয়ে পড়লাম।

আমাদের বড় সৌভাগ্য যে, আজ যোহরের নামাজের জন্য আমাদেরকে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.)’র মাজার কমপ্লেক্স নিয়ে আসে। আমাদের বাসের গাইড ঘোষণা দিলেন সময় ১ ঘণ্টা। ১ ঘণ্টা মানে দেড় ঘণ্টা বা তারও বেশি। ফলে এখানে যোহরের নামাজের পর পর মোরাকাবায় বসলাম। মন ভরে হাঁটাহাঁটি করে এদিক ওদিক দেখতে থাকি। এখানে হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ.)’র মিউজিয়াম রয়েছে। এ প্রায় বড় বড় ইমামদের মাজার কমপ্লেক্সে এ রকম মিউজিয়াম দেখতে পেয়েছিলাম। এখানেও সময় নিয়ে আস্তে আস্তে মিউজিয়াম দেখতে থাকি। মিউজিয়ামে তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে রয়েছে কমপ্লেক্সের পশ্চিমপাশের্^ বিশাল কবরস্থান। হযরত খাজা বাহাউদ্দিন (রহ)’র কবরটি খোলা জায়গায়। প্রায় ৮/১২ ফুট চতুর্দিকে, সম্মুখ দিকে খোলা রেখে পিলারের দিকে স্থাপনা।
এখানে শীতকালে শীত বেশি, হালকা বরফ পড়ে। গরমকালে প্রচন্ড গরম। ফলে যেয়ারতকারীগণ কিছুটা দূরত্বে ছাউনির মধ্যে টুলে চেয়ারে বসে যেয়ারত করার জন্য হয়ত এ ব্যবস্থা। তাঁর মূল কবরটি ৭/৮ ফুট দামী পাথর দিয়ে ঘেরা দেয়া।
৩০/৪০ একরের বিশাল কমপ্লেক্সটি সুন্দর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাব গম্ভীর পরিবেশ। এখানে বুখারায় তিন রাত অবস্থানকালে পর পর তিন বার যেয়ারত আসতে পেরে নিজেকে নিজে সৌভাগ্যবান মনে করছি।

The Post Viewed By: 94 People

সম্পর্কিত পোস্ট