চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

সুজনের ভাবনায় ‘স্বপ্নের চট্টগ্রাম’

২৯ অক্টোবর, ২০২০ | ৪:৩৬ অপরাহ্ণ

নওশের আলী খান

পূর্বকোণের সাথে চসিক প্রশাসকের একান্ত আলাপ

সুজনের ভাবনায় ‘স্বপ্নের চট্টগ্রাম’

সারচার্জ ইস্যুতে প্রাধান্য

আগামী ১০ বছরে চট্টগ্রাম শহর পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ যোগাযোগ কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই আমার কাজ হলো এই শহরের উপযোগিতাকে সবার মাঝে জাগিয়ে তোলা। যারা এই শহরকে ব্যবহার করে আয় করছে তারা এগিয়ে এলে শহরের উন্নয়নে সরকারের কাছ থেকে কোন অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না।

গরিব অধিবাসীদের কাছ থেকে কর নিয়ে শহরের উন্নয়ন হবে তা আমি বিশ্বাস করি না। বন্দরসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে সারচার্জ দাবি নিয়ে দৈনিক পূর্বকোণের সাথে একান্ত আলাপকালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম সুজন একথা বলেন।

চসিক প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইনের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। চীন সরকারের সাথে আমাদের চুক্তি আছে যে রেললাইন ঘুনধুম পর্যন্ত নিয়ে গেলে তারা মিয়ানমার দিয়ে কুনমিং পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে যাবে। তখন ভারতের সেভেন সিস্টার, নেপাল, ভুটান, তিব্বত এবং আরো কিছু দেশ আমাদের এই বন্দরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। টানেলের কাজ শেষ হলে শহর সেদিকে সম্প্রসারণ হবে। বে-টার্মিনাল হচ্ছে।

মহেশখালীতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর করছে সেখানে বড় বড় জাহাজ চলে আসবে। তখন চট্টগ্রাম অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হবে। আজ এবং আগামীর জন্য এই শহরকে প্রস্তুত করতে হবে। এক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বর্তমানে যে সড়ক আছে তা পাঁচ থেকে ছয় টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। বন্দরের কারণে এখানে ৫০ টন মাল বোঝাইকৃত গাড়িও চলাচল করে। বন্দরের উৎপাদনশীলতার কারণেই এসব গাড়ি চলছে।

যেহেতু চট্টগ্রাম পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ততম একটি বন্দরে পরিণত হতে যাচ্ছে তাই এখানে একটি আলাদা সড়ক দরকার, যা দিয়ে শুধুমাত্র বন্দরের ভারী পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করবে। সারাপৃথিবীতে এইরকম ব্যবস্থা আছে। তাতে সাধারণ মানুষের চলাফেরায় আর কোন বিঘ্ন ঘটবে না। বন্দরের ব্যস্ততা যতই বাড়বে, বিদেশি লোকজন আসবে। শিল্পপ্লট করতে হবে। বিদেশিদের আবাসন এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আমাদের এই শহর হলো প্রকৃতির কন্যা। নদী এবং সাগরের মোহনায় এই শহর গড়ে উঠেছে।

এই শহরের সবচেয়ে উপকারভোগী হলো চট্টগ্রাম বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় উপকারভোগী আমাদের জাতীয় অর্থনীতি। জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি উৎপাদনশীল বন্দর প্রয়োজন। বন্দরের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে শহরকে সচল করতে হবে।

এই শহরকে সচল রাখতে হলে শহরের ভৌগলিক অবস্থানের উপযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে যারা অর্থ আয় করছে তাদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। আমি বন্দরকে বলেছি, সাধারণ মানুষ যা কর দেয় তাদেরকেও সেই কর দিতে হবে। সরকারের এক মন্ত্রণালয় থেকে আরেক মন্ত্রণালয়ে অর্থ হস্তান্তর হবে। তাতে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ১৯ শতাংশ এসেসমেন্ট অনুযায়ী গৃহকর দেয় তাহলে চসিকের প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা আয় বেড়ে যায়। নতুন এসেসমেন্টে কর দিলে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই পাওয়া যাবে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা। সরকারি সংস্থাসমূহের কাছ থেকে নতুন এসেসমেন্ট অনুযায়ী কর নেয়ার অনুমতি রয়েছে।

গৃহকর আদায় করা হচ্ছে আবর্জনা পরিষ্কার, আলোকায়নসহ অন্যান্য সেবার জন্য। বন্দর যদি তার গৃহকরের বাইরে সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আয়ের এক শতাংশ সার্ভিস চার্জ দেয় তাহলে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মত পাব। কারণ শহরের পোর্ট কানেকটিং রোড, স্ট্র্যান্ড রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে বন্দর। এর বাইরে আছে কাস্টমস হাউস। গত বছর তারা প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। সেখান থেকে এক শতাংশ সিটি ট্যাক্স দিলে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চসিকের আয় হয়।

বন্দরকে ব্যবহার করেই তারা এই আয় করছে। এই বন্দর যদি দেশের অন্য কোথাও হতো সেই এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে তারা তাদের কার্যক্রম চালাতে পারতো না। বন্দর এবং কাস্টমস মিলে যদি হাজার কোটি টাকা দেয়, চট্টগ্রামবাসী মিলে আরো এক হাজার কোটি টাকা যোগাড় করতে পারবে। বছরে দুই হাজার কোটি টাকা আয় হলে সরকারের কাছ থেকে সিটি কর্পোরেশনের কোন বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না।
এই শহর ছিল আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার। রেলওয়ের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ এবং সৈয়দপুর ওয়ার্কশপ যদি আধুনিকায়ন করা হয়, তাহলে বিদেশ থেকে কোচ এবং ইঞ্জিন আমদানি করতে হবে না। ট্রেনে মালামাল আনা-নেয়া করা গেলে ট্রেনের আয়ও বাড়বে। পরিবহন ব্যয় কমবে, সড়কের উপর চাপও কমবে।

তিনি আরো বলেন, বিজিএমই এর সাথে কথা বলেছি। তাদেরকে বলেছি ভাই আপনারা এই শহরে ব্যবসা করছেন। শহর ঠিক থাকলে ব্যবসা ঠিক থাকবে। এই শহরকে ভালভাবে গড়ে তুলতে না পারলে বিদেশ থেকে যেসব ক্রেতা আসবে তাদেরকে কী বলবেন। ভাঙা রাস্তাঘাট, যানজট দেখলে তারা অসন্তুষ্টি হবেন। এই শহরকে গড়ার কাজে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। তারা সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে। তারপর আলাপ করেছি ইপিজেড এর সাথে। সরকারের সাথে তাদের চুক্তি আছে তারা কোন কর দিবে না। আমি তাদেরকে বলেছি, আমি কর চাইতে আসিনি।

দিনশেষে ইপিজেড থেকে বের হয়ে সিটি কর্পোরেশনে রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। ইপিজেড এর আবর্জনা পরিষ্কার করব। এজন্য সার্ভিস চার্জ তো দিতে পারেন। মাত্র ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স আছে। আর কারো লাইসেন্স নেই। একেকটি প্রতিষ্ঠান যদি মাসে ১০০ ডলার দেয় সিটি কর্পোরেশন তাদেরকে সব ধরনের সেবা প্রদান করবে। বেপজার চেয়ারম্যান তাতে একমত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ করে জানানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

বড় বড় স্টিলমিলগুলো তাদের লরি দিয়ে রাস্তা দখল করে থাকে। অতিরিক্ত মালবোঝাই করে রাস্তা ভেঙে ফেলে। তাদেরকে একটি সার্ভিসচার্জ দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। তারা যদি না দেন তাহলে তাদের অতিরিক্ত মালবোঝাই গাড়িগুলো চলতে দেব না বলে জানিয়ে দিয়েছি। তবে সার্ভিস চার্জ কত হবে তা তাদেরকে ঠিক করতে বলেছি। তারা যদি নির্ধারণ করতে না পারেন তাহলে আমি নির্ধারণ করে দেব। কন্টেইনার ইয়ার্ডের মালিকদেরও একই কথা বলেছি। পতেঙ্গায় সব অফডকে গাড়ি রাখে। তেল শোধনাগার এবং তেল কোম্পানিগুলোকেও ডাকব।

সারা পৃথিবীতে বড় বড় হোটেলের জন্য সিটি ট্যাক্স আছে। চট্টগ্রামে হোটেলগুলো দিচ্ছে না। একইভাবে হাসপাতাল ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টারগুলো শহরের উপযোগিতা ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা আয় করে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে সরকারের কাছ থেকে কোন টাকা লাগবে না। সরকার বন্দরের কাছ থেকে তিন হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। এক হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে নিয়ে গেছে। আর দুই হাজার কোটি টাকা চট্টগ্রামের উন্নয়নে খরচ করতে পারে। পাহাড়তলী হর্স শো লেক আছে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে। সেখানে ভাল একটি এমিউজমেন্ট পার্ক হতে পারে। শহরে কোন খেলার মাঠ নেই। ক্যারাভান জনপ্রিয়তা পেয়েছে উল্লেখ করে চসিক প্রশাসক বলেন, মাঠ পর্যায়ে গেলে নানা দাবি, অভিযোগ পাওয়া যায়। সবাই চায় শহরটি জেগে উঠুক।

গরিব অধিবাসীদের কাছ থেকে কর আদায় করে এই শহরকে উন্নত করা যাবে বলে আমি মনে করি না। বা দুই-একটা দোকান নির্মাণ করে শহরকে উন্নত করা যাবে বলে মনে করি না। শহরের উপযোগিতাকে তুলে ধরে এই শহর ব্যবহার করে যারা অর্থ আয় করে তাদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ আদায় করতে হবে। তবে তার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আলোকায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

সারা পৃথিবীতে একমাত্র চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে শিক্ষাখাত আছে। যেকারণে নগরবাসীকে দুই শতাংশ কর বেশি দিতে হয়। নুর আহমদ চেয়ারম্যান প্রাথমিক শিক্ষাখাত চালু করেছিলেন। পরবর্তীতে আলহাজ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষা চালু করেছিলেন। পরবর্তী মেয়ররা অবহেলা করেছেন। যে কারণে চট্টগ্রামে কোন সরকারি স্কুল কলেজ হয়নি। আমি আসার পর আর্বান স্বাস্থ্যসেবা চালু করেছি। আমি চাইছি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতকে জাগিয়ে তোলার জন্য। একারণে সবার কাছে সহযোগিতা কামনা করছি। আহ্বানে সাড়াও পাচ্ছি। একসময় দেখবেন এখানে সারা পৃথিবীর মানুষ কিছু না কিছু করতে চাইব।

আমার কাজ হলো সবাইকে জাগিয়ে দেয়া। আমি সিটি কর্পোরেশনের যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা দেয়াল ভেঙে দিয়েছি। সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। চসিকের কাজ সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী সচিব সবাই অবহিত করি।

এত কাজ অল্প সময়ে করা সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়াদ সম্পর্কে আমি কখনোই চিন্তা করি না। আমি আজকের কাজ করতে চাই। কালকের জন্য চিন্তা করি না। কাল তো আমি মরেও যেতে পারি। আমি চাই এই শহরের উপযোগিতা বিষয়ে নগরীর মানুষ জেগে উঠুক।

 

 

 

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 146 People

সম্পর্কিত পোস্ট