চট্টগ্রাম রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

জ্ঞানের দেবী সরস্বতী বন্দনা ও প্রাসঙ্গিক চেতনা

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ | ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ

তাপস কুমার নন্দী

জ্ঞানের দেবী সরস্বতী বন্দনা ও প্রাসঙ্গিক চেতনা

বিদ্যার দেবী সরস্বতী শত বছর ধরে বিভিন্ন মত ও পথের জনগণের কাছে পূজিতা হয়ে আসছেন। তিনি মেধা, প্রতিভা, স্মৃতি, জ্ঞান ও বিচাররূপে সকলের আরাধ্য। আঠারো বিদ্যা, ছয় রাগ, ছত্রিশ রাগিনী, স্বপ্তস্বর, তিনগ্রাম ও একুশ মুর্ছনারূপে নিখিল চারু ও কারুকলার মহাদেবী-বেদমাতা, বাগদেবী। অগ্নিরশ্মি সূর্য তেজ আর সরস্বতীর হিরন্ময় দ্যুতি মিলে রচিত হয়েছে সর্বশুক্লা বাকদেবীর জ্যোর্তিময়ী মূর্তি। কালের প্রবাহে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে সরস্বতী পূজা হয়ে থাকে এবং বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীরা বার্ষিক লেখাপড়ার আরম্ভকাল বলে এ সময়ে বিদ্যাদেবীর আরাধনা করে বিদ্যা অর্জনের সাধনায় ব্রতী হয়।

সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার সহধর্মিনী এবং বিষ্ণুপতœী লক্ষ্মী ও মহেশ^রজায়া পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে পরিচিত দেবী সরস্বতী। পুরান অনুযায়ী দেবী সরস্বতী ব্রহ্মের মুখ থেকে উত্থান। দেবীর সকল সৌন্দর্য্য ও দীপ্তির উৎস। পঞ্চ মস্তকধারী দেবী ব্রহ্মা এক স্বকীয় নির্দশন। পূজার জন্য দেবী সরস্বতীর মূর্তি শে^ত বস্ত্র পরিধান করে থাকে যা পবিত্রতার নিদর্শন বলে পরিচিত। বিশ^ভুবন প্রকাশ সরস্বতীর জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকারযায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বতর তখন জ¦লতে থাকে জ্ঞানের পূণ্য জ্যোতি। এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্বগুণময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ^রের বাকশক্তির প্রতীক বাগদেবী। গতিময় জ্ঞানের জন্যই ঋগে¦বেদে তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে কর্মের দ্বারা মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছে। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতো ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী পুস্তক হস্তে গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তার সঙ্গে। মার্ক-েয় পুরাণে শ্রী শ্রী চ-ী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে মূর্তির কল্পনা করা হয়েছিল তা মহা সরস্বতী।
বায়ু পুরাণ অনুযায়ী কল্পান্তে সমুদয় জগৎ রুদ্র কর্তৃক সংহৃত পুনর্বার প্রজা সৃষ্টির জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজ অন্তর থেকেই দেবী সরস্বতীকে সৃষ্টি করেন। সরস্বতীকে আশ্রয় করেই ব্রহ্মার প্রজ্ঞা সৃষ্টি সূচনা। গরুড় পুরাণে সরস্বতী অষ্টবিধা। ধ্যান বা স্ত্রোত্র বন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভুজা অথবা মরাল বাহন অথবা ময়ূরবাহন। ইনি অক্ষমালা, কম-লু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিনী। রাজহংস সরস্বতীর বাহন, কেননা জলে, স্থলে,অন্তরীক্ষে সর্বত্রই হাঁসের সমান গতি, যেমন জ্ঞানময় পরমাত্মা সর্বব্যাপী Ñ স্থলে, অনলে,অনিলে সর্বত্র প্রকাশ। হংস জল ও দুধের পার্থক্য করতে সক্ষম। জল ও দুগ্ধ মিশ্রিত থাকলে হাঁস শুধু সারবস্তু দুগ্ধ বা ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে, জল পড়ে থাকে। জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও হংসের এ স্বভাব তাৎপর্য বহন করে। শে^তাস্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদন ছিল। জৈনদের চব্বিশজন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলোজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতমা হলেন সরস্বতী। শে^তাম্বর ও দিগম্বর উভয় জৈন সম্প্রদায়েই সরস্বতী গেল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীতা একজন প্রধান দেবীরূপে। সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ Ñ একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস+বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। আবার সৃ ধাতু নিষ্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্ররা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে পূজা করত। ইংরেজি ম্লেচ্ছ ভাষা হওয়ায় সরস্বতী পূজার দিন ইংরেজি বইয়ের পূজা নিষিদ্ধ ছিল। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচালন হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু প-িতের মতে সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে ধর্মের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা। শাস্ত্র অনুসারে শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও মা বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল।
লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পুজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী, মস্যাধার, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করা হয়। পূজার শেষে পুষ্পাঞ্জলি সকালে ফের পূজার পর দধিকর্মা নিবেদন করে পূজা সমাপ্ত হয়।

কবি-সাহিত্যিকরা বিদ্যাদেবীকে নানাভাবে মূল্যায়ন করেছেন। গ্রীক কবি হোমার ‘ইলিয়াড’ কবিতায় দেবীর করুণা প্রার্থনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের কবিরা বাকদেবী ‘সরস্বতী’র বর প্রার্থনা করেছেন কাব্যারম্ভে। আধুনিক কালের কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাকদেবীকে ‘অমৃতভাষিনী মধুকরী’ হিসেবে আহ্বান করেছেন। দেবী ‘সরস্বতী’ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে প্রকাশ পেয়েছেণ। কখনো দেবী ‘সরস্বতী’ যজ্ঞরূপা, কখনো সর্যকিরণময়ী, কখনো অন্নদাত্রী সরস্বতী, কখনো দানব দলনী এবং সর্বশেষ দেখা যায় সরস্বতী দেবীর প্রকাশ ঘটেছে বাগদেবী হিসেবে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী মূলত বৈদিক দেবী। বেদে কিন্তু সরস্বতী প্রধানত নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
এছাড়া দেবী সরস্বতীর যে বাহন ‘হংস’ তার মধ্যেও সাধনার স্বরূপ নির্দেশ রয়েছে। ‘হংস’ জলমিশ্রিত দুধ থেকে দুধ গ্রহণ করতে পারে। আবার স্থলে-স্থলে-অন্তরীক্ষেও ‘হংস’ বিচরণ করতে পারে। ‘হংস’ জলে বিহার করলেও তার গায়ে জল লেগে থাকে না। দেবী সরস্বতীর বাহন হংসের এই গুণাবলীর মধ্যে দিয়ে সাধক জ্ঞানময় পরমাত্মার স্বরূপ এবং সাধন পথের ইঙ্গিত পেয়ে ধন্য হন। বাংলাদেশ ও ভারতে দেবী সরস্বতী বিদ্যা ও ললিতকলার দেবী হিসেবে পূজিত হচ্ছেন।
কিন্তু দেশের বাইরেও দেবী সরস্বতীর পূজা হয়ে থাকে। যবদ্বীপে পদ্মাসনে বসা সাত তারের বীণা হাতে সরস্বতী দেবীর মূর্তি, তিব্বতে বজ্রধারিনী ময়ূর নিয়ে বজ্র ‘সরস্বতী দেবী ও বীনাপানি দেবী সরস্বতী, জাপানে বেদতেন নামধারিনী সর্পাসনা দ্বিভূজা সরস্বতী, অষ্টভূজা হস্তিবেন সরস্বতী দেবী, চীন দেশে শস্য দেবীর সঙ্গে তুলনা করে দেবী সরস্বতী। কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যে মাতৃকা দেবীর সঙ্গে তুলনা করে সরস্বতী দেবীর পূজা করে থাকে। আবার অনেকে গ্রীষ্মদেবীর সঙ্গে তুলনা করে সরস্বতী দেবীর পূজা করে। রোমীয়দেবী মিনার্ভার সঙ্গেও সরস্বতী দেবীর মিল রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। পুরানতত্ত্বের বর্ণনায় যদিও সরস্বতী দেবীর হাতে বীণা কম দেখা যায়, আধুনিক যুগে কিন্তু বীণা সরস্বতী দেবীর সঙ্গে অপরিহার্য। বীণা অবশ্যই সঙ্গীত ও অন্যান্য কলাবিদ্যার প্রতীক। জপমালা আধ্যাত্মবিদ্যার প্রতীক। শুকপাখি বা বিদ্যা বা বাক্যের প্রতীক হিসেবেই সরস্বতী দেবীর হাতে শোভা পায়। সর্বক্ষেত্রে দেবীকে প্রতিভা, বিধ্যা, বুদ্ধি, স্মৃতি, জ্ঞান, শক্তিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

সরস্বতী পূজা মাতৃকাশক্তির আরাধনা। জ্ঞানের বিকাশ সাধনই সরস্বতী পূজার লক্ষ্য। শক্তির জাগরণ ও ভক্তির ভাবের এক অপূর্ব সমন্বয় এই দেবী সরস্বতী পূজায় আমরা লক্ষ্য করি। সরস্বতী পূজা এক আধ্যাত্ম সাধনা এবং এর মধ্যে দিয়ে আমাদের জ্ঞানের বিচিত্রমুখী প্রকাশ ঘটে। জ্ঞানপ্রদীপ জ¦ালিয়ে পূজা করলেই সার্থক হবে দেবী সরস্বতীর পূজা ও বন্দনা। বাণী অর্চনা হোক ভাবসমৃদ্ধ বাণী সৈনিক সৃষ্টির পুতঃ উৎসব, বিশ^ব্যাপী ঘটুক জ্ঞানসেনানীর অভ্যুত্থান।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 316 People

সম্পর্কিত পোস্ট