চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

১ মে, ২০১৯ | ২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

বিদ্যুতের তার ও সুইচ নি¤œমানের

চমেক হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের আশংকা

বড় দুর্ঘটনা থেকে গতকাল রক্ষা পেল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। চমেক হাসপাতালের অস্ত্রপচারসহ পুরো হাসপাতালের ওয়ার্ডে যে বৈদ্যুতিক তার এবং সুইচগুলো ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্মমাণের বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও বৈদ্যুতিক সংশ্লিষ্টরা। এসব তার ও সুইচ থেকে এমন অসংখ্য অগ্নিকা-ের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের। গতকাল মঙ্গলবার ঘটে যাওয়া অগ্নিকা- ভয়াবহ রূপ নেয়া আগেই নিয়ন্ত্রণে আনে হাসপাতাল কর্মচারীরা। অগ্নিকা-ের ঘটনাস্থলের পাশেই ছিল অক্সিজেন, নাইট্রোজেন গ্যাস ও সেন্ট্রাল সাকারের মতো ধাতব পদার্থ। যেখানে আগুনের আঁচ লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণের রূপ নিতো বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা। এছাড়া যে কক্ষে অগ্নিকা-ে ঘটনা ঘটেছে, সে কক্ষেই আগুন লাগার কিছু আগেই এক নারীর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন অস্ত্রোপচার কক্ষের এক কর্মকর্তা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের প্রায় ৪০টি ওয়ার্ডে ১৩১৩ শয্যার বিপরীতে প্রায় তিনহাজার রোগী ভর্তি রয়েছে। এছাড়াও এসব রোগীদের সঙ্গে এক বা দুইজন করে স্বজন থাকে হাসাপাতালে। অন্যদিকে প্রতিদিন হাসপাতালের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে অন্তত আরও চার হাজার রোগী। সব মিলিয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে কমপক্ষে দশহাজার মানুষের আনাগোনা রয়েছে। তবে এতে অগ্নিকা-ের মতো কোন দুর্ঘটান ঘটলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়া দুষ্কর।
এদিকে, হাসপাতালের ওয়ার্ড বা কক্ষে যে সকল বৈদ্যুতিক তার ও বৈদ্যুতিক বোর্ডে সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে তা অনেক পুরানো। এসব বৈদ্যুতিক তার বা সুইচগুলো কিছুদিন পর পর পরিক্ষা করার কথা থাকলেও কেউই কা করে থাকেন না বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মচারীরা। এছাড়াও বৈদ্যুতিক তার ও সুইচগুলো নি¤œমানের ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। যদিও হাসপাতাল উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম পূর্বকোণকে জানিয়েছেন, এসব বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগ সরাসরি দেখেন। আমরা তাদের একাধিকবার বলার পরও তারা এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা নেয়না। হয়তো আজকে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে নি, তবে বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো। আমাদের কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।’
হাসপাতালের বৈদুতিৎক তারগুলো কি উন্নত মানের কিনা এবং তা নিয়মিত পরিক্ষা করা হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা হাসপাতাল পরিচালনা করে থাকি। এসব বিষয় গণপূর্ত বিভাগেই দেখা শোনার কথা। তাছাড়া আমরা উন্নতমানের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার এবং বৈদ্যুতিক বিষয়ে গণর্পূত থেকে বাজেট চাইলেও ঠিকমতো বাজেট পাওয়া যায়না। তিন কোটি টাকার একটি বাজেট তৈরি করে পাঠালে তারা আমাদের মাত্র ৫০ লাখ টাকা দেয়। এত অল্প টাকা দিয়ে এসব বড় বড় কাজ করা যায় না। আর সবসময় গণর্পূত বিভাগ হাসপাতালের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিগুলো দেখা শোনাও করতে হবে। তাহলে অন্তত কোন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।’
গতকাল মঙ্গলবার চমেক হাসপাতালের অস্ত্রপচারের যে কক্ষে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে সে কক্ষের এক কর্মচারী পূর্বকোণকে বলেন,‘সাড়ে দশটার দিকে ৩ ও ৪ নম্বর রুমের এসি থেকে একটু একটু ধোঁয়া দেখা যায়। এতে দ্রুতই আমরা পাশে থাকা অক্সিজেন, নাইট্রোজেন গ্যাস, সেন্ট্রাল সাকারসহ সকল যন্ত্রপাতি অন্যত্রে সরিয়ে নেই এবং মেইন সুইচ বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করে তা জানানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হঠাৎ আগুন লেগে যায়। পরে পানির বোতলে করে আমরা দুইজনে মিলে কয়েক বোতল পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। আগুন না নেভায় ফায়ার ডিসটিংগুইসার ব্যবহার করলে আগুন দ্রুত নিভে যায়। তবে আগুন যদি অক্সিজেন, নাইট্রোজেন গ্যাস, সেন্ট্রাল সাকার বা রুমের সিলিংয়ের মধ্যে লাগতো তাহলে পুরো অপারেশন থিয়েটারসহ হাসপাতালে বড় বিস্ফোরণ ঘটতো। আগুন লাগার কিছুক্ষণ আগেই ওই রুমে একটি রোগীর অপরেশন হওয়া কথা ছিল বলেও জানিয়েছেন তিনি।’
আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন,‘অস্ত্রপচার কক্ষে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় তার বেশিরভাগই ছিল ধাতব পদার্থ। এসব যন্ত্রপাতিতে যদি আগুন লাগতো তাহলে আগুন কন্ট্রোল করা যেত না। মুহূর্তের মধ্যেই বিস্ফোরণে রূপ নিত এবং তা ছড়িয়ে পড়তো। কর্মচারীদের দক্ষতার কারণেই ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।’ হাসপাতালের ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি তিনি। তিনি বলেন,‘সরকারি দপ্তর নিয়ে আমি কোন কথা বলতে চাই না।’
জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী হাসান ইবনে কামাল পূর্বকোণকে বলেন,‘তারগুলো পুরাতন হয়ে গেছে তা ঠিক। আমরা কিছুদিন পর পর তা দেখাশোনা করি। যে স্থানে সমস্যা মনে হয় তা সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তণ করা হয়। তবে আজকে যে ঘটনা ঘটেছে তা বৈদ্যুতিক তার বা সুইচ থেকে নয়। এ ঘটনা হয়েছে এসি থেকে। ওই রুমের তিনটি এসির মধ্যে দুইটিই বন্ধ ছিল এবং একটি এসি টানা চলতে থাকায় মোটর অতিরিক্ত গরম হয়ে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। তাছাড়া হাসপাতালে যে এসিগুলো কর্তৃপক্ষ লাগিয়েছে তার বেশিরভাগই দুর্বল ও পুরাতন। এসব কারণেই অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জানান তিনি।’

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 523 People

সম্পর্কিত পোস্ট