চট্টগ্রাম বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০

সর্বশেষ:

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ২:২৭ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে ফের বসতি

করোনা সংকটকালে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিঙ্ক রোড এলাকার পাহাড়তলী, জালালবাদ ও জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে ওঠেছিল অন্তত চার শতাধিক অবৈধ ঘরবাড়ি ও নানা স্থাপনা। গত জুন মাসে অভিযান চালিয়ে তা উচ্ছেদ করে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। কিন্তু প্রশাসনের নজরদারির অভাবে সেই উচ্ছেদ করা পাহাড়ে ফের অবৈধ বসতি শুরু হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সড়কের দুই ধারে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে কয়েক শত ঘরবাড়ি ও নানা স্থাপনা। করোনা সংকটে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের কর্মব্যস্ততার সুযোগে জঙ্গল সলিমপুর, জালালাবাদ ও উত্তর পাহাড়তলী মৌজায় গড়ে ওঠেছে এসব স্থাপনা।

স্থানীয়রা জানায়, মার্চ মাস থেকে পাহাড় কেটে এসব অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। রাত-দিন সমান তালে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠেছে চার শতাধিক ঘরবাড়ি।

গত ২৪ জুন সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ৩৫০ টি অবৈধ স্থাপনা-বসতি উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এসময় অভিযানে বাধা সৃষ্টির চেষ্টাকালে অবৈধ দখলখারী চক্রের ১০ জনকে জেল আদেশ দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বায়েজিদ, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড তিন এলাকার প্রশাসন, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথ উদ্যোগে এই অভিযান পরিচালনা করেছিল।

দেখা যায়, উচ্ছেদ করা ঘরবাড়িগুলো বর্তমানে মেরামত ও সংস্কার করে ফের বসতি স্থাপন শুরু করেছে অবৈধ দখলকারীরা। পাহাড়ে ভাঁজে ভাঁজে গড়ে ওঠছে বসতি। এই ফাঁকে দখল করা হচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি।

দেখা যায়, লিঙ্ক রোডের দুই পাশে যত্রতত্র কাটা হচ্ছে পাহাড় ও ঢিলা। গড়ে ওঠেছে কাঁচা-পাকা অসংখ্য ঘর। পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে রাস্তা ও অন্যান্য স্থাপনা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক মো. নূরুল্লাহ নূরী গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘লোকজন পাঠিয়ে তদন্ত করে পুনরায় ব্যবস্থা নেয়া হবে’।
স্থানীয়রা জানায়, করোনা সংকটে প্রভাবশালীরা দেদারছে পাহাড় কেটে এসব ঘর বাড়ি ও স্থাপনা নির্মাণ করেছে।
চট্টগ্রামের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনুদানের নামে কথিত এতিমখানা ও মাজারের আস্তানা নির্মাণ করা হয়েছে। ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনুদানের নামে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।

দেখা যায়, উচ্ছেদ করা পুরোনো টিন, ঘেরা-বেড়া দিয়ে পাহাড় কেটে বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। শুরু হয়েছে ফের অবৈধ বসতি।
নগরীর পাহাড়তলী মৌজা, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও হাটহাজারী উপজেলার জালালাবাদ মৌজায় কাটা হয়েছে এসব পাহাড়।
প্রশাসন ও এলাকাবাসী জানান, পাহাড় কেটে অবৈধ ঘরবাড়ি নির্মাণে পুলিশ প্রশাসনের অনেকেই জড়িত। পরিবেশ অধিদপ্তরের তালিকায়ও একাধিক পুলিশের নাম ওঠে এসেছে। পাহাড় কাটা ও ঘর নির্মাণে পুলিশ জড়িত থাকায় পাহাড়খেকোরা অতি উৎসাহিত হয়ে যত্রতত্র পাহাড় কাটায় উৎসবে পরিণত হয়েছিল।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ৩ ও ৭ জুন দুই দফায় অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কাট্টলী সার্কেলের ভূমি কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলাম। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম পূর্বকোণকে বলেন, করোনা সংকটে প্রশাসনের কর্মব্যস্ততার সুযোগে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে চার শতাধিক ঘরবাড়ি।
স্থানীয়রা জানায়, মনির নামে এক ঠিকাদার প্রভাবশালীদের পক্ষে পাহাড় কেটে এসব ঘরবাড়ি নির্মাণ কাজে জড়িত। এছাড়াও আরও কয়েক জন ঠিকাদার রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে শতাধিক শ্রমিক দুই মাস ধরে পাহাড় কাটা ও ঘর নির্মাণ করছে। প্রশাসনের কর্মব্যস্ততার সুযোগে নির্বিঘ্নে চলছে পাহাড় কাটার উৎসব।
দেখা যায়, উত্তর পাহাড়তলী মৌজার জঙ্গল সলিমপুর ও এশিয়ান উইম্যান ইউভার্সিটির সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠেছে ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। নগরীর উত্তর পাহাড়তলী, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও হাটহাজারীর জালালবাদ মৌজায় ঘরবাড়ি গড়ে ওঠেছে। পাহাড়ে খাঁজে খাঁজে এসব বাড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড় পাদদেশেও রয়েছে বহু ঘরবাড়ি। পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নির্মাণ করা হয়েছে এসব ঘরবাড়ি।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) পাহাড় কেটে নির্মাণ করছে বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিঙ্ক রোড। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে পাহাড় কেটে সড়কটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতির শর্ত প্রতিপালন না করায় সিডিএ’কে বড় অঙ্কের জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশমন্ত্রী, সচিবসহ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা পাহাড় কাটার ও সড়ক নির্মাণ কাজ পরিদর্শনও করেছিলেন।
গতকাল দেখা যায়, ভারী বৃষ্টির কারণে লিঙ্ক রোডের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট অংশে পাহাড় ধসে পড়েছে। রাস্তায় এবড়ো-থেবড়োভাবে পড়ে রয়েছে পাহাড় ধসে পড়া বালুর স্তূপ।
আশ্রয়কেন্দ্র ও মাইকিং : এদিকে, গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় বিভিন্ন পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সরিয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করেছে জেলা প্রশাসন। নগরীর ১৬ টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে আসার আহ্বান করা হয়েছে। চান্দগাঁও, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ এবং কাট্টলী সার্কেল এলাকায় ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হয়। খোলা হয় আশ্রয়কেন্দ্র। এরপর আর কোনো পদক্ষেপ থাকে না কোনো সংস্থার।
মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, এ কে খান পাহাড়, ট্যাংকির পাহাড়, আমিন জুট মিলস এলাকা, রৌফাবাদ, খুলশী, পাহাড়তলী, ফয়েজ লেক আকবর শাহ এলাকার ঝিল-১,২,৩ নং এলাকা, জিয়ানগর, মধ্যমনগর, মুজিব নগর, শান্তিনগর এলাকা, কৈবল্যধাম বিশ্বকলোনি এলাকা, ফিরোজ শাহ এলাকা, ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট এলাকা, বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সিডিএ লিংক রোড এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়েছে।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 97 People

সম্পর্কিত পোস্ট