চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২০

সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আর চেতনা ধারণে পার্থক্য আছে : মেয়র

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ

অংশ নেন একাত্তরের ১১ বীর মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ আর চেতনা ধারণে পার্থক্য আছে : মেয়র

বাসস’র আয়োজনে গোলটেবিল আলোচনা

সিটি করপোরেশনের মেয়র আলহাজ আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, দেশে একটি দল দাবি করে তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার মধ্যে পার্থক্য আছে। মূলত চেতনাকেই ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আছেন যারা ’৭১ এর পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের অনেকেই আছেন যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার জন্য হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করবেন। কিন্তু তারা তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন। এখানে বিভ্রান্তির কোন সুযোগ নেই।

গতকাল (শুক্রবার) সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে ‘বিজয়ের শেষ ৩ দিন, কেমন ছিল চট্টগ্রাম’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা উদ্বোধনকালে তিনি একথা বলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) চট্টগ্রাম অফিস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আলোচনায় অংশ নেন একাত্তরের ১১ বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান, মোহাম্মদ হারিছ, এবিএম খালেকুজ্জামান দাদুল, আবু সাঈদ সর্দার, জাহাঙ্গীর চৌধুরী সিইনসি, প্রফেসর মোহাম্মদ মইনউদ্দিন, ফেরদৌস হাফিজ খান রুমু সিইনসি, রেজাউল করিম চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন, মোজাফফর আহমদ ও মনজুরুল আলম মঞ্জু। সঞ্চালনায় ছিলেন বাসস’র চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান কলিম সরওয়ার।

মেয়র বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই শুধু তারা হত্যা করেনি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করাটাই ছিল তাদের ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মেয়র বলেন, আমরা অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে হারিয়েছি, যারা হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করেছেন বাঙালি জাতির স্বাধীনতার জন্য। অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এঁদের অনেকে এখন জীবন সায়াহ্নে। স্বাধীন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধারা।
তিনি বলেন, বাঙালি জাতিকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর জন্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু স্বপ্ন ছিল, ছিল দর্শন। কিন্তু তাঁকে হত্যা করে সেই স্বপ্ন ও দর্শনের মৃত্যু ঘটাতে চেয়েছিল একাত্তরের পরাজিত বাহিনী। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্ত হাতে হাল ধরে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ হারিছ বলেন, এ মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চট্টগ্রামে ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। নগরীর হালিশহর, ওয়্যারলেস ও বিহারি কলোনিতে পাকিস্তানিরা বসবাস করতো। ওয়্যারলেস কলোনিতে যে বাঙালিকে তারা ধরে নিয়ে গেছে সে আর ফিরে আসে নাই। রেল দাঁড় করে বাঙালি যাত্রীদের নামিয়ে তারা জবাই করেছে।

মুক্তিযোদ্ধা-গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে ফৌজদারহাট, পতেঙ্গা, আমিন জুট মিল এলাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মতে একযোগে শতাধিক অপারেশন হয়েছিল। ৩ ডিসেম্বর বন্দরের অয়েল ডিপোতে বিমান আক্রমণ হয়। আমি ভেবেছিলাম পাক বাহিনীর বিমান ! তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে গেলে ছিলই না। আফসোস করতাম, হাতে যদি একটি রাইফেল থাকতো গুলি করে বিমান ফেলে দিতাম। তখন আগ্রাবাদের একটি নালায় ডুকে নাক উঁচু করে অবস্থান নেয়ার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, নাকের পাশ দিয়েই তখন যাচ্ছিল মলমূত্রসহ আবর্জনা।

মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ৭৩ বছর বয়সে এখনো কাজ করে যাচ্ছি। সিটি কলেজের ছাত্র ছিলাম। মুক্তযুদ্ধ হচ্ছে হাতির মতো। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না থাকায় পুরো মুক্তযুদ্ধের চিত্র কেউ দেখেননি। একটি হাতিকে যে আংশিক দেখেছে তার কাছে মনে হয় ‘মূলার মতো বা কুলার মতো’। তেমনি মুক্তিযোদ্ধারাও অনেকে অনেককে চেনেন না। অনেক অপারেশন সম্পর্কে জানেন না। তিনি বলেন, ২৩ মার্চ নৌবাহিনীর পোশাক পরে লাঠি হাতে মার্চপাস্ট করে সবাইকে লালদিঘি মাঠে নিয়ে আসি। মার্চপাস্ট শেষ হয় চকবাজারে। ২৫ মার্চ স্টেশনের অনেক কুলির অবদান দেখেছি।
মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ সর্দার বলেন, জাতীয়ভাবে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হলেও, চট্টগ্রাম সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় ১৭ ডিসেম্বর। ১৪-১৭ ডিসেম্বর আমি ছিলাম আগ্রাবাদ এলাকায় মৌলভী সৈয়দের বেস ক্যাম্পে। তখন ওয়ারল্যাস ছিল না বলে খুব দূরের খবর পেতাম না। তিনি বলেন, ১৪ ডিসেম্বর ৩০০ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা একত্রিত হই মুহুরী পাড়ার বিলে। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস আসে। বাঙালি চালক ছিলেন। দুইজন বিহারিকে পাই। তাদের ধরে মাটির দোতলায় আমাদের গোয়েন্দা সেলে নিয়ে যাই। তাদের তথ্য মতে নগরীর একটি হোটেল থেকে চারজন মেয়েকে উদ্ধার করি। কিছু অস্ত্রও পাই।
মুক্তিযোদ্ধা এবিএম খালেকুজ্জামান দাদুল বলেন, চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল লালদিঘি মাঠ থেকে। সেখানে মার্চের শুরু থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক হতো। পুরো নয় মাস চট্টগ্রামজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সার্কিট হাউস ছাড়াও পুলিশ লাইন ও গুডস হিলসসহ কয়েকটি টর্চার সেল ছিল। ১৬ তারিখ সকালে সার্কিট হাউসে গিয়ে একটা ডকুমেন্ট পাই। সেখানে চট্টগ্রামের কারা আওয়ামী লীগ করেন এবং কাদের মারতে হবে তার লিস্ট উদ্ধার করি। পাকিস্তানের পতাকাটা নামিয়ে চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র শামীমসহ বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেই সার্কিট হাউজে।

মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর মোহাম্মদ মইন উদ্দিন বলেন, আমি মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলাম, আমার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণটা সে কিভাবে যে সহ্য করেছেন এটা আপনাদের বলে বুঝাতে পারবোনা। বিজয়ের পর আমি বাড়ি ফিরে গেলে মা আমাকে জড়িয়ে ধরে হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। যুদ্ধকালীন মাকে একা ঘরে রেখে যাওয়ার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস হাফিজ খান রুমু বলেন, রাউজানের সিইনসি স্পেশাল হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম, যুদ্ধকালীন ৭ অক্টোবর আমরা মদুনাঘাট আক্রমণ করি। সেই সম্মুখ যুদ্ধে ৮ জন পাকিস্তানি সেনা মারা যায়। একজন মুক্তিযোদ্ধাও মারা যায়। সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কাঁদায়।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধের শেষ তিন দিন মিরসরাইয়ের দণিাঞ্চলে ক্যাম্পে অবস্থান করি। এসময় শুনছিলাম প্রচুর মিলিটারি শহর অভিমুখে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও ভয় দুটোই ছিল। কারণ রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধা, সিভিল মানুষ সবার হাতে অস্ত্র ছিল না। রাতে কিছু বাড়ি লুট হয়। রাজাকার আতাউস সোবহানের জল্লাদখানায় করুণ অবস্থা দেখেছি। চারদিকে মানুষের মাথার খুলি, রক্তের দাগ।
মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিরাট উপাখ্যান। চট্টগ্রাম শহরে ছিলেন গেরিলা যোদ্ধারা। এর জন্য বেস গড়ে তুলতে হয়। চট্টগ্রাম শহরে ১৪ ডিসেম্বর থেকে আতঙ্ক ছিল। আবার ভেতরে ভেতরে উল্লাসও ছিল। বোমারু বিমানে করে যৌথবাহিনী বোমা বর্ষণ করছিল। এসব বিমান দেখে ছোট ছোট বাচ্চারাও ঘরের ছাদে উঠে হাততালি দিত। জনগণের সাহস বেড়েছিল। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল বিজয় সন্নিকটে।

নগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফফর আহমদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে আমার মায়ের কথা বলতে হয়। তার চার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। অথচ আমার মা লেখাপড়া জানতেন না। আফসোস মীর কাশিম আলীকে অল্পের জন্য ধরতে পারিনি।
মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক মনজুরুল আলম মঞ্জু বলেন, আমি পদকের জন্য যুদ্ধ করিনি। দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধে যাই। পতাকার জন্য যুদ্ধ করি। অনেকের নামে স্কয়ার, সড়ক হচ্ছে। মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর নামে স্কয়ার করার জন্য মেয়রের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।-বিজ্ঞপ্তি

The Post Viewed By: 95 People

সম্পর্কিত পোস্ট