চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০

করোনায় আক্রান্ত প্রতি ৫ জনে একজন ডায়াবেটিক রোগী: গবেষণা

২৩ অক্টোবর, ২০২০ | ১০:১২ অপরাহ্ণ

অনলাইন ডেস্ক

করোনায় আক্রান্ত প্রতি ৫ জনে একজন ডায়াবেটিক রোগী: গবেষণা

চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্তদের প্রতি পাঁচজনে একজন ডায়বেটিক রোগী। সবচেয়ে বেশি শারীরিক জটিলতায় পুরুষ ও ৩১-৫০ বছরের ডায়বেটিস রোগীরা সম্মুখীন হচ্ছেন। ডায়বেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে করোনা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষিত হয়। সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাদের মধ্যে ৭৫ ভাগ ডায়াবেটিস রোগী কোনো না কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়ায় ভুগছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও বিআইটিআইডি’র যৌথ গবেষণার এ তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষনা প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার’র “ডায়বেটিস এন্ড মেটাবলিক সিনড্রোম: ক্লিনিক্যাল রিসার্চ এন্ড রিভিউস” শীর্ষক গবেষণা নিবন্ধে গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশ করা হয়।

চট্টগ্রামের চারটি করোনা হাসপাতালে এপ্রিল থেকে জুন মাসে ভর্তিকৃত রোগীদের উপর পরিচালিত এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডায়বেটিস ও হরমোন রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. ফারহানা আক্তার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. আদনান মান্নান। গবেষণা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. এইচ. এম. হামিদুল্লাহ মেহেদী ও ডা. আবদুর রব মাসুম, বিআইটিআইডি’র ল্যাবপ্রধান ও অণুজীব বিজ্ঞানী ডা. শাকিল আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুব হাসান এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে নেতৃত্ব দেন গবেষণা শিক্ষার্থী আসমা সালাউদ্দিন ও সাখাওয়াত হোসেন মিয়াজি।

আন্তর্জাতিকভাবেও ডায়বেটিসকে করোনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডায়বেটিস ফেডারেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী যুক্তরাজ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মাঝে ২০ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ১১ শতাংশ এবং চীনে দশ শতাংশ রোগী ডায়বেটিক। চট্টগ্রামে ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এর তীব্রতা, উপসর্গ এবং কোভিড পরবর্তী অবস্থা নিয়ে সম্পাদিত এই গবেষণাটি কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার চার সপ্তাহ পর রোগীদের মাঝে পরিচালনা করা হয়।

পৃথিবীতে প্রতি ১০ জনে একজন ডায়বেটিসে আক্রান্ত। এই মূহুর্তে বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি লোক ডায়বেটিসে আক্রান্ত। চট্টগ্রামে প্রায় ১০ লাখের অধিক লোক ডায়বেটিসে আক্রান্ত। পৃথিবীতে ডায়বেটিসে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ অষ্টম। ডায়বেটিসের তীব্রতার কারণে কোভিডের সাথে ডায়বেটিসের সম্পর্ক, প্রতিক্রিয়া, সুস্থ হতে জটিলতা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা জরুরি।

চট্টগ্রামে প্রতি এক শতাংশ কোভিড রোগীর মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠার পর নতুনভাবে ডায়বেটিস শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এক্ষেত্রে এইচবিএওয়ানসি টেস্টের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার পরিবর্তিতে ডায়বেটিসে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য অন্যান্য দেশেও পাওয়া গেছে। ইতোপূর্বে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ইটালি ও সিংগাপুরে অনেকেই কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর নতুনভবে ডায়বেটিসে আক্রান্ত হয়েছে বলে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিন-এ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়াও এই গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডে আক্রান্ত ৪০ শতাংশ ডায়বেটিস রোগীকেই ইনসুলিনের মাত্রা তিনগুণ করতে হয় রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। কোডিভ আক্রান্ত ডায়বেটিস রোগীদের ৯০ ভাগেরই জ্বর, ৬০ ভাগের কফ ও কাশি এবং ৪৫ ভাগের শারীরিক ব্যথা পর্যবেক্ষিত হয়েছে। ৬০ ভাগের অধিক রোগীর ফেরিটিন ও ডি ডাইমারের পরিমাণ অধিক পাওয়া গেছে। ডায়বেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে উপসর্গবিহীন হওয়ার সংখ্যা কম। মাত্র চার শতাংশ ডায়বেটিস রোগীর মধ্যে কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর কোন উপসর্গ বা লক্ষণ পর্যবেক্ষিত হয়নি কিন্তু ডায়বেটিসবিহীন কোভিড রোগীদের মধ্যে বেশি উপসর্গবিহীন হওয়ার মাত্রা দেখা গেছে।

গবেষণাটি সম্পর্কে গবেষকদলের নেতৃত্ব প্রদানকারী ড. আদনান মান্নান বলেন, দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যা যাদের থাকে তাদের কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন উপসর্গ ও সমস্যার সম্ভাবনা দেখা যায় যা ইতিমধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে এক কোটি ডায়বেটিস রোগী থাকার কারণে তাদের শারীরিক প্রতিক্রিয়া আলাদাভাবে জানা প্রয়োজন। কারণ ডায়বেটিস একটি বহুমাত্রিক শারীরিক সমস্যা যা অনেকগুলো উপসর্গের সাথে সম্পর্কিত এবং সে কারণেই কোভিড একই সাথে একজন রোগীর অনেকগুলো অঙ্গকে আক্রান্ত করার প্রবণতা দেখায়।

গবেষণা দলের ক্লিনিক্যাল প্রধান ডা. ফারহানা আক্তার জানান, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষনায় কোভিড আক্রান্ত রোগীর বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাগুলোর মধ্যে ডায়াবেটিস অন্যতম, যা আমাদের গবেষণায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। আমরা জানি, ডায়াবেটিক রোগীর যেকোনো সংক্রমণ হলে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধি করে। একইভাবে কোভিড আক্রান্ত রোগীরও এই স্ট্রেস হরমোনের কারণে ডায়াবেটিস মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায়। তাছাড়া কোভিডের চিকিৎসায় কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যার কারণে ডায়াবেটিস বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বেশি সংক্রমণের কারণে ইনসুলিনও ঠিকমত কাজ করতে পারে না। ফলে রোগীর ইনসুলিন গ্রহণের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি কোভিড আক্রান্ত ডায়াবেটিক রোগীর আরও কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমরা পেয়েছি, যা এই গবেষণার একটি বিশেষ দিক। আমরা কোভিড পরবর্তী নতুন ডায়াবেটিক রোগী পেয়েছি, যাদের ব্যপারে আমাদের আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার পরিকল্পনা আছে।
গবেষণা দলের সহ-তত্ত্বাবধায়ক ডা. এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, ডায়বেটিস রোগীদের শারীরিক বিভন্ন জটিলতা দূর করতে করোনা পরবর্তী সময়ে হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও নিয়মিত চিকিৎসকের সংস্পর্শে থাকতে হবে। কোভিড পরবর্তী সময়ে ডায়বেটিস রোগীদের ৪৫ ভাগ প্রচণ্ড কিংবা মাঝারি মানের শারীরিক ব্যথা অনুভব করেন অন্তত চার থেকে ছয় সপ্তাহ। ৩০ ভাগ রোগীর রাতে নিরবচ্ছিন্ন ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে।

ইতোপূর্বে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা তুরস্ক ও অন্যান্য দেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিসিজি টিকার কার্যকারিতা দাবি করলেও বাংলাদেশে ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে তার নিদর্শন পাননি এই গবেষকদল। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ডায়বেটিস রোগীদের ৮৭ ভাগেরই বিসিজি এবং প্রয়োজনীয় সব টিকা দেয়া আছে।

গবেষকেরা মনে করেন কোডিড আক্রান্ত ডায়বেটিস রোগীদের বিশেষ সুরক্ষা ও সতর্কতা প্রয়োজন এবং কোভিড পরবর্তি সময়ে নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকা দরকার। ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ, চট্টগ্রাম গবেষণা কর্মটির সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিল।

 

 

 

 

পূর্বকোণ/আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 142 People

সম্পর্কিত পোস্ট