চট্টগ্রাম রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ | ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ

নাওজিশ মাহমুদ

মুক্তিযুদ্ধে প্রাথমিক প্রতিরোধ

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতােেদর সাথে আলোচনা বন্ধ করে দিয়ে পাকিস্তান সামরিক শাসকেরা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশে গণহত্যা যেমন শুরু করে, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে দমিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু তাঁদের সে ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সারাদেশে প্রতিরোধ গড়ে উঠে। এই প্রতিরোধে সাড়া দিয়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আকাক্সক্ষার সাথে একাত্ম ঘোষণা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ শুরু করে। প্রাথমিক প্রতিরোধে এই বাঙালি জনতার সাথে মিলে এই বিদ্রোহী বাঙালি সৈনিকদের প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। স্বাধীনতাকামী একটি জনগোষ্ঠীকে শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা যায় না, এটা পাকিস্তানিরা হাড়ে হাড়ে টের পায়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসারদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত এবং পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে ছুটিতে আসা বাঙালি অফিসারের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াইশোর মত। যাদের সুযোগ ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। কিন্তু যুদ্ধে যোগ দেন সর্বোচ্চ ৩০ জন। অফিসারদের তুলনায় সাধারণ সৈনিকদের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী। প্রথম প্রতিরোধ বাঙালি সৈনিকদের কাছ থেকেও আসলেও এটা ছিল অপরিকল্পিত এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত।

গণআন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং স্বশস্ত্র লড়াই এক জিনিষ নয়। সশস্ত্র লড়াইয়ের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ। সে সাথে স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গিত করবে এমনি দৃঢ় সংকল্প সম্পন্ন জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতে লক্ষ লক্ষ যুবক এবং ছাত্ররা প্রস্তুত ছিল কিন্তু প্রশিক্ষণ এবং সামরিক কমান্ড ব্যাতিরেকে একটি জনগোষ্ঠী সশস্ত্র লড়াইয়ে কতটুকু অবদান রাখতে পারে তা ছিল প্রশ্ন সাপেক্ষ। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব কে দিবে তাও পূর্ব নির্ধারিত নয়। শুধু একটি হাইকমান্ড ছিল, যার সদস্য ছিলেন সৈয়দ নজরুল, খন্দকার মোশতাক, কামরুজ্জামান, মনসুর আলি এবং তাজউদ্দিন। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পাকিস্তানের বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করাার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে। র‌্যাডিকেল যুবকদের নিয়ে গঠিত হয় চার সদস্য বিশিষ্ট হাইকমান্ড। এই কমান্ডে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং তোফায়েল আহমদ। আর ছিল ভারতের সাথে পূর্ব বন্দোবস্ত। এই বন্দোবস্ত ছিল অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ।
যদি বঙ্গবন্ধুর সাথে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের সাথে সমঝোতা ব্যর্থ হলেই কেবল বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে। বাঙালি যুবক ও ছাত্রদের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সাহায্যের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন বন্দোবস্ত ছিল বলে মনে হয় না। ভারতও এতো দ্রুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে কল্পনা করে নাই। নির্বাচনে অভূতপূর্ব ফলাফল, ভুট্টোর ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা হস্তান্তর টালবাহানা এবং তার বিপরীতে বাঙালিদের পাহড়সম দৃঢ়সংকল্প, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থা, সেই সাথে পাকিস্তানের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ সবকিছু যেন নিয়তি টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণ সকলকে হকচকিয়ে দেয়। তাঁদের নিষ্ঠুরতা, নির্বিচারে গণহত্যা এবং নির্যাতন পরিস্থিতি দ্রুত আমূল পরিবর্তন করে দেয়। এই পরিবর্তনের ফলে যে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা মোকাবিলার জন্য প্রাথমিক প্রস্ততি থাকলেও যথেষ্ট ছিল না। পরিবর্তনের সাথে সবকিছুই যেন সময়ের চেয়ে দ্রুত ঘটে যেতে থাকে।

কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) ওসমানীর পরিকল্পনা মোতাবকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। কারণ সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই সেনা সদস্যদের একটি কমান্ড নিয়ে আসা ছিল একটি দুরূহ কাজ। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে বাঙালি সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তার উপর পাকিস্তান সামরিক শাসকদের সাথে রাজনৈতিক আলোচনার কারণে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্বে।
তবু ঢাকায় ছাত্র এবং স্বেচ্ছাসেবক রাজনৈতিক কর্মীরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়। ফার্মগেইট এলাকায় বিশালাকৃতি গাছের গুঁড়ি, অকেজো পুরানো গাড়ী, অচল স্টিম রোলারসহ কয়েকশত লোক রাস্তা দখল করে জয় বাংলা শ্লোাগান দিয়ে পাকিস্তানের কনভয়কে বাধা দেয়। পাকিস্তানী সেনারা গুলি করে হত্যা করে এই বাধা অপসারণ করলেও এই ব্যারিকেডের ফলে নেতৃবৃন্দ নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সময় পায়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও রাজারবাগ পুলিশ থেকেও পাকিস্তান সেনাবহিনী ব্যারিকেডের সম্মুখীন হয়।

ঢাকায় কোন শক্ত প্রতিরোধ গড়তে না পারলেও চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, জয়দেবপুরসহ অন্যান্য ক্যান্টনমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সৈনিকেরা বিদ্রোহ করে। তার মধ্যে চট্টগ্রামের বিদ্রোহ ছিল ব্যাপক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালির স্বাধীনতা প্রশ্নে চট্টগ্রাম ছিল অগ্রগণ্য। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানীর ঢাকার বাইরে থাকায় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টর সদর দপ্তর থাকায় এবং কমান্ডে বাঙালি থাকায় চট্টগ্রামের উপর পাকিস্তান সেনার নিয়ন্ত্রণ ছিল অপেক্ষকৃত শিথিল। বাঙালি পুঁজির তীর্থস্থান ছিল এই চট্টগ্রাম। পাকিস্তানের বাইশ পরিবারের একজন ছিলেন চট্টগ্রামের। বাঙালি পুঁজির আধিপত্যের কারণে চট্টগ্রামে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল অগ্রগণ্য। চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হতো, তাতে প্রাচীন কাল থেকে চট্টগ্রামের ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক সাধারণ পরিমন্ডল থেকে ভিন্নমূখী। পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক তীর্থভূমি হিসেবে চট্টগ্রাম ছিল সবার উপরে। চট্ট্রগামের বেতার, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং বাঙালি পুঁজির আধিপত্যের কারণে প্রতিরোধ যুদ্ধ ভিন্ন মাত্রা পায়। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তা সবার পূর্বে চট্টগ্রামে পাঠানো হয়েছিল। প্রতিরোধ যুদ্ধে চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

তবে এই প্রতিরোধ যুদ্ধে গুরত্বপূর্র্ণ ভূমিকা রাখে সীতাকুন্ডের কুমিরা যুদ্ধ। যা ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের সন্ধায় সংঘটিত হয়েছিল। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টর ক্যাপ্টেন সুবিদ আলি ভুইয়া। অধিকাংশ সৈনিক ছিল ইপিআরের। কেউ আসছে রামগড় থেকে কেউ হালিশহর আঞ্চলিক সদর দপ্তর থেকে। বাকিরা পালিয়ে আসা বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক। অস্ত্রের সরবরাহ ছিল সীমিত। এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ২৪ এফ এফ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল শাহপুর বখতেয়ারসহ ১৫২ জন নিহত হয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনবাহিনীর একটি ব্যাটেলিয়ন ধ্বংস হয়ে যায়। এই রেজিমেন্টের অবস্থান খুঁজতে গিয়ে টিক্কা খানকে বহনকারী হেলিকপ্টার অল্পের জন্য রক্ষা পায়। বাঙালি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য চট্টগ্রাম শহরের চট্টগ্রাম পলেটেকনিকেল ইনস্টিটিউটের ছাত্র সংসদের ভিপি আব্দুল্লাহ আল হারুন, পাহাড়তলীর ফাহিম, মনসুরসহ একদল স্বেচ্ছাসেবক খাদ্য নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিরোধ যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। কুমিরার এই প্রতিরোধ যুদ্ধ ২৮ মার্চ’৭১ পিছু হঠতে বাধ্য হয়। সারা এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই চট্টগ্রামের এই প্রতিরোধ যুদ্ধ টিকে ছিল। মে মাসের প্রথম সপ্তাহের রামগড়ের পতনের পর চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পাকিস্তানি অস্ত্র খালাস বাধা দিয়ে জনতার প্রতিরোধ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষও ঘটে। চট্টগ্রামে ইপিআর (পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল) আঞ্চলিক সদর দপ্তর বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহের ফলে ও ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা সৈনিকদের বৌদলতে চট্টগ্রাম শহর স্বাধীনতাকামীদের দখলে চলে যায়। তার সাথে যোগ হয় বেতারকর্মীদের সহযোগিতায় বেতারের মাধ্যমে স্বাধীনতা বার্তা প্রচারের। ইপিআরের ক্যাপ্টেন রফিক ২৪ মার্চ থেকে রেলওয়ে হিলের বাংলায় অবস্থান করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। ২৫ মাচ থেকে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন এবং চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। পাকিস্তানিরা চট্টগ্রাম ক্যন্টনমেন্ট এসে ২৫মার্চ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদারকে কৌশলে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে যায়। সামরিক নেতৃত্বের অভাবে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাকিস্তান সৈন্যদের দখলে চলে যায়। অতর্কিত হামালায় বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশিরভাগ সৈনিকেরা নিহত হন। শিক্ষানবিশ পনের শতাধিক সৈনিকও এই সাথে নিহত হন। পালিয়ে আসা সৈনিকদের একটি অংশ প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। সোয়াতে অস্ত্র খালাসের জন্য আগত বেঙ্গল রেজিমন্টের মেজর জিয়াউর রহমান ষোলশহরে থাকা অবস্থায় চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের সংবাদ শুনে বিদ্রোহ করেন। সেখান থেকে প্রথমে বোয়ালখালী, পরে পটিয়ায় অবস্থান করেন। আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম জেলা সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালের দুপুরে আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেন। জনগণ প্রতিরোধ যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ, আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ করে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্য হয়ে উঠে বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার কথা প্রচার। চট্টগ্রাম বেতারের বেলাল মোহাম্মদ এবং আবুল কাসেম সন্দ্বীপের উদ্যাগে চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ও ছাত্র লীগ কর্মীদের সরাসরি অংশগ্রহণের ফলে প্রতিরোধ যুদ্ধ নতুন মাত্রা যোগ করে। জনগণকে উজ্জ্বীবিত করে। চট্টগ্রাম বেতার স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও বিশ^মিডিয়া একে লুফে নয়। বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধের সংবাদ সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে।

এর মধ্যে সামরিক নেতৃত্বকে দিয়ে একটি বেতার ভাষণ প্রদানের তৎপরতাও পরিলক্ষিত হয়। এর প্রধান উৎসাহী ছিলেন জনাব মাহমুদ হোসেন, যিনি মেরারাজী দেশাইয়ের ভাইজি ভাস্করপ্রভার স্বামী। হোটলে আগ্রাবাদে থাকতেন। ফ্রান্স থেকে এসেছেন। সংগীত বিষয়ক প্রযোজক। শুনা যায় তিনি একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছিলেন। তিনি প্রথমে ক্যাপটেন রফিককে দিয়ে বেতার ভাষণের প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু ক্যাপটেন রফিক যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে বেতার ভাষণ দিতে রাজি হননি। কিন্তু মেজর জিয়াউর রহমান এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। নিরাপত্তাজনিত কারণে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আগ্রাবাদ থেকে কালুরঘাটে স্থানান্তরিত হয়। ২৭ মার্চ জিয়াউর রহমান কালুরঘাট থেকে তিনটি ভাষণ দেন। প্রথমটি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দেশবাসিকে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানান। দ্বিতীয় ভাষণে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দাবি করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের আপত্তির মুখে পুনরায় আবার বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ভাষণ দেন। এর সাথে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিপক্ষে সামরিক নেতৃত্ব দাঁড় করাবার একটি তৎপরতা সক্রিয় ছিল। মেজর জিয়াউর রহমান ও মেজর শওকত কক্সবাজারও গমন করেন। তাঁর পূর্বে মাহামুদ হোসেনকে কক্সজারে প্রেরণ করা হয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রহরায়। কিন্তু চকরিয়ার হারবাংএ মাহমুদ হোসেন রহস্যজনকভাবে নিহত হন। জনশ্রুতি আছে মাহমুদ হোসেন, মেজর জিয়াউর রহমান এবং মেজর শওকতের কক্সবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল ফিলিপাইনের অবস্থানরত মার্কিন নৌবহরের সাথে যোগাযোগ করা। কিন্তু মাহমুদের মৃত্যুর কারণে এই যোগাযোগ ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের অগোচরে এই ধরনের

তৎপরতা নিয়ে কোন তদন্ত এবং অনসন্ধানমূলক তথ্য সংগ্রহ না করার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা কেন করা হয়নি, তা ভাবতে অবাক লাগে।
কিন্তু প্রতিরোধ যুদ্ধের সময় এই তৎপরতা বন্ধ হলেও পররবর্তী পর্যায়ে জিয়াউর রহমানের ভাষণকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এক বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষক হিসেবে দাঁড় করাবার চেষ্টা করা হয়।
যতই বিতর্ক উঠুক ঐ সময় জিয়াউর রহমানের ভাষণ জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। বাঙালি সৈনেিকরা জনতার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। এই বার্তা সাড়া দেশে, সারা বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা, ছাত্র, যুবক জনতার সম্মিলিত অংগ্রহণের মধ্যদিয়ে নতুন মাত্রা পায়। চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায়। (আগামী রবিবার সমাপ্য)

নাওজিশ মাহমুদ রাজনীতি বিশ্লেষক
ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 275 People

সম্পর্কিত পোস্ট