চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২০

সর্বশেষ:

আতঙ্ক নয়, সতর্ক-সচেতনতাই কাম্য প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মহাবিস্তার

২৮ জানুয়ারি, ২০২০ | ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ

আতঙ্ক নয়, সতর্ক-সচেতনতাই কাম্য প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মহাবিস্তার

চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে সৃষ্ট প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস (২০১৯-এনসিওভি-করোনা) এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড। বিবিসি অনলাইনের সোমবারের প্রতিবেদন বলছে, চীনে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত মানুষের সংখ্যা ৮০ ছুঁয়েছে। এ ছাড়া দেশটিতে এই ভাইরাসে প্রায় ৩ হাজার মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, চীনে করোনাভাইরাসে ২ হাজার ৭৪৪ জন সংক্রমিত হয়েছে। তাদের মধ্যে তিন শতাধিক মানুষের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চীনে করোনাভাইরাসে আগের থেকে আরও বেশি মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এই ভাইরাসের বিস্তার আরও বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটির বিস্তার প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে ছড়িয়ে পড়ার পর পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ উজাড় হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ভাইরাসটি এরই মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ-আমেরিকার ১২টি দেশে পৌঁছে গেছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি থাকায় বাংলাদেশও নতুন এই ভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সংগতকারণে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। মুরগির ব্রঙ্কাইটিসের কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর বহু ধরনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ছয়টি (এখন সাতটি) মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। এটি মূলত ভাইরাসের বড় একটি গোত্র। বর্তমানে করোনাভাইরাসের যে প্রজাতির সংক্রমণ ঘটেছে, তা এর আগে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ভাইরাসের সংক্রমণে সাধারণ সর্দি-ঠা-া থেকে শুরু করে সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) পর্যন্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাইরাসটি মানুষ এবং পশু, উভয়ে ছড়াতে পারে। কোনোরকম স্পর্শ ছাড়াই মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় ভাইরাসটি। ফ্রান্সের প্যারিসের ইন্সটিটিউট প্যাস্তয়োয়ের রোগতত্ত্ব বিভাগের প্রধান আর্নদ ফন্তানেত বলেন, সার্স ভাইরাসের সঙ্গে বর্তমান ভাইরাসটির চরিত্রের ৮০ শতাংশ মিল রয়েছে। তবে সার্সের মতো আগ্রাসী নয় এ ভাইরাস। প্রসঙ্গত, ২০০২ খ্রিস্টাব্দে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও এক ধরনের করোনা ভাইরাস। সে সময় ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ। এরপর ২০১২ খ্রিস্টাব্দে আসে মার্স (মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) করোনা ভাইরাস, যে রোগে আক্রান্ত ২৪৯৪ জনের মধ্যে ৮৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এ পরিবারের নতুন সদস্য ‘নোভেল’ করোনা ভাইরাসের মানবদেহে সংক্রমণের বিষয়টি প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ ভাইরাসটির নাম দেয় ২০১৯-এনসিওভি।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটির শুরুটা হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসকষ্ট। এটি মারাত্মক আকার ধারণ করলে রোগীর নিউমোনিয়া হতে পারে। ব্রংকাইটিসও হতে পারে এর সংক্রমণে। এছাড়া কিডনি অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা আছে। সাধারণ ফ্লুর মতই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে এ রোগের ভাইরাস। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে স্প্যানিশ ফ্লুতে ৫০ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। করোনা ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায়। কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরনো রোগীদের ক্ষেত্রে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এটি মোড় নিতে পারে নিউমোনিয়া, রেসপাইরেটরি ফেইলিউর বা কিডনি অকার্যকারিতার দিকে। পরিণতিতে ঘটতে পারে মৃত্যু। চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমণের পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে।

কিন্তু লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এ ভাইরাস ছড়াতে পারে মানুষ থেকে মানুষে। আর এ কারণেই চীনে এ রোগের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনও এ ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নজরদারিও বাড়িয়েছে। এটি আশার কথা। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। আমাদের দেশ জনবহুল। এছাড়া মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে কম, রাস্তাঘাটে থুতু-কফ ফেলে। তাছাড়া বাংলাদেশে তাপমাত্রা-বাতাসের আর্দ্রতাও ভাইরাসের বংশ বৃদ্ধির জন্য উপযোগী। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে হবে।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 142 People

সম্পর্কিত পোস্ট