চট্টগ্রাম বুধবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মুক্তিযোদ্ধা মনোহর বড়ুয়া

জুইগ্যাছোলা বাজারে পাঞ্জাবিদের সাথে যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হই

আজ শুরু বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বাংলাদেশের প্রতিটি রণাঙ্গণে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই শুরু হয় এ মাসে। যৌথ বাহিনীর প্রচ- আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাক বাহিনী। অবশেষে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এ মাসে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা লাভ করে। বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গণের বীর সেনানীদের স্মৃতিকথা নিয়ে দৈনিক পূর্বকোণে আজ থেকে প্রকাশিত হবে স্মৃতিচারণমূলক ধারাবাহিক বিশেষ প্রতিবেদন। আজ প্রকাশিত হল সাতকানিয়ার মুক্তিযোদ্ধা মনোহর বড়–য়ার স্মৃতিচারণ। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আমাদের সাতকানিয়া প্রতিনিধি সুকান্ত বিকাশ ধর।
১৯৭০ সালে এসএসসি পাশ করার পর ঢাকায় এক আত্মীয়ের নিকট বেড়াতে যাই। সেখানে হাসান আলী খাঁন নামে এক বিহারীর ফ্রেম ফটোগ্রাফারের দোকানে চাকুরি নেয়ার পাশাপাশি কাজও শিখছি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ রেডিওতে শোনার পর আমার নিজের ভেতর যেন একটা উম্মাদনার সৃষ্টি হয়। ঢাকায় গ-গোল বেশি শুরু হলে ডিসেম্বরের দিকে বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে কয়েকমাস থাকার পর দেখি ঢাকা ছাড়াও গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নির্যাতন। ঢাকা ছেড়ে এসে নিজ বাড়িতেও স্বাভাবিকভাবে বসবাস করার নিশ্চয়তা না পেয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মে মাসের বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে সকাল বেলা এক কাপড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। গন্তব্য, চন্দনাইশের ধোপাছড়ির পাহাড়ের নাছিরের খামার। যখন পেঁৗঁছি তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সেখানে দেখতে পাই, পটিয়ার সোলতান আহমদ কুসুমপুরী, সাতকানিয়ার গোয়াজর পাড়ার লোকমান, মনির আহমদ, রফিক (বর্তমানে মানসিক রোগী), ঢেমশার আবুল কালাম, ছদাহার রনজিত বৈদ্যসহ সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকার অনেকেই। সেখানে ঢেমশার তৎকালীন পুলিশ সদস্য সুভাষ বড়–য়া ছিলেন কমান্ডার। তাঁর অধীনে আমরা যারা ছিলাম, তাঁরা ১০দিন অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে ১০-১২ জনের একটি দল পুরাতন কাপ্তাই হয়ে পাহাড়ি পথ দিয়ে ভারতের দেমাগ্রী পৌঁছি। সময় লাগে ৯ দিনের মত। পথে খাবার ছিল শুকনো চিড়া ও গুড়। ক্ষুধা লাগলে ছড়ার পানিতে গেঞ্জিতে চিড়া রেখে ভিজিয়ে খেতাম। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে এসব কথা বলেন, সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা বড়–য়া পাড়ার মৃত সুবোধ বড়–য়ার পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা মনোহর বড়–য়া।
তিনি বলেন, দেমাগ্রীতে ভারতের একজন কমান্ডারের অধীনে দেড় মাস অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। পরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় হরিণা ট্রানজিট ক্যাম্পে। সেখানে ফায়ারিং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বগার পাহাড় হয়ে রামগড় নদী পাড় হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।
পরে সেখান থেকে আমাদের গ্রুপটি ফটিকছড়ির জুইগ্যাছোলা বাজারে গেলে পাঞ্জাবিদের সাথে আমাদের সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ৪ জন পাঞ্জাবি গুলিবিদ্ধ হয়। আমাদের দলের মধ্যে আমার ডান পায়ে গুলি লেগে আহত হই। আমাদের গোলাবারুদ কম থাকায় বাধ্য হয়ে আমরা পিছু হটে পাহাড়ের ত্রিপুরা পাড়ায় যাই। সেখানে এক ত্রিপুরা যুবক আমার গুলিটি চিমটি দিয়ে ধরে বের করে। পরে রাঙ্গুনিয়া বাজারে গিয়ে ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হই।
মনোহর বড়–য়া আরো বলেন, ত্রিপুরা পাড়া থেকে কয়েকদিন পর রাঙ্গুনিয়া বাজারে গেলে সেখানে আমরা রাজাকারের মুখোমুখি হই। এদের সংখ্যা ছিল ১২ জন। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ছিলাম ৩৪ জন। মুখোমুখি গোলাগুলিতে ২ জন রাজাকার মারা যায়। তবে মুক্তিযোদ্ধারের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি। পরে হাটহাজারীর মদুনাঘাটের উপর দিয়ে কর্ণফুলী পার হয়ে বোয়ালখালীর কড়লডেঙ্গা থেকে পটিয়া হয়ে চন্দনাইশের ফতেহনগর হাজিপাড়া পৌঁছলে সেখানে রাজাকারদের সাথে আমাদের বন্ধুক যুদ্ধ হয়। এতে কেউ হতাহত হয়নি। সেখানে ৯ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকারদের বুঝিয়ে দিয়ে শঙ্খ নদী পার হয়ে বাঁশখালী-এওচিয়ার সীমান্ত এলাকা চূড়ামণির পাহাড়ে গিয়ে ক্যাম্প স্থাপন করি।
মনোহর বড়–য়া বলেন. নভেম্বর মাসের শেষের দিকে আমাদের গ্রুপ কমান্ডার ননী গোপাল বিশ্বাসের নেতৃত্বে সাতকানিয়া থানা আক্রমণ করে অস্ত্র ও গুলি লুট করা হয়। অস্ত্রগুলো থানা পুকুরে ফেলে দিয়ে গুলিগুলো নিয়ে পালিয়ে যাই। ৫ ডিসেম্বর আমাদের ১৫২ নং গ্রুপ ও ১৫৩ নং গ্রুপ মিলে দোহাজারী ব্রিজের অদূরে পাকিস্তানিদের আক্রমণ করার জন্য বিওসির মোড়ে অবস্থান নিই। দোহাজারী ব্রিজের উত্তর পার্শ্বে ছিল পাঞ্জাবিরা। আমাদের অবস্থান টের পেয়ে বিকাল ৪টার দিকে তারা (পাঞ্জাবি) আমাদের উপর আক্রমণ করে। এ সময় ১৫৩ নং গ্রুপ থেকে নলুয়ার বিমল চৌধুরী ও আমিরাবাদের সুভাষ মজুমদার মারা যায়। পরে ভারতের যৌথ বাহিনী গিয়ে পাঞ্জাবিদের আক্রমণ করলে তারা পালিয়ে যায়। আর আমরা কালিয়াইশের কাটগড় চলে যাই। সেখান থেকে সাতকানিয়া সদরের ডাক বাংলোতে ক্যাম্প স্থাপন করি। কয়েকদিন পর কাঞ্চনা নন্দী বাড়ির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের গ্রুপটি অবস্থান নেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত সেখানে আমাদের গ্রুপটি ছিল। রেডিওর মাধ্যমে পাঞ্জাবিরা জেনারেল অরোরার হাতে আতœসমর্পণের খবর পেয়ে আমরা যার যার ঘরে নিজের কাছে থাকা অস্ত্র নিয়ে ফিরে যাই। প্রায় ২ মাস পর শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ভারতীয় যৌথ বাহিনী ও সাবেক এমএনএ আবু ছালেহের নিকট সাতকানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অস্ত্র জমা দিই।
মনোহর বড়–য়ার লাল মুক্তি বার্তা নং-০২০২০৬০২০৯। গেজেট নং-৪২৯৩। সার্টিফিকেট নং-৫৮৭১২। ব্যক্তিজীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। ছেলে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত এবং মেয়ে বিবাহিত।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 458 People

সম্পর্কিত পোস্ট