চট্টগ্রাম বুধবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২০

সর্বশেষ:

১৮ অক্টোবর, ২০২০ | ১:০৫ অপরাহ্ণ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী

কর্ণফুলীকে বাঁচাতেই হবে

কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠেছে দেশের অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি বিশাল জনপদ। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের ধারকও এই কর্ণফুলী। এই অর্থে কর্ণফুলী নদীকে দেশের অর্থনীতির হৃৎপিন্ড বলা হয়ে থাকে। অথচ বৃহত্তর চট্টগ্রামের প্রাণভোমরা এই কর্ণফুলী নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীন হতে চলেছে দূষণ-দখল আর ভরাটের কারণে।

একাধিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুই সহস্রাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী নদীর পাড় দখল করে আছে। কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী প্রায় ৮০ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে কম করে হলেও ৩শ’টির বেশি কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এই শিল্প ও কলকারখানাগুলোর দূষিত তরল বর্জ্য নদীতেই ফেলা হচ্ছে। অসংখ্য নৌযানের বিষাক্ত বর্জ্যের সঙ্গে ৬০ লাখ নগরবাসীর পয়ঃবর্জ্যে বিষিয়ে উঠেছে কর্ণফুলী নদী। এসব বর্জ্যে নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে উঠায় মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের মুখে। এছাড়া প্লাস্টিক ও পলিথিন আগ্রাসনসহ নানা ধরনের অপচনশীল বর্জ্যে কর্ণফুলী নদীর প্রায় ২০ ফুট গভীরতা কমে গেছে। ২০ ফুটের এই পলেস্তরার কারণে নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে।

কর্ণফুলী নদীর এই দুরাবস্থার কথা সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলেরও অজানা নয়। এই নদীকে বাঁচাতে পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন নাগরিক সমাজের আকুতির কথা আমরা ব্যতিক্রমী কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে জানতে পেরেছি। এ ধরনের নানা ভূমিকার সুবাদেই কর্ণফুলীর প্রাণ প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে একটি মাস্টার প্ল্যান হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরের নেতৃত্বে সেই প্ল্যানে ক্রাশ প্রোগ্রাম, স্বল্প-মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে কর্মপরিকল্পনাও ঠিক করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই কর্ণফুলী রক্ষার মাস্টার প্ল্যান তৈরির ব্যাপারে একনেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ ও দখলরোধ এবং নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রণীত মাস্টার প্ল্যানটি ২০১৯ সালের ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাভ করে। খবরে প্রকাশ, মহাপরিকল্পনায় ৪৫টি মূল কার্যক্রম ও ১৬৭টি সহযোগী কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ ১৯টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা রয়েছে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নকারীর দায়িত্বে। কিন্তু অজানা কারণে এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন উপযুক্ত গতি পায়নি। যে কারণে কর্ণফুলী নদী মৃতপ্রায় নদীর খাতায় নাম লিখাতে চলেছে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অত্যন্ত আশার কথা, মুজিববর্ষ উপলক্ষে চট্টগ্রাম থেকেই নদী বাঁচানোর ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। হাতে নিয়েছে নদ-নদীর দখল, দূষণ প্রতিরোধে জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দু’দিনব্যাপী কর্মসূচি। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে অভয়মিত্র ঘাট থেকে বেলুন উড়িয়ে সাম্পান শোভাযাত্রার মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধনকালে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গা নদীসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীগুলোকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তার শতভাগ বাস্তবায়ন চাই। কর্ণফুলী বাঁচাতে যারা কর্ণফুলী নদী দখল করে রেখেছেন এবং নানাভাবে দূষণ করে চলেছেন তাদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

একই অনুষ্ঠানে নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন যে দাবি তুলেছেন, সেটিও প্রণিধানযোগ্য। কর্ণফুলী নদীকে বাঁচাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বড় ভূমিকা রয়েছে উল্লেখ করে সাবেক মেয়র বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক আয় ৩২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বন্দরের তহবিল থেকে একটি ন্যূনতম অংশ যদি কর্ণফুলী রক্ষায় ও চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হয় তাহলে কর্ণফুলী বাঁচবে এবং চট্টগ্রামের চেহারা বদলে যাবে।

আমরা মনে করি, এই দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য। কারণ ১৮৮৭ সাল থেকে কর্ণফুলী নদী ব্যবহার করছে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের সকল আয় যে নদীকে কেন্দ্র করে সেই নদী সচল রাখার প্রধানতম দায়ও বন্দরের। কর্ণফুলী মরে গেলে বন্দর অস্তিত্ব হারাবে। এই বাস্তবতা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তথা নৌ মন্ত্রণালয়কে অনুধাবন করতে হবে। সরকারের যে সদিচ্ছা আছে সেটি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতায় ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর হস্তক্ষেপে একটি মাস্টারপ্ল্যান হয়েছে। এখন মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে নৌ মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিজেদের স্বার্থেই একাজে ত্বরিৎ মনযোগী হতে হবে। একইসঙ্গে চট্টগ্রামবাসীকে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা করতে হবে। নদী দূষণ রোধে নাগরিক দায়িত্ব পালনেও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।
কর্ণফুলী নদীর অস্তিত্বের প্রশ্নে আর কালক্ষেপণ নয়। যেকোন মূল্যে দখল- দূষণ আর ভরাটের কবল থেকে কর্ণফুলীকে রক্ষা করতেই হবে। কারণ কর্ণফুলী নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 170 People

সম্পর্কিত পোস্ট