চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২০

২২ অক্টোবর, ২০২০ | ৩:৪১ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নৌযান শ্রমিক ধর্মঘট: প্রতি জাহাজে দৈনিক গচ্চা ১০-১৫ হাজার ডলার

নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলমান থাকায় বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে বহির্নোঙরে পণ্য খালাসে। এতে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে সারা দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। জাহাজ মালিক ও শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি দফা দিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে গেছে। ঢাকায় সংশ্লিষ্টদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকেও কোন সমাধান না হওয়ায় এখনও চলছে নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট।

এই সংকট নিরসনে বন্দর কর্তৃপক্ষে নেয়া উদ্যোগে আজ বিকেল তিনটায় বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ ও মালিক শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে বন্দর সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে আলোচনায় সমাধান আসলে গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তি পাবে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। অন্যথায় বড় ক্ষতির মুখে পড়বে দেশ। এমনটাই মনে করছেন বন্দর সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে সর্বশেষ তথ্য নিয়ে জানা যায়, গতকাল বহির্নোঙরে ছিল মোট ৫৮টি বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল)। এর মধ্যে নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে পণ্য খালাস করতে পারেনি এমন জাহাজ ছিল ৪৭টি। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৪ হাজার ২৪০ মেট্রিক টন ক্লিংকার বোঝাই জাহাজ ছিল ১১টি। এছাড়া ৫১ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন স্লাগ বোঝাই ছিল ২টি, ১ লাখ ২২ হাজার ৯৩১ মেট্রিক টন লাইম স্টোন বোঝাই ছিল ৪টি, ৯৪ হাজার ৯শ মেট্রিক টন জিপসাম বোঝাই ছিল ১টি, ৭ হাজার ১৬০ মেট্রিক টন বল ক্লে বোঝাই ছিল ৩টি, ৩৪ হাজার ১৯০ মেট্রিক চিনি বোঝাই ছিল ১টি, ৬৪ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন স্ক্রাপ বোঝাই ছিল ২টি, ২৯ হাজার ৪শ মেট্রিক টন কয়েল বোঝাই ছিল ২টি, ২ লক্ষ ৪১ হাজার ৯৪১ মেট্রিক টন গম বোঝাই ছিল ৭টি এবং ২ লক্ষ ৮০ হাজার ৮৭৯ মেট্রিক অন্যান্য পণ্য বোঝাই ছিল আরো ১৪টি জাহাজ। মোট ১০ লাখ ৮১ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন পণ্য বোঝাই ৪৭টি জাহাজ অলস বসে আছে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রত্যেকটি জাহাজের আমদানিকারকেরা।

পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তিন ধরনের জাহাজ আসে। এরমধ্যে কন্টেইনার জাহাজ ও ট্যাংকার জাহাজ সরাসরি জেটিতে চলে আসে; সেখানে নৌযান শ্রমিকদের কোন সম্পৃক্ততা নেই। তাই চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার জাহাজ ও ওয়েল ট্যাংকার থেকে পণ্য খালাস স্বাভাবকি আছে।
কিন্তু খোলা বা বাল্ক জাহাজ যেসব পণ্য আসে সেগুলো ৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হয়ে থাকে। এই বড় আকারের জাহাজগুলো বন্দর জেটিতে সরাসরি ভিড়তে পারে না। সেজন্য কিছু পণ্য বড় জাহাজ থেকে নামিয়ে লাইটার জাহাজে নিয়ে ওজন হাল্কা করে জেটিতে ভিড়তে হয়। এই জাহাজে নৌযান শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা থাকায় এর প্রভাব পড়েছে ধর্মঘটে। পণ্যবাহী এসব জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ায় বিভিন্ন শিল্পকারখানার কাঁচামাল সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কর্মবিরতির কারণে শুধু খালাস নয় সারাদেশে নদীপথে পণ্য পরিবহন, লোড-আনলোডও বন্ধ রয়েছে। ফলে কর্ণফুলী নদীতে অলস বসে থাকতে দেখা গেছে শত শত লাইটার জাহাজকে।
চলমান সংকট নিয়ে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, একটি মাদার ভ্যাসেল একদিন অলস বসে থাকা মানে ১০-১৫ হাজার ডলার জলে যাওয়া। এটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় শুধু নয়, মেরিটাইম ওয়ার্ল্ডে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা উচিত।

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসাইন পূর্বকোণকে বলেন, সোমবার (১৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে আমাদের কর্মবিরতি শুরু হয়েছে। আমরা সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, জাহাজ মালিক ও শ্রমিক ইউনিয়ন ঢাকায় ত্রিপাক্ষিক আলোচনা করেছি। দাবি আদায়ে ফলপ্রসূ আলোচনা ও যথাযথ চুক্তি সম্পাদন হলেই নৌযান শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবেন। নয়তো অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি চলবে।
ব্যবসায়ী সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম পূর্বকোণকে বলেন, নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট প্রত্যাহারে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) চিঠিতে দিয়েছি। কারণ ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে শিল্পের কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। লাইটারেজ জাহাজ চলাচল না করায় সারাদেশে এসব কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বন্দরে জাহাজজট নতুনভাবে সংকট তৈরি করছে। জাহাজের টার্ন এরাউন্ড টাইম বৃদ্ধি এবং ডেমারেজ চার্জসহ পণ্য আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বাড়বে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
এদিকে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তপক্ষ। বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক পূর্বকোণকে বলেন, বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজ চলাচল না করলেও বন্দরের মূল জেটি জিসিবি, সিসিটি, এনসিটি, রিভারমুরিং, ডলফিন অয়েল জেটি ও স্পেশাল বার্থে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং বন্দর থেকে লরি, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানে পণ্য ও কনটেইনার ডেলিভারি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে সংকট যাতে না বাড়ে সেজন্য আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) বন্দরে জাহাজ মালিক ও শ্রমিক নেতাদের নিয়ে আলোচনায় বসা হবে।
নৌপথে চাঁদাবাজি-ডাকাতি বন্ধ করা; ২০১৬ সালে ঘোষিত গেজেট অনুযায়ী নৌযান শ্রমিকদের বেতন প্রদান নিশ্চিত করা; ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস এবং মালিক কর্তৃক খাদ্যভাতা প্রদান। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ ১০ লাখ টাকা নির্ধারণ এবং নৌ শ্রমিককে মালিক কর্তৃক নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও সার্ভিস বুক প্রদানসহ ১১ দফা দাবি আদায় ধর্মঘট ডেকেছে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন।
চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় এক হাজার ছয়শ লাইটার জাহাজ চলাচল করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার নৌযান শ্রমিক এবং সারাদেশে মোট দুই লাখ শ্রমিক কাজ করে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 96 People

সম্পর্কিত পোস্ট