চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২০

ওমরগণি এমইএস কলেজ প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা

২১ জানুয়ারি, ২০২০ | ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ

এস.এ.এম জাকারিয়া

ওমরগণি এমইএস কলেজ প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা

চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যতম বেসরকারি কলেজ ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ। এই কলেজটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক বিশাল ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে অবহেলিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদতা থেকে উত্তরণের জন্য ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি (এম.ই.এস)। এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সর্বপ্রথম অবদান রেখেছিলেন খান বাহাদুর আবদুল আজিজ, যিনি ছিলেন তৎকালীন অত্র অঞ্চলের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ।

খান বাহাদুর আবদুল আজিজের অনুরোধে আন্দরকিল্লা ভিক্টোরিয়া হলে মুসলিম এডুকেশন সোসাইটির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৪ সালে। নৈশ কলেজ হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। এ কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মরহুম বাদশাহ মিঞার নাম উল্লেখযোগ্য। মরহুম বাদশা মিঞার একান্ত অনুরোধে জনাব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৪ সালের ২২ ডিসেম্বর হতে ১৯৭২ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
কলেজটি তখন শুধু ইন্টারমিডিয়েট কলেজ ছিল। এই কলেজটির অবস্থান ছিল আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের পশ্চিম পাশে। কলেজে কোন নিজস্ব বিল্ডিং ছিল না, কোন আসবাব ছিল না, ছিলনা কোন অর্থ তহবিল। নৈশ বিভাগে শুধু উচ্চ মাধ্যমিক (ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক বিভাগ) চালু ছিল, যার কার্যক্রম এমইএস স্কুলের অভ্যন্তরে একটি পুরনো ভবনে চলছিল।

এক পর্যায়ে মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি তাদের স্কুল ভবনে এমইএস নৈশ কলেজের অবস্থান নিয়ে বিরোধিতা শুরু করলে এর অস্তিত্ব বিপণœ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক চৌধুরী দিশেহারা হয়ে এই বিষয়ে বহু জনের কাছে সহায়তা চেয়েও কারো সাহায্যের আশ^াস পান নি। তিনি নিয়মিত কোর্ট বিল্ডিং গিয়ে নানা জনের কাছে তার সমস্যার কথা বলতে গিয়ে তার প্রিয় ছাত্র জনাব আব্দুল মতিনের সাথে দেখা হয়। যিনি ভূমিকা হুকুম দখল কর্মকর্তা হিসেবে কোর্ট বিল্ডিংযে কর্মরত ছিলেন। জনাব আব্দুল মতিন এ ব্যাপারে সহায়তা করার আশ^াস দেন এবং নিয়মিত অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ রাখেন। এল.এ.ও আব্দুল মতিন জাকির হোসেন রোডের ভূঁইয়া গলির স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে এলাকায় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে তার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

জনাব ওমর গণি চৌধুরী জাকির হোসেন রোডের জাকির হোসেন বাইলেইন এর স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। এলাকায় তিনি যথেষ্ট মান্য ব্যক্তি ছিলেন। তার বাড়িটি ‘চৌধুরীবাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। এলাকায় তিনি অঢেল সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি উচ্চ শিক্ষিত না হলেও মহৎপ্রাণ ও উদার মনের মানুষ ছিলেন। ষাটের দশকে বর্তমান জাকির হোসেন রোড এত প্রশস্ত রাস্তা ছিল না। শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব জনাব ওমর গণি চৌধুরীর নামে একটি প্রাইমারি স্কুল ছিল যার অবস্থান ছিল জিইসি মোড়ে। উক্ত স্থানটি সরকার কর্তৃক রাস্তার জন্য অধিগ্রহণের ফলে ওমরগণি প্রাইমারি স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং কোনরূপ ক্ষতিপূরণ দাবি না করে শুধু স্কুলের জায়গা বরাদ্দ করার জন্যে তৎকালীন ভূমি হুকুম দখল বিভাগে আবেদন করেন। অত্র এলাকায় বসবাসকারী সাদাত আলী কানুনগো ভূমি হুকুম দখল বিভাগে কর্মরত থাকায় তিনি ওমরগণি চৌধুরীকে উক্ত জায়গার পরিবর্তে ইস্পাহানি স্কুল কলেজের উত্তর পাশে জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দেন। এ ব্যাপারে ওমরগণি চৌধুরীকে সহযোগিতা করেন উক্ত এলাকার কাউন্সিলর আব্দুর রহমান ভূঁইয়া ও সালেহ আহমদ কন্ট্রাক্টরসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তখন বরাদ্দকৃত জায়গায় ওমরগণি প্রাইমারি স্কুলটি নতুন করে কার্যক্রম শুরু করে।

ওমরগণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হলেও সঠিক পরিচালনার অভাবে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। ওমরগণি চৌধুরী এতে হাল ছেড়ে দেন নি বরং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে স্কুলটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য পরামর্শ করতে থাকেন। তিনি শিক্ষিত মানুষের কদর করতেন। তাই তিনি তার সমস্যার কথা বলতে তার প্রতিবেশী সরকারি কর্মকর্তা জনাব আব্দুল মতিনের কাছে আসেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন এল এ ও সাহেব তাঁকে সহায়তা করবেন। স্কুল বিষয়ক সমস্যার কথা শুনে আবদুল মতিন তাঁর প্রিয় শিক্ষক অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হকের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তার বাসায় আসার আমন্ত্রণ জানান।
১৯৬৯ সাল। অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হক তার ছাত্রের বাসায় আসেন এবং ওমরগণি চৌধুরী ও পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে আলোচনায় বসেন। এর মাধ্যমে কলেজ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে কলেজ বিষয়ক সকল সভা এবং চূড়ান্ত চুক্তি এল.এ.ও আবদুল মতিনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে অধ্যক্ষ মোজাম্মেল হকের সাথে সার্বক্ষণিকভাবে থাকতো তার অ ফিস সহায়ক মোহাম্মদ মুসা। কিন্তু এক পর্যায়ে কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এলাকার কিছু লোক বিরোধিতা শুরু করেন। তাদের দাবি এখানে কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা ও বসবাসের পরিবেশ বিঘিœত হবে। এমতাবস্থায় মো. আব্দুল মতিন ব্যক্তিগতভাবে এবং দফায় দফায় এলাকার সকল ব্যক্তিবর্গের সাথে বৈঠক করেন এবং তাদের বোঝাতে সক্ষম হন এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে শিক্ষা বিস্তারসহ সকল মহৎকাজে ছোটখাটো বিচ্যুতিগুলো হিসেবে রেখে ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কলেজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যেতে হবে। এর ফলে কলেজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সকল জটিলতার অবসান ঘটে। পরবর্তীতে কলেজের নামকরণ নিয়ে কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সকলের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয় যে প্রাইমারি স্কুল থাকবে এবং সেই সাথে কলেজ কার্যক্রম চলবে। এই প্রেক্ষিতে ওমরগণি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম অংশে একচালা টিনের ঘরে প্রাথমিক ভাবে কলেজ কার্যক্রম শুরু হয়, নামকরণ হয় ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ।

পাহাড়ের পাদদেশে প্রকৃতির এক মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ যোগাযোগ ব্যবস্থা সুবিধার কারণে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় এই কলেজে ছাত্র ছাত্রীরা গণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই সময় কলেজের প্রধান ফটক নৌকা গেট তৈরি করা হয়। ১৯৭০ এ ওমরগণি এমইএস কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ছয় দফা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ পরিদর্শনে আসেন।

১৯৭০ সালে এমইএস কলেজের পশ্চিম পাশে একটি মহিলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের নাম ছিল ফাতেমা জিন্নাহ স্কুল। বর্তমান পশ্চিম পাশে দোতলা মূল ভবনটি ছিল ফাতেমা জিন্নাহ স্কুল। উর্দু ভাষাভাষী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মেয়েরা এই স্কুলে পড়াশোনা করতো। প্রবেশপথ একই হওয়ার কারণে ওমরগণি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে এক জটিলতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় কমিশনারের নিকট অভিযোগ করেন। বিভাগীয় কমিশনার যখন জানতে পারেন যে ওমরগণি এমইএস কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা আবদুল মতিন জড়িত। তখন তিনি তাকে ডেকে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলে, অন্যথায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। বিভাগীয় কমিশনার সাহেব উর্দুভাষী হওয়ায় তিনি যথেষ্ট কঠোরতা অবলম্বন করেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শু রু হয়ে গেলে বিভাগীয় কমিশনার এই স্কুল বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেন নি। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। যা বর্তমানে ওমরগণি এমইএস কলেজের অংশ।
স্বাধীনতাযুদ্ধে এই কলেজের ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করেন। ছাত্র নেতা রুহুল আমীন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শহীদ হন। তিনি ছিলেন এই কলেজের প্রথম ভি.পি। পরবর্তীতে কলেজের রাস্তাটি ‘শহীদ রুহুল আমিন সড়ক হিসেবে পরিচিতি পায়।

কলেজটিতে বর্তমানে সাতটি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। উচ্চ মাধ্যমিক (বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা) ডিগ্রীতে (বি.বি.এস, বি.এ. বি.এস.এস,বি.এস.সি) চালু আছে। ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা বর্তমানে ১২ হাজারের উপরে।
বর্তমানে শিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যা ১০০ জনের বেশি। কলেজটির বর্তমান অবকাঠামো ও সামনের খেলার মাঠসহ জায়গার পরিমাণ ৪.১৬ একর। সকল অভিজ্ঞ শিক্ষকদের যুগোপযোগী শিক্ষাদান কার্যক্রমের ফলে ছাত্রছাত্রীরা ভালো ফলাফল করে দেশে ও বিদেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। যাদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে এই কলেজটি আজ এই পর্যায়ে এসেছে, তাদের যুগ যুগ ধরে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবেন। বর্তমান অধ্যক্ষ আবু নছর মোহাম্মদ সরোয়ার আলম এর সুযোগ্য নেতৃত্বে কলেজটির অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।

এস.এ.এম জাকারিয়া অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ (অবঃ), ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ, চট্টগ্রাম।

The Post Viewed By: 349 People

সম্পর্কিত পোস্ট