চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০

৩০ এপ্রিল, ২০১৯ | ৩:১৩ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব সংবাদদাতা , হাটহাজারী

ব্রিজ ভেঙে ওয়াগন খালে

হাটহাজারীর এগার মাইলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা া তিন বগি থেকে খালে ছড়িয়ে পড়ল কয়েকশ লিটার ফার্নেস অয়েলা হালদা দূষণের আশঙ্কা নেই

হাটহাজারীতে অবস্থিত ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প পিকিং পাওয়ার প্লান্টে জ্বালানি তেল নিয়ে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে ফার্নেস অয়েলবাহী একটি ওয়াগন ট্রেনের তিনটি বগি। গতকাল সোমবার বন্দরের সিজিসি ওয়াইজ ইয়ার্ড থেকে প্রায় ১৭২ টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে আসার পথে বেলা ২টার দিকে উপজেলার এগার মাইলে অবস্থিত পাওয়ার প্লান্টের ২শ গজ উত্তরে আবুল কালামের মাদ্রাসার সামনে ব্রিজের উপর থেকে ফার্নেস তেলবাহী তিনটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে খালে পরে যায়। ৭টি বগির প্রতিটিতে সাড়ে ২৪টন (১০০০ লিটারে ১টন) করে ফার্নেস অয়েল বহন করছিল ওয়াগনটি। দুর্ঘটনা কবলিত তিনটি বগি থেকে কয়েকশত লিটার ফার্নেস অয়েল খালের পানিতে পড়ে পানিতে মিশে যায়। তেল মিশে যাতে হালদা নদী ও পরিবেশ দূষণ না হয় সেজন্য দ্রুত তা কুড়িয়ে নিতে কাজ করছে প্রশাসন।
সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের সিজিসি ওয়াইজ ইয়ার্ড থেকে থেকে ছেড়ে আসা ৭টি বগির ওয়াগন ট্রেনটি হাটহাজারী স্টেশন ঘুরে পিকিং পাওয়ার প্লান্টে আসার কথা ছিল। কিন্তু হাটহাজারী রেল স্টেশনে যাওয়ার সময় ট্রেনটি পিকিং বিদ্যুৎ প্লান্টের পশ্চিম পাশে গ্রিন সিটি আবাসিকের সামনে পৌঁছলে বেলা ২টার দিকে বিকট শব্দে ট্রেনটির কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। পাওয়ার প্লান্টের ২শ গজ উত্তরে আবুল কালামের মাদ্রাসার সামনে ব্রিজ অতিক্রম কালে ইঞ্জিন ও সামনের দুটি বগি নিয়ে ওয়াগন ট্রেনটি ব্রিজ পার হলেও মাঝখানের একটি ওয়াগন ব্রিজ ভেঙে ছড়ার (খাল) নিচে পড়ে যায়। এ সময় খালের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে আরো দুটি ওয়াগন লাইনচ্যুত হয়ে নিচে পড়ে যায়। গ্রিন সিটির বাসিন্দা সালাউদ্দিন বলেন, দুপুরের ভাত খাওয়ার সময় বিকট শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি ২শ গজ উত্তরে ব্রিজের উপর থেকে ট্রেনের তিনটি বগি পড়ে ল-ভ- হয়ে আছে। তিনি বলেন ট্রেন চালক ব্রেক কষলে হয়ত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। এ সময় তিনটি ওয়াগন থেকে কয়েকশ লিটার তেল ছড়ার পানিতে মিশে যায় বলে সূত্রে প্রকাশ। ফার্নেস অয়েল যাতে পাহাড়ি ছড়ার (খাল) পানির সাথে মিশে চানখালী খাল হয়ে হালদা নদীতে মিশতে না পারে তার জন্য কাজ শুরু করে প্রশাসন। ঘটনার পরপরই পানিতে মিশে যাওয়া তেল ছেকে নিতে খালে বাঁধ দিয়ে কাজ শুরু করে স্থানীয় এলাকাবাসী, হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন, রেলওয়ে ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন। ঘটনার পরপরই গতকাল বিকেলে পাহাড়তলী থেকে রেলওয়ের একাধিক উদ্ধারকারী টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। যত দ্রুত সম্ভব দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেন উদ্ধার করা হবে বলে রেল সূত্রে প্রকাশ। রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যেই বিকল্প পথে রেলযোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্ঘটনাকবলিত ওয়াগনগুলো উদ্ধার করা হবে।
রেলওয়ে থানার ওসি মোস্তাফিজ ভূইয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, রেল পুলিশ দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনটি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা দেবে।
ছড়া বা পাহাড়ি ঝরনার ওপর যে ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে তা খুব শিগগিরই ছেঁকে তুলে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্মকর্তারা। আর যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তেল তুলে নেওয়া হয় তাহলে তা জলজ প্রাণীকূলের ওপর তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। ঘটনাস্থলে থাকা হাটহাজারীর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহল আমিন দৈনিক পূর্বকোণ’কে বলেন, যাতে তেলগুলো হালদা নদীতে যেতে না পারে সেজন্য পাহাড়ি ছড়াটিতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এ তেল যাতে হালদা নদীতে মিশতে না পারে সেজন্য চেনখালী খালেও বাঁধ দেওয়া হচ্ছে।
পাহাড়ি ছড়াটি চেংখালি খালের মাধ্যমে মিশেছে হালদা নদীর সাথে আর এই হালদা নদী হলো দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র মিঠা পানির মা মাছের প্রজননক্ষেত্র। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তেল তুলে নেওয়া হয়, তবে হালদা-দূষণ-এর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে করেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ‘হালদা বিশেষজ্ঞ ড. মনজুরুল কিবরিয়া। ড. কিবরিয়া রেলের দুর্ঘটনাস্থলে ল-ভ- ব্রিজটি দেখিয়ে দৈনিক পূর্বকোণ’কে মন্তব্য করেন এ নড়বড়ে ব্রিজ এত বেশি ওজনের মালবাহি ট্রেন চলাচলের উপযোগী কিনা তা তদন্ত করে দেখা উচিত।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ব্যবস্থাপক বোরহান উদ্দিন দৈনিক পূর্বকোণ’কে বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত তিনটিসহ প্রতিটি ওয়াগনে সাড়ে ২৪ টন করে তেল ছিল। এরমধ্যে একটি ওয়াগন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দুটি ওয়াগন তেমন ক্ষতি হয়নি। তিনটি ওয়াগন থেকে আনুমানিক কয়েকশত লিটার ফার্নেস অয়েল ছড়ার পানিতে পড়ে গেলেও সেগুলো উদ্ধারে রেলওয়ে সহ ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন আগামী ৩ দিনের মধ্যে বিকল্প পথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হবে। দুর্ঘটনার বিষয়ে এরই মধ্যে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে তিনি জানান। চট্টগ্রাম বিভাগ রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ শেখ নাইমুল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি এবং রেলযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন জিএমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বোরহানউদ্দিন বলেন একক কোন কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না। একাধিক কারণ থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে কেন এবং কী কারণে কিংবা কার অবহেলায় ট্রেনটি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়েছে তা তদন্ত কমিটি বের করবে। দুর্ঘটনাস্থলের ব্রিজটি ভারী ট্রেন চলাচলের উপযোগী বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 1548 People

সম্পর্কিত পোস্ট