চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বাণী অর্চনার তাৎপর্য

৩০ জানুয়ারি, ২০২০ | ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ

যাদব চন্দ্র্র দাস

বাণী অর্চনার তাৎপর্য

শুভ্রবসনা, ভুবনমোহিনী, বিদ্যাদায়িনী মা সরস্বতী হচ্ছেন ঈশ্বরের জ্ঞানশক্তির প্রকাশ। অর্থাৎ, তিনি হচ্ছেন বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের (প্রতি পক্ষে ১৫ দিন, কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষে এক মাস গণনা করা হয়) শ্রী পঞ্চমী তিথিতে দেবী সরস্বতীর পূজা করা হয়। কিন্তু কেন মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের এই তিথিতে দেবীর পূজা করা হয়? দেবীর হাতে বীণা, পুস্তক থাকার তাৎপর্য কী? তার উত্তর এবং দেবীর স্বরূপ সম্বন্ধে লেখার প্রয়াস করছি।

হিন্দুধর্মীয় বিধানে, প্রতিটি পুণ্য ও সৎকাজকে শুক্লপক্ষে করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরস্বতী পূজা সনাতন ধর্মের পবিত্র উৎসব বিধায় উত্তরায়ণের শুক্লা শ্রীপঞ্চমী তিথিতে করা হয়। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে করার কারণ হল-শ্রী শব্দটি শ+র+ঈ যুক্ত হয়ে গঠিত। ‘শ’ বর্ণটি শ্বাসায়ু, ‘র’ বর্ণটি বহ্নিবীজ এবং ‘ঈ’ বর্ণটি প্রাণশক্তি জ্ঞাপক। আর পঞ্চমী তিথি পঞ্চম বিশুদ্ধ পদ্মচক্র নির্দেশক। সাধকদের মতে দেহে ছয়টি পদ্ম আছে। বিশুদ্ধ পদ্মে আরোহণ করলে সারস্বত জ্ঞান লাভ হয়। সরস্বতীকে পদ্মাসীনা দেখিয়ে দেহস্থ ক্রমোর্ধ্ব পদ্মে প্রাণবায়ুকে উত্তোলন করার কৌশল নির্দেশ করা হয়েছে। বিশুদ্ধ চক্রপদ্ম পঞ্চম। এই পঞ্চম স্থানে প্রাণবায়ুকে স্থিত করলে সাধক সাধনায় ‘শ্রী অবস্থা’ প্রাপ্ত হন; সাধক হয়ে যান বাকসিদ্ধ।

শাস্ত্রে বিভিন্ন রূপে সরস্বতী দেবীর পূজার কথা বলা আছে। হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে নদীরূপে, যজ্ঞ কর্মাদিতে প্রজ্ঞাদাত্রীরূপে, ব্রহ্ম বৈবর্ত পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ কণ্ঠোৎভবা বাগাধিষ্ঠাত্রীরূপে, শ্রীহরির ভাষারূপে, মৎসপুরাণে নৃত্য-গীতাদির সিদ্ধিদাত্রীরূপে সরস্বতী’র কথা বর্ণিত আছে। বেদান্ত শ্রুতিতে ‘জ্ঞানমোক্ষদা’ বলে ব্রহ্মা তাঁর স্তুতি করেছেন। দেবর্ষি নারদ তাঁকে বলেছেনÑ জগন্ময়ী, ব্রহ্মময়ী কিংবা কোটিন্দুমুখী। ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, জ্যোতিরূপা সনাতনী পরমা ব্রহ্মস্বরূপা।
সরস্বতী দেবীর স্বরূপ সর্ম্পকে সরস্বতী স্তোত্রে বর্ণিত আছে- ‘শ্বেত পদ্মাসনা দেবী শ্বেত পুস্পোশোভিতা/শ্বেতাম্বর ধরা নিত্যম্ শ্বেত গন্ধানু লেপনা/মানসে রমতাং নিত্যং হংসেব হংস বাহিনী/বাচং দদাতি বিপুলাং যা চ দেবী সরস্বতী।’ সরস্বতী শ্বেতপদ্মের উপর উপবিষ্টা। তিনি শুভ্রবর্ণা, তাঁর এই শুভ্রবর্ণ শুচিতা, শুভ্রতা, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক; যা আমাদের মনকে শুচি, শুভ্র ও শুদ্ধ রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। কারণ, মন শুদ্ধি না হলে চিত্ত শুদ্ধি হয় না, আর চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞান লাভ করা যায় না। শ্রীমদ্ভাগবত গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে অর্জুন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন, ‘চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্ / তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।’ অর্থাৎÑ অর্জুন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘হে কৃষ্ণ, মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয়াদির বিক্ষেপ উৎপাদক, দুর্দমনীয় এবং অত্যন্ত বলবান, তাই তাকে নিগ্রহ করা বায়ুকে বশীভূত করার থেকেও অধিকতর কঠিন বলে আমি মনে করি।’ প্রত্যুত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্ / অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেন চ গৃহ্যতে ॥’ অর্থাৎÑ ‘হে মহাবাহো (অর্জুন), মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয় (কুন্তীপুত্র), ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।’ তাই মন যখন বশীভূত হয় তখন হৃদয়ে শুভ্রভাব ফুটে ওঠে এবং রিপুসমূহ আস্তে-আস্তে সেই শুভ্রতার মধ্যে মিশে যায়। তখন শুভ্রতা ছাড়া অন্য বর্ণ সাধকের মনকে আকৃষ্ট করে না। সরস্বতী দেবী হংসবাহনা। হংসের একটি বিচিত্রতা আছে। হংসকে দুধ ও জলের মিশ্রণ খেতে দিলে সে অনায়াসে জল রেখে সারবস্তু দুধ গ্রহণ করে। সার ও অসার মিশ্রিত এই জগৎ সংসারে মানুষ যেন সারবস্তু গ্রহণ করেÑ এই নির্দেশই হংসবাহনতায় দ্যোতিত। দেবীর হাতের পুস্তক জ্ঞান চর্চার প্রতীক।

শব্দবিজ্ঞানের ভাষায়, কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয় স্বর। আর স্বরের সম্মিলিত রূপই হল শব্দ। ঋগে¦দে বলা হয়েছে, ‘শব্দ ইত্যস্ততে ব্রহ্ম’। অর্থাৎ ‘শব্দই ব্রহ্ম’। আর ব্রহ্মকে নিয়ে যে বিজ্ঞান তা-ই শব্দবিজ্ঞান। শব্দহীন দেহ অসার, তাই দেহে যতক্ষণ শব্দ থাকে ততক্ষণ দেহে ব্রহ্ম থাকেন, ততক্ষণই জীবন আছে বলা যায়। শব্দ নিঃশেষ হলে দেহ অকেজো। অতএব, ব্রহ্মহীন বিজ্ঞানও তখন অর্থহীন। আবার যোগতত্ত্ব অনুসারে, বীণা মেরুদ-ের প্রতীক। দেবীর বীণায় তিনটি তার। সেই তার তিনটি জরা প্রকৃতিজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণকে নির্দেশ করেÑ যা দ্বারা জীব আবদ্ধ থাকে। তেমনি মেরুদ-ে রয়েছে তিনটি তার, যাদেরকে বলা হয় ঈড়া, পিঙ্গলা ও সুষ¤œা। সর্বোপরি বলা যায়Ñ সরস্বতী দেবীর পদ্মধর্মিতা, হংসধর্মিতা, বীণাধর্মিতা, জ্ঞানধর্মিতা জীবনে অনুশীলন করলে জীবন হয় সার্থক ও সুন্দর।

যাদব চন্দ্র্র দাস ব্যাংকার ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সনাতন ধর্ম পরিষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 203 People

সম্পর্কিত পোস্ট