চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চট্টগ্রামে ঊর্ধ্বমুখী করোনার সংক্রমণ

১৯ আগস্ট, ২০২০ | ১২:১১ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

চট্টগ্রামে ঊর্ধ্বমুখী করোনার সংক্রমণ

চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে চারমাস অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এই মহামারী নিয়ন্ত্রণের কোন সুখবর মেলেনি। বরং দিন যতই গড়াচ্ছে পরিস্থিতি যেন অবনতির দিকেই যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৬ হাজারের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠাঁই নিয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা।
যদিও প্রধান স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বলা হচ্ছে, সংক্রমণের গতি কিছুটা স্লথ হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, গতি কমাতো দূরের কথা, নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ার পরও সংক্রমণের হার আগের সমসংখ্যকই রয়ে গেছে। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণের গ্রাফ এখনো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাগণ বলছেন, করোনা সংক্রমণ না কমার পেছনে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে জনগণের অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরাই দায়ী। মানুষের মধ্যে করোনা ভীতি কেটে যাওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ধার ধারছেন না অনেকেই।
এই দুঃসংবাদের মধ্যে কিছুটা আশার আলোও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তা হলো- আক্রান্তের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি ক্রমশ সুস্থতার হারও দিনদিন বাড়ছে চট্টগ্রামে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সাধারণের প্রতি স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং অধিকতর সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামে প্রথম করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয় গত ৩ এপ্রিল। ওই মাসে সর্বমোট আক্রান্ত হয় ৭২ জন। কিন্তু দিন গড়াতেই পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে থাকে ওই সময়ে। বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যাও। এরমধ্যে পুরো এপ্রিল মাসে মাত্র ৭২ জন শনাক্ত হলেও পরবর্তী তথা মে মাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ৩ হাজার ১১৯ জন। অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় সর্বমোট ৩ হাজার ১৯১ জন। তবে ওই দুইমাসের চেয়ে দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায় জুন মাসে এসে। শুধুমাত্র জুন মাসেই আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ৫ হাজার ৬৬১ জন। সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা তিন মাসে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৮৫২ জনে। কিন্তু চমকানোর বিষয় হচ্ছে, এপ্রিল থেকে জুন অবধি তিন মাসে যে রোগী শনাক্ত হয়েছে, তার সমপরিমাণ শনাক্ত হয়েছে শুধুমাত্র গেল ৪৮ দিনে। এরমধ্যে জুলাই মাসে শনাক্ত হয় ৫ হাজার ৫৯৮ জন। আর চলতি মাসের গেল ১৭ দিনে শনাক্ত হয় ১ হাজার ৫১৫ জন।
হিসেবে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে জুন মাসে যে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, তার চেয়ে অনেকটাই কম নমুনা পরীক্ষা হয় জুলাই মাসে এসে। কিন্তু শনাক্তের হার পূর্বের মতোই। অর্থাৎ সংক্রমণের শতকরা হার ঘুরপাক খাচ্ছে। যদি নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণও করা হয়, তাহলে শনাক্তের সংখ্যা আরও বেশি বৃদ্ধি পাবে বলেও আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য চিকিৎসকের।
জনস্বাস্থ্য রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ কমে গেছে এটি মোটেও সঠিক নয়। বরং সাধারণ মানুষ পরীক্ষার আওতায় আসতে পারছে না। পরীক্ষার সংখ্যাও যদি কিছুটা বাড়ে, তাহলে শনাক্তের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ বাড়বে। পরীক্ষাও কম হচ্ছে, তাই শনাক্তও কম হচ্ছে। বরং সংক্রমণ আগের চেয়ে এখন ঊর্ধ্বমুখী বলা যেতে পারে। কেননা, পূর্বে যে হারে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, বর্তমানে তা হচ্ছে না। তাই রোগীর সংখ্যা কখনো বাড়তি, আবার কখনো কমতি দেখা যাচ্ছে। যা শুধুমাত্র পরীক্ষার কারণেই।’
এ প্রবীণ চিকিৎসকের মতোই সংক্রমণের হারে লাগাম না টানার বিষয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের কারণেই করোনার সংক্রমণ রোধ করা যাচ্ছে না। যার একমাত্র কারণ মানুষের মধ্যে আগের মতো ভীতি কাজ না করা। এ জন্যই একমাত্র সামাজিক সংক্রমণ একমাত্র দায়ী । সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি কেটে যাওয়ায় সবাই বাহিরমুখী হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই কারোরই। যে কারণে এ সংক্রমণের হারও রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির পূর্বকোণকে বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকতর সচেতনতা বৃদ্ধি না পাবে, ওই সময় পর্যন্ত এ সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব নয়। যে যার মতোই এখনো চলাফেরা করছে। মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক করা হলেও, এখন কেউই তা মানছেন না। সবাই মনে করছেন, করোনা চলে গেছে। তাই যত বেশি ব্যক্তি নিজে সচেতন হবে, তত দ্রুতই এ রোগ থেকে বাঁচা যাবে বলেও অভিমত এ চিকিৎসকের।’
এছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মানতে কিংবা বাস্তবে তা রূপ দিতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়ে স্বাস্থ্য পরিচালক আরও বলেন, ‘যারা স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই চলাফেরা করছে অথবা মাস্ক ছাড়াই অযথা রাস্তায় বের হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনকে আইন প্রয়োগ করতে হবে। একই সাথে তা বাস্তবে রূপ দিতে প্রশাসনকে আরও বেশি কঠোর হতে হবে। তাহলে কিছুটা সচেতনতা বাড়বে বলেও আশাবাদ পরিচালকের।’

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 245 People

সম্পর্কিত পোস্ট