চট্টগ্রাম বুধবার, ০৫ আগস্ট, ২০২০

সর্বশেষ:

সিক্স মার্ডার রহস্যের কুলকিনারা নেই, আধিপত্যের লড়াইয়ে অশান্ত বান্দরবান
সিক্স মার্ডার রহস্যের কুলকিনারা নেই, আধিপত্যের লড়াইয়ে অশান্ত বান্দরবান

৯ জুলাই, ২০২০ | ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

বান্দরবান সংবাদদাতা

সিক্স মার্ডার রহস্যের কুলকিনারা নেই, আধিপত্যের লড়াইয়ে অশান্ত বান্দরবান

বান্দরবানের রাজবিলা ইউনিয়নের বাঘমারায় সিক্স মার্ডারের তিনদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও এখনো ঘটনার কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ।  জনসংহতি সমিতি সন্তু লারমা গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট ১০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের ছড়া এখনো কাউকে আটক করা যায়নি।

মামলায় অভিযুক্ত ১০ জন হলেন কুলাক্ষ‍্যং পাড়ার সুমন চাকমা (৩৫), জামছড়ি ভিতর পাড়ার উসাইনু মারমা (৩৮), বাঘমারা হেডম‍্যান পাড়ার মংশৈসা মারমা (৪০), জোগেস কারবারি পাড়ার শান্তি বিকাশ চাকমা (৩৮) ও জরিপ কুমার তংচঙ্গা (৫০), বাঘমারার মং প্রু মারমা (৩৮), জামছড়ি ক্রাইক্ষ‍্যং চাকমা পাড়ার নিরুক্ত চাকমা (৫০) ও বিনয় লাল চাকমা (৪৫), উজি ভিতর পাড়ার অংপ্রু মারমা (৪৫), জামছড়ি পাড়ার অগ্লাই মারমা (৩৮)। এরা এলাকায় জনসংহতি সমিতির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত বলে সংস্কারপন্থী গ্রুপের নেতারা দাবি করছেন।

স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার রাতে নিরাপত্তা বাহিনী সুমন চাকমা নামের অভিযুক্ত একজনকে আটক করেছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে সুমন চাকমা গত মাসে সংস্কারপন্থী গ্রুপ থেকে আলাদা হয়ে যায়। সংস্কারপন্থী গ্রুপের নেতারা যদিও ঘটনার জন্য জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমার গ্রুপকে দায়ী করছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিষয়টিও তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত ১৩ জুন বাঘমারা বাজার পাড়ায় সংস্কারপন্থী গ্রুপের জেলা শাখার সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাসায় গুলি ছোড়া হয়। এর প্রায় এক মাসের মাথায় গত মঙ্গলবার সশস্ত্র একটি গ্রুপ ব্রাশফায়ার করে এ সংগঠনটির কেন্দ্রীয় তিন নেতা ও জেলা শাখার সভাপতিসহ ৬ জনকে হত্যা করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয় সংগঠনটির আরো দুই সদস্য। তারা এখন চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনার পর এখনো এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসেনি। আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বাঘমারা ও আশেপাশের পাড়ার বাসিন্দারা। জনসংহতি সমিতির সন্তু ও সংস্কারপন্থী গ্রুপের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা এখন ভয়ে এলাকা ছাড়া।

শুধু তারাই নয় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এখন আতঙ্কে জেলা শহর ও নিরাপদ জায়গায় সরে রয়েছেন। বাঘমারা বাজারে স্থানীয়দের নিরাপত্তায় পুলিশের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বাজারের পার্শ্ববর্তী সেনা ক্যাম্পের সদস্যরা নিয়মিত টহল দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও আতঙ্ক কাটছে না স্থানীয়দের। বাঘমারা বাজারের জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের অফিসটিও এখন তালাবদ্ধ।

সভাপতি রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাসায় এখন শোকের মাতম। গত বুধবার (৮ জুলাই) রাতে রতন তঞ্চঙ্গ্যার লাশের সৎকার করে পরিবারের সদস্যরা। বান্দরবান সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন বুধবার রাতে মামলা দায়েরের পর পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনার জন্য সংস্কার গ্রুপের নেতৃবৃন্দ মূলদল জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমার গ্রুপকে দায়ী করেছে।

কেন এই হত্যাকাণ্ড:

বান্দরবানের মায়ানমার সীমান্তবর্তী থানচি ও রুমা এলাকায় আরাকান লিবারেশন পার্টি (এএলপি) ও আরাকান আর্মির (এএ) তৎপরতা দীর্ঘদিনের। আরাকান লিবারেশন পার্টি মায়ানমারে আত্মসমর্পণ করার পর তাদের তৎপরতা এখন নেই বললেই চলে। অন্যদিকে, সীমান্ত এলাকায় তৎপরতা রয়েছে আরাকান আর্মির। গত কয়েক বছর ধরে আরাকান লিবারেশন পার্টির বেশ কিছু দলছুট সদস্য স্থানীয় বিপথগামী পাহাড়ি যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলে মগ লিবারেশন পার্টি নামে একটি সংগঠন। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে এই সংগঠনটি কে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ারও অভিযোগ ছিল। সংগঠনটি জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অংশ নিলে এই অঞ্চলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। গত দু’বছরে জনসংহতি সমিতি ও মগ লিবারেশন পার্টির মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫ জন হতাহত হয়। মগ লিবারেশন পার্টি কে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মী-সমর্থকও হত্যার শিকার হয়।

রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ ও দুটি দলেরই সংস্কারপন্থী গ্রুপের আধিপত্য থাকলেও বান্দরবানে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করে জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপ। এলাকার পুরো চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ ছিল এই গ্রুপটির হাতে। এই গ্রুপটির আধিপত্য ঠেকাতে মগ লিবারেশন পার্টির পাশাপাশি হঠাৎ করে তৎপরতা শুরু হয় জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের। অভিযোগ রয়েছে প্রভাবশালী একটি পক্ষ সংস্কারপন্থী গ্রুপটিকে বান্দরবানে তাদের তৎপরতা চালাতে সহায়তা করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তাহা পাড়ায় সংস্কারপন্থী গ্রুপের এক সদস্যকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর থেকেই জনসংহতি সমিতির সন্তু ও সংস্কারপন্থী গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়। মার্চে বাঘমারা এলাকার রতন তঞ্চঙ্গ্যাকে সভাপতি করে গঠন করা হয় ২২ সদস্যের সংস্কারপন্থী গ্রুপ। গ্রুপটি বাঘমারা সহ আশেপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপের সদস্যরা। মঙ্গলবার সকালে একটি সশস্ত্র গ্রুপ বাঘমারার রতন তঞ্চঙ্গ্যার বাসায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে সংগঠনের ৬ সদস্য কে হত্যা করে।

সংগঠনটির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক উবা মং মারমা জানিয়েছেন, কমিটি গঠনের পর থেকে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপের পছন্দ হয়নি। তাদের তৎপরতা দমাতেই এ হামলার ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে জনসংহতি সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ক‍্যবামং মারমা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন এই ঘটনার সাথে তারা সম্পৃক্ত নয়। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়রা বলছেন, বান্দরবানে এর আগে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঘটনা ঘটলেও জনসংহতি সমিতির দুই গ্রুপের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম। অন্যদিকে বান্দরবানে ইউপিডিএফের তৎপরতা না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এ সংগঠনটি সমর্থক বাড়ছে। ইউপিডিএফের সংস্কারপন্থী গ্রুপের সমর্থকও রয়েছে বান্দরবানে।

অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের তৎপরতায় শঙ্কা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। বাঘমারার এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটির রেশ বহুদূর নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। যেকোনো সময় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এসব গ্রুপগুলোর মধ্যে আরো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন তারা।

পূর্বকোণ/মিনার-আরপি

The Post Viewed By: 91 People

সম্পর্কিত পোস্ট