চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

লাপাত্তা রেড জোন ফর্মূলা!

২৪ জুলাই, ২০২০ | ২:০৩ অপরাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ

লাপাত্তা রেড জোন ফর্মূলা!

সিদ্ধান্তহীনতায় বাড়ছে সংক্রমণ, ঝুলে আছে রেড জোনে লকডাউন

চট্টগ্রাম নগরীর উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডে যখন করোনা সংক্রমণের হার অত্যধিক বেড়ে যায়, ঠিক তখনই সরকারের সিদ্ধান্তে সেখানে রেড জোন ঘোষণা দেয়া হয়। ২১ দিনের লকডাউন করা হয় পুরো ওয়ার্ড। মেয়াদশেষের নির্ধারিত দিনের আগেই সেই ওয়ার্ডে করোনা সংক্রমণের হার নেমে আসে এক-দশমাংশে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এমন ফলপ্রসূ অর্জন সত্ত্বেও, রেডজোন ঘোষিত অন্য ওয়ার্ডগুলোতে এখন পর্যন্ত এ ফর্মূলার বাস্তবায়ন হয়নি। পরীক্ষিত এমন সিদ্ধান্ত আদৌ করোনা সংক্রমিত অন্যান্য ওয়ার্ডে বাস্তবায়ন হবে কিনা, হলে তা কখন হবে- সেটি নিয়ে আর কোন মাথাব্যথা নেই সংশ্লিষ্টদের। প্রশাসন বলা চলে এ ব্যাপারে কার্যতঃ নির্বিকার রয়েছেন। নীতি নির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এমন গা-ছাড়া ভাবের কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সুযোগটি হাতছাড়া হতে পারে, এমনই অভিমত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।
খবর নিয়ে জানা গেছে, এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে একদিনের জন্যও সভায় মিলিত হয়নি বাস্তবায়ন কমিটি। শুধু তাই নয়, বরং তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন তারা। বিপরীতে এমন সিদ্ধান্তহীনতায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে রেড জোনসহ নতুন এলাকাগুলোতে।

এর আগে গত ১২ জুন জেলা কোভিড প্রতিরোধ কমিটির বৈঠকে জোনভিত্তিক লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীতে দুইদিন পর ১৪ জুন জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে এলাকাভিত্তিক জোন তালিকা প্রকাশ করা হয়। যেখানে নগরীর ১২টিসহ চট্টগ্রামের সর্বমোট ২১টি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। এসব এলাকার মধ্যে নগরীর উত্তর কাট্টলীকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়। তবে বাকি ২০টি এলাকায় লকডাউন করার পরিকল্পনা ঝুলে গেছে। ঘোষণার এক মাসের বেশি সময় পার হলেও তা কার্যকর করতে পারেনি।
যদিও স্বাস্থ্য বিভাগসহ সিটি কর্পোরেশন থেকে ওই সময়ে বলা হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা পুরোপুরিই ভেস্তে গেছে। একমাস পর এসে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত আসলেই বাস্তবায় হবে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্তটাই হচ্ছে বড় বিষয়। রেডজোনকে লকডাউনের আওতায় না আনা গেলে সংক্রমণ রোধ কঠিন হয়ে পড়বে।

রেড জোনের তালিকায় দ্বিতীয় থাকা চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইয়্যেদ গোলাম হায়দার মিন্টু পূর্বকোণকে বলেন, ‘শুরু থেকেই কাট্টলীর পর চকবাজার লকডাউন করবে বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয়নি। তবে কবে হবে সে বিষয়টিও জানিনা। সম্প্রতি মেয়র মহোদয়কেও এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন, ঢাকা থেকে নির্দেশনা পেলেই তারপর করা হবে।’

স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্তের ৭১ শতাংশই নগরীর বাসিন্দা। এরমধ্যে পূর্বে রেড জোন ঘোষণা করা চকবাজার, কোতোয়ালী এলাকাতেই এখনও আক্রান্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। তবে লকডাউন করা উত্তর কাট্টলীতে পূর্বের চেয়ে বর্তমানে এ হার নেই বললেই চলে। উত্তর কাট্টলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নিছার উদ্দিন মঞ্জু পূর্বকোণকে বলেন, ‘এলাকার মানুষের সহযোগিতা ছিল বলেই সুফল পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানলে অবশ্যই অন্য এলাকাগুলোতেও সংক্রমণের হার কমে আসবে। এতে জনগণের সহযোগিতাই হচ্ছে বড় বিষয়।’

সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন প্রয়োজন : জোনভিত্তিক যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণের হার অনেকাংশেই কমে আসতো বলে মত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা বলছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে লকডাউন বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রের চেয়ে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। তাই দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করার তাগিদ তাঁদের।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘যে সকল দেশ করোনায় সফল হয়েছে, তারা লকডাউনকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। চট্টগ্রামের অবস্থা খুবই খারাপ। তারমধ্যে হাসপাতালের চিত্রও আরও ভয়ানক। রোগীরা আগের মতো হাসপাতালে যেতে চায়না। বিপরীতে সংক্রমণও বাড়ছে। এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় লকডাউন। যে সিদ্ধান্তটি আগে নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন করা গেলে অবশ্যই সুফল আসতো। কিন্তু কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ওপর বসে থাকা চলবে না। এটা অবশ্যই স্থানীয় প্রশাসনকে দেখা উচিত। কেননা স্থানীয় বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিভাগ কিছুই বুঝবে না। তাই অবশ্যই এ বিষয়ে প্রশাসনকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার বলেও উল্লেখ করেন তিনি।’

জোন ভাগ হলেও লকডাউন বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় : লকডাউনের পূর্বের পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কথা বলে এমনটি জানা যায়। সর্বশেষ অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি পূর্বকোণকে বলেন, ‘সবকিছু বাস্তবায়ন করতে হলে ঊর্ধ্বতন সিদ্ধান্তের আলোকে করতে হয়। আমরা শুধুমাত্র সংক্রমণের হার হিসেবে এলাকা নির্বাচন করে দেই। লকডাউন বাস্তবায়নে প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশন দেখভাল করবে। যদিও সব বিষয়ে উপরের সিদ্ধান্ত ছাড়া সম্ভব নয়। লকডাউন ফের বাস্তবায়ন করা হবে কি না, তা অনিশ্চিত। সিদ্ধান্ত পেলেই নতুন করে এলাকা চিহ্নিত করে করতে হবে।’

চট্টগ্রাম জেলা কোভিড-১৯ প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন ছাড়া উপজেলার দায়িত্ব আমার। কিন্তু রেড জোন করা হলেও, তা লকডাউন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ঢাকা থেকে। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন কোন সিদ্ধান্ত আসে নি।’

একই বক্তব্য সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দোহার। নগরের এলাকাগুলোর লকডাউনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘সব বিষয় নির্ধারণ হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের টেকনিক্যাল কমিটির সভায়। কিন্তু সর্বশেষ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

পূর্বকোণ/এএ

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
The Post Viewed By: 114 People

সম্পর্কিত পোস্ট