চট্টগ্রাম সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

৩০ নভেম্বর, ২০২০ | ২:৫১ অপরাহ্ণ

ইমরান বিন ছবুর

চায়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনা বান্দরবানে

বান্দরবান জেলায় চা শিল্পের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞ ও চা শিল্প সংশ্লিষ্টরা। জেলার অধিকাংশ জায়গা ভার্জিন এবং আছে উর্বর জমি। রয়েছে চা চাষীদের ব্যাপক আগ্রহ। সবকিছু মিলে বান্দরবান জেলা চা চাষের জন্য বেশ উপযোগী বলে মনে করছেন কৃষিবিদেরা।

বর্তমানে বান্দরবান সদর, রুমা ও রোয়াংছড়ি উপজেলায় চা চাষ হচ্ছে। এই তিন উপজেলায় মোট ৯০ হেক্টর বা ২২২ একর জায়গায় চা চাষ হচ্ছে যেখানে মাসে প্রায় ছয় হাজার কেজি চা পাতা উৎপাদন হয় বলে জানিয়েছেন চা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

দিন দিন বান্দরবানে চা চাষে আগ্রহ বাড়ছে স্থানীয়দের। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩২৮ জনের মত নিবন্ধিত চাষী রয়েছেন। চাষীদের সুবিধার্থে ২০১৯ সালে বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নে একটি চা ফ্যাক্টরি স্থাপন করে চা বোর্ড। অন্যদিকে বান্দরবানে ২০১৬ সালে নেয়া ‘এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং টি কাল্টিভেশন ইন চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস’ শীর্ষক প্রকল্পের মোট ৭০ শতাংশ সফলতা লাভ করেছে। ফলে এই প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জহিরুল ইসলাম। তিনি পূর্বকোণকে বলেন- পার্বত্য চট্টগ্রাম, বিশেষ করে বান্দরবানে চা শিল্পের সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। পাহাড় কিংবা উঁচু জায়গা হচ্ছে চা চাষের জন্য উপযুক্ত এলাকা। বান্দরবানের অধিকাংশ পাহাড় ভার্জিন ল্যান্ড। অর্থ্যাৎ আগে সেখানে কোনকিছু চাষ হয়নি। তাই সেখানকার জমিগুলো উর্বর। আমাদের টেস্টে সেখানকার মাটিও আমরা ভালো পেয়েছি। এছাড়া সেখানে চা চাষীদের ব্যাপক উৎসাহ দেখেছি। বেশির ভাগ উপজাতীয় লোক এসব জায়গার মালিক।

বান্দরবানে বর্তমানে প্রায় ৯০ হেক্টর জমিতে চা চাষ হচ্ছে উল্লেখ করে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান আরো বলেন, আমরা বেশ কয়েকবার সেখানে ভিজিটে গিয়েছি। আমরা দেখেছি, একজন মারমা মহিলা চা চাষী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। উনি পুরুষের চেয়েও বেশি সাফল্য লাভ করেছেন। সে হিসেবে সম্ভাবনার কথা বলতে গেলে, বান্দরবানের যে ভূমি, আবহাওয়া বা পরিবেশ এবং মানুষের আন্তরিকতা সেটা চা চাষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং টি কাল্টিভেশন ইন চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস এর প্রকল্প পরিচালক সুমন সিকদার বলেন, বাংলাদেশ চা বোর্ড বৃহদায়তন চা বাগানের পাশাপাশি ক্ষুদ্রায়তন চা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। বান্দরবানের মাটি উন্নতজাতের চায়ের জন্য খুবই উপযোগী। তাই এখান থেকে সেরা মানের চা পাওয়া সম্ভব। এই চা স্বতন্ত্র ব্র্যান্ড হিসেবে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। ক্ষুদ্র  চা বাগান মালিকদের চা পাতার ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বান্দরবানে একটি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপন করা হয়েছে।

চা বোর্ডের সদস্য ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী বলেন, চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. জহিরুল ইসলাম ‘ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুল’ নামের একটি মডেল উদ্ভাবন করেন। এর মাধ্যমে চা চাষীরা প্রুনিং, প্ল্যাকিং, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন এবং বিভিন্ন আন্তঃপরিচর্যা বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। উক্ত মডেলটি উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্র চা চাষীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। এ কারণে বান্দরবান পার্বত্য জেলার ক্ষুদ্র চা চাষীদের মধ্যেও মডেলটি ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ‘ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুল’ মডেলটি উত্তরবঙ্গের মতো বান্দরবানসহ সকল পার্বত্য জেলার চা চাষীদের দক্ষতা উন্নয়নে এবং চা শিল্পের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে চা শিল্পের প্রসার ঘটানোর জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার ইতোমধ্যে বান্দরবানে একটি প্রজেক্ট গ্রহণ করেছে। সেখানে আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে ৩০০ হেক্টরে চা চাষ করা। এই পর্যন্ত আমরা ৯০ হেক্টর জমিতে চা চাষ করেছি। ভৌত অবকাঠামোসহ এই প্রকল্পে ৭০ শতাংশ সাফল্য লাভ করেছি। ফলে এই প্রকল্পের মেয়াদ আরো দু’বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বান্দরবানের চা ফ্যাক্টরির সাফল্যের কথা উল্লেখ করে চা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, বান্দরবানে একটি চা ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে আমরা পরীক্ষামূলকভাবে চা উৎপাদন শুরু করেছি। সেই চা আবার বিভিন্ন কেমিকেল টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। আমরা নিজেরাও সেই চা টেস্ট করে দেখেছি। এই চায়ের মান খুব ভালো। সেই দিক থেকে চায়ের মান যদি ভালো হয়, আর কিছু দেখার প্রয়োজন নেই। এই শিল্পের উন্নতি হতে বাধ্য।

চা উৎপাদনের সাথে জড়িত চাষীদের বান্দরবানের জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, এনজিও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে বলে উল্লেখ করেন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান।

উল্লেখ্য এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং টি কাল্টিভেশন ইন চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় বান্দরবান জেলায় ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চা শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত অংশীজনদের নিয়ে গত ১৯ নভেম্বর বান্দরবান জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শফিউল আলমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। তিনি এ অঞ্চলে চা আবাদ বৃদ্ধি এবং ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র চাষীদের দক্ষতা উন্নয়নে কারিগরী প্রশিক্ষণের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। এ ব্যাপারে সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সকলকে আশস্ত করেন ড. মো. জাফর উদ্দীন।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 137 People

সম্পর্কিত পোস্ট