চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

৫ নভেম্বর, ২০২০ | ৩:৩১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ্যে ‘থানার মাদক’ বিক্রি

রেললাইনের ওপর দলবেঁধে বসেছে পাঁচ কিশোর। বয়স সবারই ১৫ থেকে ২০ এর ঘরে। সেই দলটার কাছাকাছি ঘেঁষতেই নাকে ভেসে আসে গাঁজার উটকো গন্ধ। সবাই পানের জন্য সিগারেট থেকে তামাকের গুঁড়ি বের করে পুনরায় সেখানে গাঁজা পুরছিল। দিনদুপুরে জনাকীর্ণ এলাকায় মাদক সেবন করলেও তারা ছিল একেবারে নির্বিকার। শুধু এই কিশোরেরা নয়, রেললাইনের দুই কিলোমিটারজুড়ে এ রকম ১১টি দল দেখা গেল। তাদের কেউ গাঁজা সেবন করছিল, কেউবা করছিল ইয়াবা বেচাকেনা।

গত মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের পাহাড়তলী ও আকবর শাহ থানার অংশে এ দৃশ্য দেখা গেছে। অবশ্য স্থানীয়রা বলছেন- দিন কিংবা রাত হোক- এ দৃশ্য নিয়মিত। রেললাইন ছাড়াও দুই থানার বিভিন্ন এলাকায়ও বসে গাঁজা-ইয়াবার আসর। এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের অভিযোগ- প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি হলেও পুলিশের তেমন তৎপরতা নেই। পুলিশের নিরবতার সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা দাপটে ব্যবসা করে আসছেন। বাধা দিলে উল্টো বলেন, ‘থানার মাদক বিক্রি করছি। বাধা দেওয়ার তোমরা কারা?’

এলাকাবাসীর ক্ষোভ

রেললাইনের দু’পাশে অনেক বস্তি রয়েছে। সেখানে থাকেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট এলাকার পোশাক কারখানার অনেক শ্রমিককে বাসায় যাওয়ার জন্য রেললাইন মাড়াতে হয়। এ সময় মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের হাতে তারা ইভটিজিং এর শিকার হন। বর্তমানে করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কিশোর-তরুণদের অবসর সময় কাটছে। এই সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের হাতে মাদক তুলে দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সুযোগ বুঝে ছিনতাইও করেন তারা।

মাদক ব্যবসা নিয়ে ক্ষোভ ঝরে পাহাড়তলীর নোয়াপাড়া সমাজ উন্নয়ন পরিষদের প্রধান সমাজপতি মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যেই মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। এতে এলাকার কিশোর-তরুণেরা বখে যাচ্ছে। আমরা চাই- এসব মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়া হোক।’

নাম প্রকাশ না করে এলাকার দায়িত্বে থাকা পাহাড়তলীর আরেকজন প্রবীণ পূর্বকোণকে বলেন, কয়েকবার তাঁরা মাদক ব্যবসায়ীদের বাধা দিতে চেয়েছেন। কিন্তু বারবার মাদক ব্যবসায়ীরা বলেছেন যে তাঁরা থানার মাদক বিক্রি করছেন। পুলিশকে বিষয়টি বারবার জানানো হলেও প্রতিকার পাননি।

এই প্রবীণের অভিযোগ, পুলিশের কেউ কেউ অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জব্দ করা মাদকের কিছু অংশ বিক্রি করে দেন। তাই মাদক ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নভাবে দিনদুপুরে মাদক ব্যবসা করার সাহস দেখাতে পারছেন।

কারা বিক্রি করছেন

দুই থানার বিভিন্ন এলাকায় কথা বলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীও আছেন এই ব্যবসায়।

এলাকাবাসী জানান, পাহাড়তলীর নোয়াপাড়া এলাকায় জহির ও তাঁর স্ত্রী ভাড়া বাসায় মাদক ব্যবসা করেন। আকবর শাহ থানা এলাকায় সোহেল, সুমি, ফাতেমা, সুন্দরী, কর্নেলহাট এলাকায় আবুল বশর, মহিউদ্দিন, রেললাইন এলাকায় আলমগীর, আলী, মানিক, জনি, ফারুকসহ বেশ কয়েকজন মাদক বিক্রি করেন। তবে তাঁদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

অনেকে এসে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাহিদামতো মাদক কিনে নেন। আবার প্রায় সময় মাদক ব্যবসায়ীরা সরাসরি মাদক বিক্রি করার অফার দেন। আকবর শাহ থানা এলাকার বাসিন্দা শহীদ উদ্দিন নামের এক তরুণের বক্তব্যে সেটিই উঠে আসে। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, কয়েকদিন আগে সন্ধ্যায় রেললাইন পার হচ্ছিলেন। এ সময় এক মাদক ব্যবসায়ী এসে তাকে বলেন, ‘ভাই লাল লাগবে, না গোলাপী?’ পরে তিনি জানতে পারেন এই লাল আর গোলাপী হলো ইয়াবার রং। পরে তিনি কোনোমতে সেখান থেকে সরে আসেন।

নগর পুলিশের পাহাড়তলী জোনের সহকারী কমিশনার আরিফ উল্লাহ পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। প্রায়সময় মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীরা ধরাও পড়ছে। যেসব এলাকায় নতুন করে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানেও অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে পুলিশের মাদক বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে আরিফ উল্লাহ বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের আঁতাত করার কোনো সুযোগ নেই। অনেক সময় আমরা বিষয়টি শুনি। কিন্তু সেই মাদক ব্যবসায়ীদের নাম চাইলে কেউ তা দিতে পারেন না।’

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 117 People

সম্পর্কিত পোস্ট