চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২০

১০ জুলাই, ২০২০ | ৭:৫৮ অপরাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

‘দুঃসময়’ যাচ্ছে খাতুনগঞ্জে

দেশের ভোগ্যপণ্যের বড় বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধস নেমেছে। ঈদুল ফিতর থেকে বেচাকেনার সূচক অস্বাভাবিকভাবে নেমে গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বেচাকেনা ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের পণ্যের দামেও ভাটা পড়েছে। চরম দুঃসময় পার করছে বলে জানান ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা। ব্যাংক ঋণ ও দেনা পরিশোধ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর দেশে আমদানি পণ্য বেড়ে গেছে। রোজায় বুকিং দেওয়া পণ্য পর্যন্ত এখন আসছে। কিন্তু দেশে বিয়ে, মেজবান, হোটেল-রেস্তোরাঁ এখনো বন্ধ রয়েছে। পণ্যের আমদানি বাড়লেও সরবরাহ বাড়েনি। কর্মহীন হয়ে পড়ায় মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না। এসবের প্রভাব পড়েছে ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজারে। বেচাকেনা কমেছে ৬০ শতাংশ। অপরদিকে কমছে পণ্যের দাম। ক্রমাগত লোকসান আর বেচাকেনা কমে যাওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লডডাউন তুলে নেওয়ার পর ভোগ্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে। এমনকি রোজায় বুকিং দেওয়া পণ্যও এখন আসছে। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেড়ে গেছে। অপরদিকে, ঈদের পর থেকে বাজারে মন্দাভাব চলছে। বেচাকেনা কমে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে। কর্মহীন লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসবের প্রভাব পড়েছে বাজারে।

ঈদের পর থেকে পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ সব ধরনের ভোগ্যপেণ্যর দাম কমছে। ঈদুল আজহাকে মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা বেশি থাকে। দামও বাড়তি থাকে। এ বছরে তা উল্টোপথে হাঁটছে। মসলাজাতীয় পণ্যের দামও ক্রমাগত কমতির দিকে রয়েছে।
আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারে। কেনা দামে চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ক্রমাগত লোকসানে রয়েছে ব্যবসায়ীরা। কারণ বেচাকেনা কম হওয়ার তারল্য সংকটে রয়েছে ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বিপরীত দিকে বাড়ছে ব্যাংক ঋণের সুদ। ব্যাংক ঋণ ও সুদ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে ঘিরে সরগরম থাকে পাইকারি বাজার। কিন্তু গত ঈদের পর থেকে বেচাকেনায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। ক্রেতা সংকটের কারণে পণ্যের দামও কমতির দিকে রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে মসলাজাতীয় পণ্যের দাম বাড়ার রেওয়াজ ছিল। চলতি বছর হয়েছে উল্টো। মসলাজাতীয় পণ্যের দাম ক্রমান্বয়ে কমেই চলেছে। এতে অনেক ব্যবসায়ী বড় ধরনের লোকসান গুনছে।

মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে বাজার ঘুরে দেখা যায়, ১৫-২০ দিনের ব্যবধানে জিরার দাম কেজিতে তিনশ টাকা থেকে কমে ২০৫-২০৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। রোজায় এ পণ্যটি ৪৫০টাকা বিক্রি হয়েছিল। ভারতে লকডাউন শীথিল করার পর পণ্যটির আমদানি বেড়েছে। তাই দামও কমতে শুরু করেছে। এলাচি কেজিতে ২৬৫০ টাকা এখন ২৪৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। রোজায় তা ২৮শ টাকা বিক্রি হয়েছিল। দারুচিনি ৩১০ টাকা থেকে কমে বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা দরে।
চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ছোলা, চিনি, সয়াবিন, পাম তেল ডাল, চাল, মটরসহ অনেক ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তি ছিল। করোনা সংকটের কারণে ত্রাণ বিতরণে এসব পণ্যের দাম ক্রমান্বয়ে সূচক ঊর্ধ্বগতি ছিল। কিন্তু ঈদের সপ্তাহখানেক পর ধস নামতে শুরু করে। তেল জাতীয় পণ্যের দাম অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও কমছে চিনি ও ডাল জাতীয় পণ্যের দাম।

রমজানের জন্য আমদানি করা ছোলার দাম বেশি কমেছে। গত রমজানে অস্ট্রেলিয়া থেকে আমদানি করা উন্নতমানের ছোলা বিক্রি হয়েছিল কেজিতে ৭০-৭৫ টাকা দরে। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা দরে। কিছুদিন আগেও তা ৬০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মসুর ও খেশারি ডালের দাম কমেছে। মটর ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২৭ টাকা দরে। কিছুদিন আগে তা ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। রমজান মাসে বিক্রি হয়েছিল ৪০ টাকা দরে। মটর বিক্রি হচ্ছে ২৬ টাকা দরে। সপ্তাহখানেক আগে তা বিক্রি হয়েছিল ৩৪ টাকায়। খেশারির ডাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। ১৫-২০ দিন আগে তা ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। রোজায় বিক্রি হয়েছিল ১০০ টাকার বেশি দরে। মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা। কিছুদিন আগে তা ৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মুগ ডাল ১১৫ টাকা থেকে কমে ৯৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
ডাল ব্যবসায়ীরা জানায়, করোনা সংকটের শুরুতে ত্রাণসামগ্রীতে ডালের ব্যবহার বেশি ছিল। চাহিদা বেশি থাকায় পণ্যটি দামও বাড়তি ছিল। এখন ক্রেতা নেই। চাহিদাও নেই। বেচাবাট্টা না থাকায় পণ্যটির দাম ক্রমান্বয়ে কমতে শুরু করেছে। এমনকি কেনা দামের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, করোনার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ আমদানি-রপ্তানি সীমিত করে দিয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক পণ্য দেশে পৌঁছতে পারেনি। বর্তমানে নতুন আমদানি করা পণ্যসহ পুরোনো আমদানির পণ্য একসঙ্গে দেশে ঢুকছে। আমদানি পণ্য চাহিদায় তুলনায় কয়েক গুন বেড়েছে। তাই পণ্যের দাম কমতি দিকে রয়েছে। এ অবস্থায় চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আমদানিকারক, ট্রেডিং ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব চলছে। যার প্রভাব পড়েছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে। কয়েক প্রকারের ভোগ্যপণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
দেখা যায়, এলাচ, সয়াবিন, পাম তেল, ছোলা, ডালের দাম দুই-তিন মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশেষ করে পাম, সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা, ডালের দাম ডিসেম্বরের পর থেকে অস্থিরতা চলে আসছিল। চিনি কেজিপ্রতি ৫৪ টাকা থেকে বাড়তে বাড়তে ৭০ টাকায় ঠেকেছিল। ১৫দিন আগেও চিনি মণপ্রতি ২০৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। বর্তমানে চিনি বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১৯৮০ টাকা।
তবে ঈদের পর থেকে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে। পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ২৩৪০-২৩৫০ টাকা দরে। সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৩২শ টাকা দরে।

বাজেটের পেঁয়াজ আমদানির উপর ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তার প্রভাব পড়েনি বাজারে। লকডাউনের কারণে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমে যাওয়ার রোজার মাসে পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল। তবে ঈদের পর থেকে পেঁয়াজের দামও কমতে শুরু করেছে।
আড়তদার মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, ভারত সরকার পেঁয়াজ আমদানির উপর লকডাউন শিথিলের পর থেকে পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়ে যায়। বর্তমানে ক্রেতা সংকটের কারণে প্রভাব পড়েছে বাজারে। রোজার পর থেকে অর্ধেকের বেশি চাহিদা কমে গেছে।

বাজারে ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ২১-২৩ টাকা দরে। মধ্যমানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৬ টাকা দরে। রোজার মাসে তা বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫০ টাকা দরে। বর্তমানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৪০ টাকা দরে। আদা ১২০-১২৫ টাকা ও রসুন কেজিতে ৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
আড়তদার জাবেদ ইকবাল বলেন, দুই দিন ব্যবসা করতে পারলে পুরো সপ্তাহ বসে থাকতে হয়। আগের তুলনায় বেচাকেনা নেই বললেই চলে। বেচাকেনা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। কিন্তু খরচ কমেনি। এতে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘করোনায় বিশ^বাজারে মন্দা চলছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ক্ষতির প্রভাব পড়েছে। বিশ্ববাজারে বাণিজ্যে কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। তার প্রভাব এখানেও পড়ছে। বিশ^বাজারের চেয়েও কম দামে পণ্য বেচাকেনা করতে হচ্ছে। এতে লাখ লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আগে পণ্য বিক্রি করে স্বস্তি পেতাম। আর এখন অস্বস্তিতে থাকতে হয়। কারণ পণ্য বিক্রি করতে না পেরে বা বাকি পাওনা দিতে না পারা অথবা ঋণের বোঝা টানতে না পেরে কে কোন দিকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে-সেই টেনশনে থাকতে হচ্ছে। এ ধরনের দুঃসময় আর কখনো আসেনি।’

পূর্বকোণ / আরআর

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 288 People

সম্পর্কিত পোস্ট