চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০

২৬ অক্টোবর, ২০২০ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

মাস্টারপ্ল্যান না মানায় ভাঙায় পড়ছে চমেক ভবন

প্রস্তাবিত ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে ভাঙা পড়ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) একটি ভবন। একই সাথে কলেজের একাংশ বৃদ্ধি করার জন্য যে বর্ধিতাংশটুকু নির্ধারিত ছিল, তাও কাটা পড়বে ক্যান্সার হাসপাতাল স্থাপনে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ এক যুগ আগের গড়া কলেজের মাস্টারপ্ল্যানকেই বাদ দিয়ে গড়ে তোলার প্রস্তাবনা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যার ফলে ভবিষ্যতে মেডিকেল কলেজকে সম্প্রসারণ করাও সম্ভব হবে না বলে মত কলেজ সংশ্লিষ্টদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে ক্যান্সার হাসপাতাল অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তা একটি বৃহৎ কলেজের ভবন ও মাস্টারপ্ল্যান ঠিক রেখে তৈরি করতে হবে। এমন একটি জায়গায় এ হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে, যাতে করে কলেজ ভবনসহ পরিবেশও রক্ষা পায়।
২২ সেপ্টেম্বর পাঠানো ওই চিঠিতে অবকাঠামো নির্মাণে জায়গা চিহ্নিত করে জানাতে তৎকালীন হাসপাতাল পরিচালককে বলা হয়। যাতে ক্যান্সার ইউনিট গড়ে তুলতে অন্তত ২১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০৫ ফুট প্রস্থের জায়গা প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে বর্তমান ক্যান্সার ওয়ার্ডের পাশে (ক্যান্টিন সংলগ্ন) খালি জায়গাটিতেই নতুন এ ভবন নির্মাণের প্রস্তাবনা দিয়ে গত ৩ অক্টোবর হাসপাতাল পরিচালক চিঠি দেয় গণপূর্ত বিভাগকে। চিঠিতে হাসপাতালে আরো বেশ কয়টি জরুরি প্রকল্পের জন্য জায়গা নির্ধারিত থাকায় ক্যান্সার ইউনিটটির জন্য প্রস্তাবিত এই জায়গা ব্যতীত অন্য কোথাও জায়গার সংস্থান করা সম্ভবপর নয় বলেও উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি ম্যাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে। যাতে প্রস্তাবিত ক্যান্সার ইউনিটের জায়গা কলেজ কর্তৃপক্ষের নক্সাভুক্ত। শুধু তাই নয়, বর্তমান কলেজের নতুন ভবন নিয়ে ওই স্থানে ‘ইংরেজি অক্ষরের ইউ’ আকারে একাডেমিক ভবন ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনাও নেয়া হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত ক্যান্সার ইউনিটের চিহ্নিত জায়গা ঠিক নতুন ভবনের পেছনে হওয়ায় কাটা পড়বে মাস্টারপ্ল্যানের একটি অংশ। একই সাথে পুরাতন ফার্মাকোলজি ভবনটিও ভাঙা পড়বে।

যার বিষয়ে গত ১ অক্টোবর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব বরাবর একটি চিঠিও দেয় কলেজ অধ্যক্ষ ডা. শামীম হাসান। তাতে বলা হয়, ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণে শতভাগ একমত। কিন্তু একটি হাসপাতাল স্থাপনের জন্য কলেজ ভবনের একটি অংশ ভাঙা এবং হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে মূল কলেজ ভবনটির জন্য নির্ধারিত স্থানটি আর থাকছে না। তাই কলেজের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কাজ করার অনুরোধও করা হয়।

এদিকে ১৯৫৭ সালে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভবনটি না ভেঙে এবং মাস্টারপ্ল্যানকে বাদ না দিয়ে ক্যান্সার ইউনিট গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছে কলেজ সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ স্থানে ক্যান্সার ইউনিট গড়ে তোলা কলেজ ভবনের নক্সা বহির্ভূত হবে। একই সাথে নষ্ট হবে কলেজের ঐতিহ্যও।

এ প্রসঙ্গে কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. ইমরান বিন ইউনুস পূর্বকোণকে বলেন, ‘বর্তমানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি বস্তিতে পরিণত হয়ে গেছে। যেখানে ছাত্রদের প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ব্যাপক বিঘ্নিত হচ্ছে। হাসপাতালের ক্ষয়ে যাওয়া সিড়িগুলো দেখলেই বুঝা যায়। তাই সার্বিক সমীক্ষা করে এবং আসল কাজ জাতির জন্য নিরাপদ ডাক্তার ও বৈজ্ঞানিক তৈরির বিরাট কর্মযজ্ঞ যেন কোনভাবে নষ্ট ও বাধাগ্রস্ত না হয় সে বিষয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। একই সাথে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুলতে হলে এ পরীক্ষাও করা দরকার, যেখানে কত মানুষ যাতায়াত করবে, কি পরিমাণ যানবাহন চলাচল করবে সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। একটি মেডিকেল কলেজকে বস্তিতে রূপান্তর করলেইতো হবে না। তাই কলেজ ভবন না ভেঙে এবং মাস্টারপ্ল্যান ঠিক রেখে অন্য জায়গা নির্বাচন করা যেতে পারে। মেডিকেল কলেজ একটি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জ্ঞান তৈরির স্থান। তাই সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে আরও ভাবা উচিত বলেও মনে করি।

অন্যদিকে, গতকাল রবিবার এ সংক্রান্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তিন সদস্যের একটি টিম সরেজমিনে ক্যান্সার হাসপাতালের জায়গা পরির্দশনও করেছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাস) ডা. মোস্তফা খালেদ আহমদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম সকালে হাসপাতাল পরির্দশন করেন। এসময় হাসপাতালের পরিচালক, কলেজ অধ্যক্ষ ও গণপূর্ত (ইমারত) বিভাগ-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথেও কথা বলেন তারা।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাস) ডা. মোস্তফা খালেদ আহমেদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা কলেজ ও হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি। জায়গাগুলোও সরেজমিনে দেখেছি। এ বিষয়ে ঢাকায় গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তবে ভবনটি যতটুকু সেভ করা যায়, সেটি দেখা হবে।’

গণপূর্ত (ইমারত) বিভাগ, চট্টগ্রাম-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রাহুল গুহ পূর্বকোণকে বলেন, ‘ক্যান্সার ইউনিট করতে হলে ভবনটি ভাঙতে হবে। তবে যতটুকু সেভ করা যায়, সেটি চেষ্টা করা হবে। তাছাড়া ভবনটিতো অনেক পুরাতন। এটা এমনিতেই ভাঙার প্রয়োজন আছে।’

উল্লেখ্য : ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামসহ আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি করে একশ শয্যার পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার ইউনিট স্থাপনের বিষয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেয়া হয়। তাতে ২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 137 People

সম্পর্কিত পোস্ট