চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২০

হৃদরোগ ইনস্টিটিউট: ঢাকায় ১৪, চট্টগ্রামে ‘শূন্য’

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ৫:০৫ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

বিশ্ব হার্ট দিবস আজ

হৃদরোগ ইনস্টিটিউট: ঢাকায় ১৪, চট্টগ্রামে ‘শূন্য’

‘প্রচণ্ড বুকের ব্যথা নিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হন নোয়াখালীর রফিকুল ইসলাম। একদিন পরেই উন্নত চিকিৎসার জন্য আসেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে। সপ্তাহখানেক চিকিৎসার মধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়িও ফেরেন তিনি।’ রফিকুল ইসলাম জানান, এনজিওগ্রামে দু’টো ব্লক পাওয়া যায় তার। পরবর্তীতে এনজিও প্লাস্টি বা পিসিআই’র মাধ্যমে রিং বসানো হয়। এখন পুরোপুরি সুস্থ।’

তথ্যমতে, রফিকুল ইসলামের মতো দেশের মোট জনসংখ্যার চার থেকে পাঁচ ভাগই হৃদরোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলেই আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক। এসব রোগীদের চিকিৎসায় শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই সরকারি ও বেসরকারি দু’টি হাসপাতালসহ পৃথক ১৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে বড় বিভাগ চট্টগ্রামে নেই কোন হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট।

এমন অবস্থায় এ অঞ্চলের হৃদরোগীদের ভরসা রাখতে হচ্ছে চট্টগ্রাম হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের ওপরেই। সফলতার সাথে চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে গেলেও সুযোগ সুবিধা খুবই সীমিত থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে বিভাগটিকে। এ অবস্থায় চট্টগ্রামে বিশেষায়িত হৃদরোগ ইনস্টিটিউট বা হাসপাতাল গড়ে তোলার দাবি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদেরও।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৯ সালে মাত্র ছয় শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগ। যাতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, ফেনী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একাংশের জনগোষ্ঠি সরকারি পর্যায়ে হৃদরোগ চিকিৎসার জন্য এই বিভাগের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিদ্যমান একশ’ শয্যার মধ্যে প্রতিদিনই রোগী ভর্তি থাকেন তিন থেকে সাড়ে তিনশ’ জনের অধিক। এ নিয়ে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদেরও। তারমধ্যে রয়েছে জনবল সংকটও।

চমেক হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. প্রবীর কুমার দাশ পূর্বকোণকে বলেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও দিনদিন সাফল্য লাভ করছে হৃদরোগ বিভাগ। কিন্তু যে পরিমাণ চিকিৎসক এখানে প্রয়োজন তা নেই। এই সংকট দূর করা গেলে অবশ্যই ফলও আরও বেশি ভালো আসবে।’

সফলতা এনজিও গ্রাম ও প্লাস্টিতে : হৃদরোগ বিভাগের তথ্য বলছে, প্রতিমাসে শতাধিকেরও বেশি এনজিওগ্রাম হয়ে থাকে এ বিভাগে। এরমধ্যে ৩০টিরও বেশি এনজিও প্লাস্টি সম্পন্ন করা হয়। যার ৯৯ শতাংশই সফল চিকিৎসকরা। তবে বাকি এক শতাংশ মৃত্যু বরণ করলেও, তাদের হার্টের সফলতার সাথেই স্টেন বা রিং স্থাপনের পর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। সেই হিসেবে অনুযায়ী শতভাগ সফলও বলা যেতে পারে বৃহত্তর চট্টগ্রামের একমাত্র সরকারি হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের এনজিও প্লাস্টি কার্যক্রমকে।

হৃদরোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. রেজওয়ান রেহান পূর্বকোণকে বলেন, ‘নিয়মিত করোনারি এনজিওগ্রাফী, বেলুন এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেনটিং, পেসমেকার প্রতিস্থাপন সরকার নির্ধারিত স্বল্প মূল্যে করা হচ্ছে। স্বল্প খরচে যুগোপযোগী হৃদরোগ চিকিৎসা প্রদানের জন্য এই বিভাগ ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট সকলের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তবে চিকিৎসকসহ জনবলের সংকট দূর হলে তা আরও বৃদ্ধি পাবে।’

হৃদরোগ ইনস্টিটিউট প্রয়োজন : ওপেন হার্ট সার্জারি কিংবা এনজিও প্লাস্টি, সবকিছুতেই সাফল্য আছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের। যেখানে রাজধানী ঢাকার বাইরে কেবলমাত্র এ হাসপাতালেই কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ চালু রয়েছে। তবে হৃদরোগ বিভাগের সাথে এই বিভাগুলোকে প্রস্তাবিক হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধীনে এনে সমন্বিত হৃদরোগ সেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘দিনদিন উদ্বেগজনকহারে হৃদরোগীর সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে তুলনায় শয্যা বা হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। যার ফলে অনেককেই ঢাকায় পাড়ি দিতে হচ্ছে। তবে চট্টগ্রামে এমন পূর্ণাঙ্গ ইউনিট চালু হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি চালু হলে যেমন শয্যা সংকট কাটবে, তেমনি এ অঞ্চলের চিকিৎসা সেবা আরও এগিয়ে যাবে’।

এ চিকিৎসকের মতো একই মত দিয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক সার্জন ও নগরীর বেসরকারি মেট্রোপলিটন হার্ট সেন্টারের চিফ কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সারওয়ার কামাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি হৃদরোগ ইনস্টিটিউ স্থাপন করা খুবই প্রয়োজন। দেশের হৃদরোগে আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি রোগী চট্টগ্রামেই। সরকারি সুযোগ সম্বলিত বিশ্বমানের হৃদরোগের চিকিৎসা যদি চট্টগ্রামে পাওয়া যায় তাহলে মানুষ দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করবে না। চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এখনও চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হৃদরোগী বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে। একটা পৃথক হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এই প্রবণতা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’

বিশ্ব হার্ট দিবস আজ : আজ ২৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব হার্ট দিবস। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফাউন্ডেশনের আহ্বানে প্রতিবছর এ দিবসটি পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য “হৃদয় দিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ”। দিবস উপলক্ষে দেশের সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ ও নগরীর বেসরকারি মেট্রোপলিটন হাসপাতালের হার্ট সেন্টারের উদ্যেগে র‌্যালি ও আলোচনা সভা রয়েছে। সাওল হার্ট সেন্টার (বিডি) লিমিটেডের উদ্যোগে দিবসটি উপলক্ষে দুইদিন ব্যাপী ফ্রি চিকিৎসা পরামর্শের আয়োজন করা হয়েছে।

 

 

 

পূর্বকোণ/পি-আরপি

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 147 People

সম্পর্কিত পোস্ট