চট্টগ্রাম বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ | ২:৫২ অপরাহ্ণ

নরোত্তম বনিক, সন্দ্বীপ

নির্বিচারে বন্যপ্রাণী হত্যা সন্দ্বীপে

দুইযুগ আগেও উপজেলা সন্দ্বীপ ছিল বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। সংরক্ষণের অভাবে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায়।
সাগরের বুক চিড়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সন্দ্বীপে একসময় শিয়াল, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বিভিন্ন প্রজাতির কাছিম, সাপ, ঘুঘু, প্যাঁচা, সাদা বক, পানকৌড়ি, পাতিহাঁস, চিলসহ নানান প্রাণী ও পাখপাখালির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। শীতকালে অতিথি পাখির আগমন ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের সচেতনতা এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে এসব বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। সন্দ্বীপে প্রতিবছর নির্বিচারে পিটিয়ে মারা হচ্ছে মেছোবাঘ। গত ৭ সেপ্টেম্বর মাইটভাঙ্গা ৭ নং ওয়ার্ডের বাঘা মার্কেট এলাকার জমির পাশে কয়েকজন মিলে একটি মা মেছোবাঘকে পিটিয়ে হত্যা করে। ১৮ জুলাই শনিবার পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ডের সংবাদকর্মী কাউছার মোহাম্মদ দিদারের বাড়ির পাশে স্থানীয় লোকজন একটি মেছোবাঘ পিটিয়ে হত্যা করে উল্লাস করে ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করে। এভাবে প্রতি বছর সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি মেছোবাঘ পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উপজেলার বিভিন্ন ধান চাষের জমিতে ফাঁদ পেতে ও বিষাক্ত খাদ্যের টোপ দিয়ে প্রতি বছর কয়েকশ বক শিকার করা হয়। সেগুলো আবার প্রকাশ্যে বিক্রি করা হয়। প্রতিটি বক এক থেকে দেড়শ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। শিকার করা বক বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এমন পরিবারও রয়েছে সন্দ্বীপে। প্রায় একযুগ ধরে প্রতিবছর শীতকালে একদল পাচারকারী সন্দ্বীপ থেকে গুইসাপ ধরে নিয়ে যায়। বরিশাল, রংপুর, ফরিদপুর থেকে তিন-চারটি দল সন্দ্বীপ এসে কাছিম শিকার করে পাচার করে। এরা এখানে বাসা ভাড়া করে থেকে বছরে প্রায় নয় মাস পুকুর ও খালবিল থেকে কাছিম ধরে।
দীর্ঘদিন ধরে বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যার মতো অপরাধ ঘটতে থাকলেও নিশ্চুপ উপকূলীয় বন বিভাগের লোকজন। এসব বন্যপ্রাণী হত্যা ও শিকার করার কথা তাদের জানালেও এ পর্যন্ত কোন ধরনের ব্যবস্থা নেননি।
এনাম নাহাড় মোড়ের জুয়েলারি ব্যবসায়ী বিজয় বণিক জানান, গত দুই বছর ধরে কাছিম বিক্রেতাদের থেকে আমি প্রায় ৫০টি কাছিম কিনে আমার পুকুরে ছেড়ে বাঁচিয়ে দিয়েছি।
মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ষাটোর্ধ্ব বয়সের মো. আবদুল বাতেন বলেন, বাঘডাশা বা মেছোবাঘ মানুষের হাস মুরগী, ছাগল-ভেড়ার বাচ্চা খেয়ে ফেলে। অনেক সময় মানুষের ওপর হামলা করে নখ দিয়ে আঁচড় দেয়। তাই বাগডাশ (মেছোবাঘ) দেখলে পিটিয়ে মেরে ফেলে স্থানীয়রা
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানা না থাকায় মানুষ বন্যপ্রাণী হত্যা করছে বলে মন্তব্য করছেন সচেতনমহল। মাইটভাঙ্গা দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আলোমগীর জানান, বন বিভাগ থেকে সন্দ্বীপের প্রতিটি এলাকায় মাইকিং, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও হাটবাজারে হ্যান্ডবিলের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী হত্যা বন্ধ করতে সচেতনতামূলক প্রচারণা করলে এবং মানুষকে বন্যপ্রাণী হত্যার কারণে কি ধরনের শাস্তি রয়েছে, তা জানিয়ে দিলে বন্যপ্রাণী হত্যার প্রবণতা ও হার অনেক কমে যাবে।
আমানউল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহাদাত চৌধুরী বলেন, বন কর্মকর্তার বাড়ি সন্দ্বীপ হলেও তিনি সন্দ্বীপ পোস্টিং নিয়ে থাকেন চট্টগ্রামে। তিনি কীভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করবেন!
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, এ পর্যন্ত আমি বন্যপ্রাণী হত্যার সঠিক কোন তথ্য-প্রমাণ পাইনি। কিছুদিন আগে একটা মেছোবাঘ পিটিয়ে হত্যার খবর শুনে আমি লোক পাঠাই। তারা কোন সত্যতা পায়নি। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করার জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করার কথা স্বীকার করে জানান, আমি উপজেলা পরিষদের মিটিংগুলোতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করার জন্য প্রচারণার কথা বলেছি। আসলে আমাদের লোকজন কম, তাই এসব দেখাশোনা করতে পারছি না।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 110 People

সম্পর্কিত পোস্ট