চট্টগ্রাম বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

২৪ অক্টোবর, ২০২০ | ১:২১ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

কেঁচো খুঁড়তে বের হচ্ছে সাপ

চট্টগ্রাম জেনারেল পোস্ট অফিসে (জিপিও) ভুয়া সঞ্চয়ী হিসাবের আড়ালে লুটপাট হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ডাক বিভাগের সঞ্চয়ী ব্যাংকের হিসেবের সামঞ্জস্য বিধান। ‘পদ্ধতিগত ক্রুটির সুযোগে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ডাক বিভাগের অধীনে পরিচালিত চট্টগ্রাম জিপিও’র সঞ্চয়ী হিসাব থেকে লুটপাট করা হয়েছে ২০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। পোস্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়ন্ত্রণে সংঘবদ্ধ একটি চক্র এ কাজে জড়িত।

গত ২৬ আগস্ট জিপিওতে সঞ্চয়ী হিসাবে ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় পোস্ট মাস্টার নুর মোহাম্মদ ও পোস্টাল অপারেটর সরওয়ার আলম খান গ্রেপ্তার হয়। দুইজনকে এজাহারভুক্ত আসামি করে মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পরে জিপিওর অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি ঘটনা তদন্ত করতে গেলে বেরিয়ে পড়ে থলের বিড়াল। তদন্তে দেখা যায়, ‘ভুয়া’ নামের পাস বই ব্যবহার করে তুলে নেয়া হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ। বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের ঘটনা দেখে চোখ কপালে উঠেছে তদন্ত কমিটির। দুদকের দৃষ্টিতে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। আগামীকাল (রবিবার) অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি দুদক ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে- ডাক কর্মচারী ইউনিয়নের জিপিও জেলা শাখার একজন নেতা মূল অপরাধীদের আড়াল করে ঘটনা ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্ঠা করছে।

জানতে চাইলে, চট্টগ্রাম জিপিওর ঊর্ধ্বতন পোস্ট মাস্টার ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, ভুয়া নামের হিসাব দেখিয়ে ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত থাকায় দুইজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। অভিযুক্তরা রায়ফা হোসেন, দুই বোন লাকী আক্তার ও সাকি আক্তারের তিনটি হিসাবের অনুকূলে গত ২৮ আগস্ট একদিনে সঞ্চয় ব্যাংকের ৪৫ লাখ আত্মসাত করেন। মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছেন। আত্মসাতকৃত টাকার পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি কিনা জানতে চাইলে ড. নিজাম উদ্দিন বলেন, আত্মসাতের টাকার পরিমাণ অনেকটা এ রকম। বিষয়টি এখনো তদন্তনাধীন। তবে আত্মসাতকৃত টাকার পরিমাণ অনেক বেশি। বিষয়টি ইতোমধ্যে আমরা দুদককে অবহিত করেছি। তদন্তনাধীন বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না।

দুদক চট্টগ্রাম কার্যালয়ে উপ-পরিচালক লুৎফুল কবির চন্দন বলেন, পোস্ট অফিস কর্তৃপক্ষ ঘটনার পর পর লিখিত যে অভিযোগটি দিয়েছে তা আমরা ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলাম। প্রধান কার্যালয়ের অনুমিতক্রমে মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুদক কর্মকর্তা লুৎফুল কবির বলেন, মামলার এজাহারে ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পোস্ট অফিস কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ একটি তদন্ত কমিটি করেছে। তারা ইতোমধ্যে মৌখিকভাবে জানিয়েছে আত্মসাতকৃত টাকার পরিমাণ ২০ কোটি টাকার বেশি হতে পারে। সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। তাদেরকে বিস্তারিত লিখিত দিতে বলা হয়েছে। আগামীকাল রবিবার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার কথা রয়েছে। মামলাটি দুদক গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করবে। এ আত্মসাতে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডাক বিভাগের সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা আত্মসাতের ঘটনা নতুন নয়। ২০০৫ সালে রংপুর বিভাগীয় ডাক ঘরে প্রায় ৬ কোটি টাকা আত্মসাত হয়। ওই ঘটনায় চাকরি চলে যায় আত্মসাতকারীর। ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে নোয়াখালীতে নূর করিম নামে এক পোস্টাল অপারেটর পোস্ট অফিস থেকে ৯ কোটি টাকা আত্মসাত করেন। একই ঘটনা বার বার ঘটলেও বন্ধ করা হয়নি আত্মসাতের পথ। সর্বশেষ চট্টগ্রাম জিপিওতে ধরা পড়ে সঞ্চয়ী হিসাবের ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা।

ডাকঘরে যেসব টাকা জমা হয় : সঞ্চয়পত্রের টাকা জমা নেয় ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক। সঞ্চয় ব্যাংকে দুই ধরনের একাউন্ট রয়েছে। একটি হচ্ছে সাধারণ হিসাব। অন্যটি মেয়াদী হিসাব। একাউন্টধারীরা সঞ্চয় ব্যাংকে অর্থ জমা করেন। সঞ্চয়পত্র বিক্রির অর্থও হিসেবে জমা হয়। অনেক গ্রাহক ৫/১০ লাখ টাকাও জমা দেয়। সাধারণ হিসেবেও ১০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা দেয়া যায়। মানি অর্ডার, পার্সেল, ই-কমার্সের আওতায় ভিপি মানি অর্ডারের টাকা, সঞ্চয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, স্ট্যাম্প বিক্রি, ফরেন আর্টিকেল বুকিংয়ের অর্থও জমা হয় ডাকঘরে।

যেভাবে আত্মসাত হয় কোটি কোটি টাকা : নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন বিভিন্ন খাতের কি পরিমাণ অর্থ ডাকঘরে জমা পড়ল তার একটি হিসাব হয়। প্রতিদিনের হিসাব প্রতিদিন সম্পাদন হবার কথা। বিভিন্ন খাত থেকে অর্থ প্রাপ্তি এবং বিভিন্ন খাতে অর্থ পরিশোধের পর বিশাল অংকের অর্থ ডাকঘরেই রয়ে যায়। এ অর্থ (অথরাইজড ব্যালেন্স) থেকে পরের দিন অফিস পরিচালনা ব্যয় নির্বাহ করা হয়। একদিনের অফিস খরচ রেখে (সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা) বাকিটা নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা কিংবা সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারিতে জমা দেয়ার কথা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পোস্ট অফিস কর্মকর্তা জানান, প্রত্যেক হিসাবধারী গ্রাহকের নামে লেজারবুকে আলাদা আলাদা ম্যানুয়েল পাতা খোলা হয়। প্রতারক কর্মকর্তা-কর্মচারী পাস বইয়ে জমার বিপরীতে লেজার বুকের পাতায়ও সমপরিমাণ অর্থ জমা দেখান। পাস বইয়ে জমা থাকলে লেজার বইয়েও সেটি জমা হতে বাধ্য। কিন্তু অপরিমেয় অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার হাতিয়ারটি হচ্ছে ওইদিনের ‘সিডিউল’ বা ‘জার্নাল’। পাস বই এবং লেজারে অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করা হলেও দৈনন্দিন অর্থ জমা পড়া কিংবা উত্তোলনের কোনো তথ্য জার্নালে তোলা হয় না।

কিছু দিন পর নামে-বেনামে হিসাবধারী পাস বই নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা টাকা উত্তোলন করতে আসেন। পাস বই এবং লেজার পরীক্ষার দায়িত্ব সহকারী পোস্ট মাস্টারের (এপিএম)। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ডাকঘরের কাউন্টার অপারেটর, লেজার অপারেটর এবং সহকারী পোস্ট-মাস্টার মিলে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। ভুয়া নামের পাস বইয়ে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও কোনো পর্যায়ে সেটি ধরার জো নেই। অনেক সময় তদন্তেও এটি ধরা পড়েনা। কারণ, তদন্তে পাস বই এবং লেজার বই পরীক্ষা করা হয়। সিডিউল কিংবা জার্নাল পরীক্ষা করা হয় না।

পদ্ধতিগত ক্রুটি: অর্থ আত্মসাতের দুয়ার খোলা রাখতে সুপরিকল্পিতভাবেই ডাক বিভাগে একটি ‘পদ্ধতিগত ক্রুটি’ জিইয়ে রাখা হয়েছে। অর্থ আত্মসাতের পথ বন্ধ করতে ১২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল ডাক বিভাগ। ওই প্রকল্পের আওতায় ডাক বিভাগের যাবতীয় কার্যক্রম অটোমেটেড হওয়ার কথা। সবকিছুই চলে আসার কথা সফটওয়্যারের আওতায়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শুধুমাত্র ডাক সঞ্চয়পত্রগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সবচেয়ে বড় খাত ‘সঞ্চয় ব্যাংক’টিকে অটোমেশনের বাইরে রাখা হয়। সফটওয়্যার কেনা হলেও সেটি চালু করা হয়নি। জলে যায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 282 People

সম্পর্কিত পোস্ট