চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২১

সর্বশেষ:

২৪ নভেম্বর, ২০২০ | ২:০৪ অপরাহ্ণ

আল-আমিন সিকদার

অগ্নিঝুঁকি নিয়ে আসছে শীত

শুষ্ক মৌসুমের কারণে শীত এলেই বেড়ে যায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। গত ৫ বছরে শুধুমাত্র চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৫৬৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন, আহত হয়েছেন ৭১ জন। আবহাওয়াবিদরা জানান, এদেশে সাধারণত মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারির সময়টিকে শীতকাল হিসেবে ধরা হয়। তবে গত কয়েক বছরের ঋতু পরিবর্তনের প্রবণতায় দেখা গেছে, অগ্রহায়ণেই শীত চলে আসে। আমেজ থেকে যায় মধ্য মার্চ পর্যন্ত।

বছরের অন্যান্য মাসের তুলনায় শীতের এই মাসগুলোতে আগুন লাগার ঘটনা দ্বিগুণ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম ফায়ার স্টেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৪৯৯টি। এতে ক্ষতি হয়েছে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকার। প্রাণ হারিয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ৮ জন।

২০১৬ সালের ফায়ার সার্ভিসের ও বার্ষিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শীতের (ডিসেম্বর) মাসে চট্টগ্রামে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৬৮টি। যাতে ক্ষতি হয়েছিল ২ কোটি ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকার। যা ওই বছরের অন্যসব মাসের ক্ষতির তুলনায় প্রায় ৩ গুন। যে ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত। ২০১৭ সালে ৮৬৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চট্টগ্রামে। প্রাণ হারায় একজন। আহত হয় ছয় জন। ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। যার প্রায় অর্ধেকই ঘটেছে জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসে। শীতের ওই তিন মাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৩২৮টি। ক্ষতি হয়েছে ২১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার। তবে ওই বছরের অন্যান্য মাসে অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম থাকলেও শেষ মাস ডিসেম্বরে এসে ফের বেড়ে যায়। ওই মাসে ৬০ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতি দাঁড়িয়েছিল ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কারণ, এটাও ছিল শীত শুরুর প্রথম মাস। যার ধারবাহিকতা ছিল ২০১৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত।

২০১৮ সালে ৫৯৯টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয়েছিল ১১ কোটি ২০ লাখ ৮৮ হাজার টাকার। ওইসব অগ্নিকাণ্ডে আহত হন ৮ জন আর মৃত্যুবরণ করেন একজন। এদিকে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, এই চার মাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল ২৭৩টি। যাতে ক্ষতি হয় ৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকার।

২০১৯ সালে ক্ষতির পরিমাণ ১০ কোটি ৬৯ লাখ ৩০ হাজার টাকার। শীত মৌসুমে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার মাসে ৩৬৯টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয় ৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার। আর এই চার মাসে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান ১৩ জন। অথচ পুরো বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৭৩৬টি। অর্থাৎ পুরো বছরে যে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে শীতের ওই চার মাসেই অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষতি হয়েছে তার অর্ধেক।
চলতি বছরের পরিসংখ্যানও দিচ্ছে একই তথ্য। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৫৬৭টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতি হয়েছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকার। যেখানে আহত হয়েছেন ১৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৫ জন। অথচ শীত শুরুর আগেই অর্থাৎ চলতি নভেম্বর মাসেই অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৮৭টি। গতকাল (সোমবার) দুপুর পর্যন্ত ঘটেছে আরও ৪টি ঘটনা। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করা না গেলেও প্রায় ৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানান আগ্রাবাদ ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মো. কফিল উদ্দিন।

শীতে কেন বাড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা : চট্টগ্রামে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, শীতে পরিবেশ শুষ্ক থাকে। আগুনের ছোঁয়া পেলেই তাতে ঘটে বড় দুর্ঘটনা। অনেক বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটেছে সিগারেট বা শীতে আগুন পোহানোর সময় উড়ে যাওয়া আগুনের ছোট ছোট ফুলকি থেকে। এছাড়া বৈদ্যুতিক শট সার্কিটসহ অন্যান্য কারণতো রয়েছেই। সুতরাং, এ সময়টা আমাদের অবশ্যই সতর্কতার সাথে যেমন চলতে হবে তেমনি প্রস্তুত থাকতে হবে অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ নিয়ে। হাতের কাছে রাখতে হবে অগ্নিনির্বাপণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। আয়ত্তে রাখতে হবে ব্যবহারের কৌশল।

 

নগরীতে অগ্নিঝুঁকিতে  ৫৪ এলাকা ও মার্কেট

নগরীতে অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে ৮টি ফায়ার স্টেশনের ৫৪ এলাকা ও মার্কেট। যাদের ৯০ শতাংশেই এখনও নেই ফায়ার সেফটি প্ল্যান।
কালুরঘাট ফায়ার স্টেশনে অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে ৫টি মার্কেট। যেগুলো হচ্ছে হক মার্কেট, স্বজন সুপার মার্কেট, বখতেয়ার সুপার মার্কেট, নজু মিয়া হাট মার্কেট ও বলির হাট মার্কেট। লামার বাজার ফায়ার স্টেশনে অগ্নিঝুঁকিতে আছে ৭টি মার্কেট। ভেড়া মার্কেট, চাউল পট্টি, শুটকি পট্টি, খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ, মিয়া খান পুরাতন জুট মার্কেট ও ওমর আলী মার্কেট। বন্দর ফায়ার স্টেশন এলাকায় অগ্নিঝুঁকিতে থাকা ৬টি স্পট হচ্ছে পোর্ট মার্কেট, বড় পুল বাজার, ঈশান মিস্ত্রির হাট, ফকির হাট মার্কেট, নয়া বাজার মার্কেট ও ফইল্লাতলি বাজার।
ইপিজেড ফায়ার স্টেশনে অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে চৌধুরী মার্কেট, কলসি দিঘির পাড় এলাকাধীন কলোনি, আকমল আলী এলাকাধীন কলোনি, মহাজন টাওয়ার ও রেলওয়ে বস্তি। চন্দনপুরা ফায়ার স্টেশনের আওতাধীন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে চকভিউ সুপার মার্কেট, কেয়ারি শপিং মল, গোল বাজার মার্কেট, আলী মার্কেট ১ ও ২, মতি টাওয়ার ও শাহেন শাহ মার্কেট। নন্দনকানন ফায়ার স্টেশন এলাকায় অগ্নিঝুঁকিতে আছে রিয়াজ উদ্দিন বাজার সংলগ্ন সকল মার্কেট, জহুর হকার মার্কেট, টেরি বাজার, তামাকুমণ্ডি লেন, গোলাম রসুল মার্কেট, বাগদাদ ইলেকট্রিক সুপার মার্কেট, হাজি সরু মিয়া মার্কেট ও নুপুর মার্কেট।
আগ্রাবাদ ফায়ার স্টেশন এলাকায় অগ্নিঝুঁকিতে আছে ঝাউতলা বস্তি, আমবাগান বস্তি, সেগুন বাগান বস্তি, কদমতলী রেলওয়ে বস্তি, সিঙ্গাপুর সমবায় সমিতি মার্কেট ও কর্ণফুলী মার্কেট। বায়েজিদ ফায়ার স্টেশনে অগ্নিঝুঁকিতে আছে ২ নম্বর গেট এলাকাধীন রেলওয়ে বস্তি এলাকা, অক্সিজেন রেল রাস্তা সংলগ্ন বস্তি এলাকা, বার্মা কলোনি, ড্রাইভার কলোনি, রৌফাবাদ কলোনি, শের শাহ কলোনি, শেখ ফরিদ মার্কেট, যমুনা সুপার মার্কেট, ষোলশহর সুপার মার্কেট, ইমাম শপিং কমপ্লেক্স ও চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্স।
তবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটের মধ্যে কিছুসংখ্যক এরইমধ্যে ফায়ার সেফটি প্ল্যান নিয়েছে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুম।

 

অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও প্রতিকার

অগ্নিকাণ্ডের কারণগুলো হচ্ছে, ভালোভাবে গ্যাসের চুলা বন্ধ না করা এবং গ্যাসের লাইনে ত্রুটিপূর্ণ বা ছিদ্র থাকা, চুলা জ্বালিয়ে চুলার ওপর কাপড় শুকাতে দেয়া, সিগারেটের জ্বলন্ত আগুন, উত্তপ্ত ছাই, বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার, উত্তপ্ত তেল থেকে সৃষ্ট কারণে, আতশবাজি বা পটকা থেকে, বজ্রপাত, সাধারণ বিদ্যুতের তার দিয়ে বেশি ভোল্টের বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে, নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করলে ও বাচ্চাদের আগুন নিয়ে খেলা।
যেভাবে আমরা সতর্ক থাকতে পারি
রান্নার সময় সহজে খুলে ফেলা যায় এমন পোশাক ব্যবহার করুন। কিন্তু ঢিলেঢালা কাপড় নয়। রান্না ঘরে আপনার (মেয়েদের) ওড়না-শাড়ি সাবধানে রাখুন। চুলার কাজ শেষ হওয়ার পর তা বন্ধ করে রাখা। গ্যাসের চুলা হলে ভালোভাবে সুইচ বন্ধ করে পরীক্ষা করা তা ঠিকমতো বন্ধ হয়েছে কি না। সাধারণ চুলা বা লাকড়ির চুলা হলে ব্যবহারের পর পানি দিয়ে পরিপূর্ণভাবে নেভানো। ঠাণ্ডা ছাই ঢেলে নিশ্চিত হোন আগুন নিভেছে কি না। মাটির চুলার তিন পাশে অন্তত আড়াই ফুট দেয়াল তুলে দিন। ঢাকনা বা চিমনিযুক্ত বাতি ব্যবহার করুন। এমনকি মোমবাতি ব্যবহারের সময়ও সতর্ক থাকুন। চুলার ওপর কখনোই কাপড় শুকাতে না দেয়া। গরম তরকারি ও ফুটন্ত পানি নাড়া-চাড়ার সময় সতর্ক থাকা। মশার কয়েল এমন স্থানে রাখুন যেখান থেকে অন্য কিছুতে আগুন লাগার কোনো ঝুঁকি থাকবে না। মানসম্পন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা, ত্রুটিপূর্ণ তার ব্যবহার না করা ও ত্রুটিপূর্ণ তার দ্রুত সারিয়ে নেয়া। কেউ বিদ্যুতায়িত হলে সম্ভব হলে- মেইন সুইচ বন্ধ করে তারপর তাকে ধরুন। ধূমপানশেষে বিড়ি-সিগারেটের বাদ দেয়া অংশের আগুন নিভিয়ে ফেলুন। যেখানে-সেখানে তা ফেলবেন না। মশারির ভেতর বা খাটে শুয়ে শুয়ে ধূমপান করবেন না। বাচ্চাদের আগুন নিয়ে খেলা করতে না দেয়া এবং অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 136 People

সম্পর্কিত পোস্ট