চট্টগ্রাম বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০

২৩ অক্টোবর, ২০২০ | ১২:৩৪ অপরাহ্ণ

তাসনীম হাসান

ঘরে ঘরে গরুর খামার

বিকেল চারটা। সোনা রোদে টান পড়তে শুরু করেছে কেবল। এমন সময় চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডের পশ্চিমে সাগরের তীর ধরে যতদূর চোখ যায় দেখা মেলে শুধু গরু আর গরু। দিনভর খাবারের খোঁজে চষে বেড়ানোর পর মালিক-রাখালের দেখিয়ে দেয়া পথ ধরে ঘরে ফিরছিল এই গরুর দল। গত মঙ্গলবার দেখা এই দৃশ্য প্রতিদিনের।

বঙ্গোপসাগর তীরের ফুল চৌধুরী পাড়া, আব্বাসপাড়া, চৌধুরী পাড়া, ডোমপাড়ার মানুষের এক সময়ের পেশা বলতে ছিল শুধু-সমুদ্রে মাছ ধরা। তবে এই পেশায় ঝুঁকি থাকায় প্রায় এক দশক ধরে তাদের অনেকেই ঝুঁকেছেন গরু পালনের দিকে। কারণ এখানে গরু পালনে তেমন খরচ নেই। ‘বিনামূল্যে পাওয়া’ সমুদ্র তীরের উড়ি ঘাসে জাবর কাটতে কাটতেই বেড়ে উঠে গরু।

পথে পথে অন্তত ২০ জন গরুর মালিক ও রাখালের সঙ্গে কথা বলে কী পরিমাণ মানুষ গরু পালন করছে তার একটি স্পষ্ট ছবি পাওয়া গেল। তাঁরা জানান, উপকূলবর্তী এসব এলাকায় ঘরে ঘরে এখন দেশীয় গরুর খামার। কোরবানকে সামনে রেখে ষাঁড়কে পেলেপুষে বড় করা হয়। আর গাভী থেকে পাওয়া দুধ বিক্রি করে গরুর খাবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি নিজেদের সংসারের খরচও উঠে যায় মালিকদের। আবার আনন্দবাজার থেকে দক্ষিণ পতেঙ্গা পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে নানা রকম সবজি ও ফলের চাষ হওয়ায় কৃষকদের কাছে গরুর গোবরের চাহিদাও আছে। ফলে কিছুদিন পর পর গোবর বিক্রি করেও ভালো আয় করেন গরু উৎপাদনকারীরা। দিনশেষে গরুর পাল নিয়ে বাড়িতে ফিরছিলেন রুহুল আমিন। আনন্দবাজার এলাকায় পাওয়া গেল ডোমপাড়ার এই বাসিন্দাকে।

হাঁটতে হাঁটতে ত্রিশোর্ধ্ব এই যুবক পূর্বকোণকে বলেন, তাঁর বাচুরসহ ১৭টি গরু আছে। এর মধ্যে ৫টি গাভী। এসব গাভী দিনে ১৯-২০ লিটার দুধ দেয়। প্রতি লিটার দুধ ৬০ টাকা করে পাইকারি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যান। গরুর খরচ বাদ দিয়ে তাঁর দিনে অন্তত ৭০০-৮০০ টাকা জমা থাকে। এর সঙ্গে কোরবানে ষাড় বিক্রি করে বড় অংকের টাকা তো আসেই।

একই এলাকায় তীরে গরু ছেড়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মোহাম্মদ ইসমাইল। তাঁর আছে ৭টি গরু। এর মধ্যে দুটি করে গাভী ও বাচুর। দুটি গাভী থেকে ৫ লিটার দুধ মেলে। এক সময় মাছ ধরার পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা ইসমাইল পূর্বকোণকে বলেন, গত কোরবানে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় দুটি গরু বিক্রি করেছেন। আগামী কোরবানকে সামন রেখে তিনটি ষাঁড়কে বড় করে তুলছেন তিনি।

আব্বাসপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক আর মোহাম্মদ সাকিবও দশ বছর ধরে গরু পালনের সঙ্গে জড়িত আছেন। দুজনেই এক সুরে বলে ওঠেন, ‘সমুদ্রে যাওয়ার চেয়ে গরু পালনই ভালো। গরু পালনে খরচ কম, আয়ও ভালো।’

রুহুল আমিন, মোহাম্মদ বেলাল আর মোহাম্মদ ইসমাইলরা জানান, সমুদ্রের উড়ি ঘাসের কারণেই মূলত সবাইকে গরু পালনে আগ্রহী করে তুলেছে। তাই তাদের মুখে মুখে ছিল উড়ি ঘাসের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা। জোয়ারের সময় পানির নিচে ডুবে থাকে উড়ি ঘাস। ভাটা হতেই সেই ঘাস উঁকি দিতে শুরু করে। আর এ সময় গরু তীরে নামিয়ে দেন রাখালেরা। এই উড়ি ঘাসেই খাবারের প্রায় ৭০ শতাংশ জোগাড় করে নেয় গরু নিজেই। এর সঙ্গে ঘরে গিয়ে রাতে হালকা মাড় ও দানাদার খাবার দিলেই হলো। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মাংসের জন্য প্রাকৃতিক খাবারে বেড়ে ওঠা এসব দেশীয় গরুর চাহিদা পুরো চট্টগ্রামজুড়ে। প্রতি বছর কোরবানের আগে বেপারিরা এসে এখান থেকে গরু কিনে নিয়ে যান।

তবে এই ভালো লাগার গল্পের উল্টো পিঠে আছে দুঃখের কথাও। চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা গাড়ির তলায় পড়ে প্রায় সময় গরু মারা যাচ্ছে। চারদিন আগেই চৌধুরীপাড়ার মোহাম্মদ বেলালের লাখ টাকার গরু ট্রাক চাপায় পিষ্ট হয়েছে। ১৫ দিন আগে বাসের নিচে পড়ে মারা যায় মোহাম্মদ রফিকের গরুর বাচুর।

এই দুই গরুর মালিক তাই আফসোস মেশানো কণ্ঠে পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোড আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে-তা ঠিক। তবে কিছু বেপরোয়া চালকের কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিচ্ছে।’ বলতে বলতে গলা শুকিয়ে আসে তাঁদের। দুজনের চোখে-মুখে তখন স্বপ্ন ভঙের বেদনা।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 137 People

সম্পর্কিত পোস্ট