চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০২ অক্টোবর, ২০২০

সর্বশেষ:

বাঙালি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ২:২৩ পূর্বাহ্ণ

মনোয়ার হোসেন রতন

বাঙালি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন

দিল্লীর ভাইসরয়ের অফিস অবিভক্ত ভারতের বিশাল ম্যাপ ছড়ানো। এরি মধ্যে লন্ডন থেকে ড্রাফটম্যান র‌্যাডক্লিফ এসে পৌঁছালেন। তার উপর দায়িত্ব পড়ল ভারতকে দুই ভাগে ভাগ করার। একভাগে হিন্দু অন্যভাগে মুসলমান। র‌্যাডক্লিফ চিন্তা করলেন কোথায় হিন্দু বেশী আর কোথায় মুসলমান। তারপর পেন্সিল দিয়ে দাগ কেটে কেটে তিনি ভাগ করলেন ভারতকে। এভাবেই ১৯৪৭ সালের ১৪ এবং ১৫ আগস্ট পাকিস্তান এবং ভারত রাষ্ট্রের জন্ম। এখানে উল্লেখ্য, র‌্যাডক্লিফ ইতিপূর্বে কখনোই ভারতে আসেননি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যাত্রা শুরু হলো পাকিস্তান রাষ্ট্রের।

সৃষ্টির পর শুরু হয় দ্বন্দ্ব আর বৈষম্য। পাকিস্তানী শাসন ছিল বৈষম্যমূলক। সমগ্র জাতির শিল্প ও সম্পদের ৬০ ভাগের বেশী পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির বাইশ পরিবারের কর্তৃত্বাধিন ছিল। ব্যাংক, বীমা, শিল্পের ৮০ ভাগের মালিক ছিল পশ্চিম অংশের পাকিস্তানীদের হাতে। বৈদেশিক সাহায্যের শতকরা ৮০ ভাগই ব্যয় করা হত পশ্চিমপাকিস্তানীদের উন্নয়নের জন্য। এমন বিমাতাসুলভ আচরণে পূর্বপাকিস্তানীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রচন্ড ক্ষোভে ক্ষুব্ধ যখন জনগণ ঠিক সেই সময় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেন, “ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। এখানে মজার বিষয় হচ্ছে তাঁর জীবনে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন শুধু একবারই। তখন হতেই আন্দোলন দানা বাঁধে। ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

মায়ের ভাষা বাংলাকে যখন কেড়ে নিতে চায় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী তখনই শুরু হয় আন্দোলন সংগ্রাম। কবি, সাহিত্যিক, লেখক, রাজনীতি সচেতন জনগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, ছাত্রসমাজ, অর্থাৎ সর্বস্তরের জনগণের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হয়ে উঠে। গর্জে উঠে লড়াকু বাঙ্গালী। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অন্যায় ঘোষণায় ছাত্র-জনতা “না-না” ধ্বনিতে প্রতিবাদে, প্রতিরোধে মুখর হয়ে উঠে।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষার দাবীতে সভা, শোভাযাত্রা, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এমন সময় ১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ঢাকার পল্টন ময়দানে এসে এক বিশাল জনসভায় ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা একটিই হতে হবে এবং তা হবে ঊর্দু”। ছাত্রসমাজ এ অন্যায় ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানায়-রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, আরবী হরফ চলবে না, নাজিম উদ্দিন গদি ছাড়, ইত্যাদি মারমুখী শ্লোগানে, মিছিলে ভাষা আন্দোলনের নতুন পর্বের সূচনা হয়। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার দাবী তুলে ধরার কর্মসুচী গ্রহণ করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি বিকাল থেকেই ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারী করে সভা, সমাবেশ, মিছিল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করা হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ও ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টা থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের চেষ্টা করেন। বাঙালী শুধু কাঁদতে জানে না, মরতেও জানে, জানে প্রতিবাদী হতে। অবশেষে পুলিশ-জনতা সংঘর্ষ শুরু হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায় ঘটনাস্থলে, নিহত হয় রফিক উদ্দিন আহম্মদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, ১১ বছর বয়সী আক্তারুজ্জামান সহ নাম না জানা অনেকেই শহীদ হন। পরদিন শোক মিছিলে শহীদ হন শফিউর রহমান।
আমাদের বর্ণ, আমাদের ধ্বনি, আমাদের সুর, আমাদের স্পন্দন রক্তচোষা বাদুরের দল যখন কেড়ে নিতে চাইল, তখনি বাংলার দামাল ছেলের দল বিশ্বস্পন্দনের সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠিত করেছে বাংলা ভাষা, মায়ের ভাষা। পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার মাতৃভাষা আছে। একমাত্র মাতৃভাষা বাংলার জন্যই সংগ্রাম করতে হয়েছে, প্রাণের তাজা রক্ত দিতে হয়েছে রাজপথে। রক্তাক্ত করুণ স্মৃতি বিজরিত গৌরবদীপ্ত আবেগময় ভাষা আন্দোলন অমর একুশে বা শহীদ দিবস একদিন শুধু আমাদেরই ছিল। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করা হয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।

বিশ্বস্পন্দনের কম্পন জাগিয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা আমাদের ভাষা বাংলাকে বিশ্বের সকল মানুষের ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। ২০০২ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাকে আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরা লিওন সরকার সে দেশের দ্বিতীয় সরকারী ভাষা ঘোষণা করেছেন। বর্ণমালার মালা গেঁথে বুকের মাঝে রাখি, ভালোবাসার রং তুলিতে হাজার ছবি আঁকি। শোষণের কালো মেঘ ছিন্ন করে সত্যের সুর্যকে একদিন আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলাম। প্রাণের মালা বর্ণমালা রক্ত দিয়ে কেনা, তাকে ভালবেসেই কেবল শুধতে হবে দেনা।
আজ আমাদেরকে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সাথে স্মরণ করতে হবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে যিনি বাংলা ভাষাকে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করার মধ্য দিয়ে। বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিমচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, গিরিশ, অতুল প্রসাদ, রজনীকান্ত, নজরুল হয়ে উঠেছিলেন বাঙালীর অহংকার।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী বাঙালীর গৌরব শ্রীচৈতণ্য দেব এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভুতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এদের অবদান স্র

ণীয়। একদিন বাঙালীকে গৌরবদ্বীপ্ত করেছিল গৌরবগাঁথা রচনা করে তিতুমীর, ফকির মজনুশাহ, সুর্য্য সেন, ক্ষুদিরাম। বাংলার কৃষককে ঋণের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। সাধারণ মানুষের নয়নমনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের নেতা মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সহ স্মরণ করতে হয় মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম থেকে শুরু করে এযুগের মনিষী ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রস্তাবক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে। বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় অকুতোভয়ে বাংলা ভাষার গৌরবের কথা, যিনি ১৯৭৪ সালে জাতি সংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় প্রথম ভাষণ দিয়ে সদ্য স্বাধীন বাঙালী জাতির রাষ্ট্রভাষাকে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপনকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
স্মরণ করতে হয় কানাডা প্রবাসী বিশ্ব মাতৃভাষা প্রেমিক গ্রুপের সদস্যদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অবদানকে। আজ থেকে প্রায় বারশত পঞ্চাশ বছর আগের এই বাংলা ভাষা চর্যাপদের কবি কানুপা, শবরীপাদের নানা পদ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাংলা ভাষা। বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আমাদের দায়িত্বকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমাদের জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত জীবনে বাংলার প্রয়োগ সমুন্নত করতে পারলেই বাংলাভাষা এবং বাঙ্গালীদের সত্যিকারের গৌরব রচিত হবে। তবেই আমরা বলতে পারব “আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রুপে বাহির হলে জননী”।
আজকের এ দিনে মনে রাখতে হবে ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের আন্দোলনকে বেগবান করেছিল। এরই প্রমাণ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারীর ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পরিশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনই আমাদেরকে চিরস্থায়ী বিজয়ের দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 232 People

সম্পর্কিত পোস্ট